বাঙলার ফুটবল যাদুকর আবদুস সামাদ

অথর- টপিক- /স্পোর্টস

বাঙলার ফুটবল যাদুকর আবদুস সামাদ। ভালো নাম সৈয়দ আবদুস সামাদ। ফুটবলের জগতে তিনি জাদুকর আবদুস সামাদ নামে সুপরিচিত। জীবনের শেষ খেলায় তার খেলা দেখে বিলেতের তৎকালীন সেরা খেলোয়াড় ক্যাপ্টেন বলেছিলেন— ধারণা ছিলো না এমন খেলোয়াড় এদেশে দেখতে পাবো। সামাদ সিংহল, সিংগাপুর, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, চীন, বার্মা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফুটবল খেলায় অংশ নিয়েছেন।

আমাদের এই বাঙলার যাদুকরী ফুটবল খেলোয়াড় আবদুস সামাদ ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারী এইদিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তার ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও অগণিত ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছি যাদুকর ফুটবলার আবদুস সামাদকে।  যদিও দারিদ্রের কষাঘাতে বিনাচিকিৎসায় এই ফুটবলের যাদুকর মৃত্যুবরণ করেছিলেন।  মৃত্যুর আগে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো নিঃশেষ হয়ে গেছি। আমার প্রাপ্য মর্যাদা আমি পেলাম না। আমি ধুঁকে ধুঁকে মরে যাব সেটাই ভালো। কারো করুণা এবং অনুগ্রহের প্রত্যাশী আমি নই।’


ইংল্যান্ডের কৃতি ফুটবলার এলেক হোসি একবার ফুটবল যাদুকর সম্পর্কে  বলেছিলেন— বিশ্বমানের যে কোন ফুটবল দলে খেলার যোগ্যতা আছে সামাদের।


১৯১৫ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৯৩৮ সাল পয্রন্ত মাত্র ২৩ বছর ছিল সামাদের অভূতপূর্ব খেলোয়াড়ী জীবন। তিনি ছিলেন একজন রেল কর্মচারী। সে সময় ইবিআর নামে যে রেলওয়ে ফুটবল টিমে সামাদ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। সামাদের ২৩ বছর খেলোয়াড়ী জীবনে এমন সব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে যা তার নামের সঙ্গে যাদুকর খেতাব শব্দটি বসাতে বাধ্য করেছে। যাদুকর সামাদের কালজয়ী ফুটবল প্রতিভা ও নেতৃত্বগুণ তৎকালীন সর্বভারতীয় ফুটবল দলকে গ্রেট বৃটেনের মতো বিশ্বসেরা ফুটবল দলের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় জয় এনে দিয়েছিল।

১৯৩৩ সালে সামাদের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় দল গ্রেট বৃটেনকে ৪-১ গোলে এবং শক্তিশালী ইউরোপিয় টিমকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছিল। ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে জীবনের শেষ খেলা খেলেছিলেন ইংল্যান্ডের সার্ভিসেস একাদশের। ১৯৩৩ সালে সামাদ ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে যোগ দেন কলকাতা মোহামেডানে। নিজের সেরা সময় পার করে আসার পরেও মোহামেডানকে তিনি প্রায় একক কৃতিত্বে টানা পাঁচবার কলকাতা সিনিয়র ডিভিশন লিগে চ্যাম্পিয়ন করেন। এ সময় আইএফএ শিল্ডও ঘরে তুলেছিল মোহামেডান।

সর্বশেষ আফ্রিকায় এক সফরের সময় ষড়যন্ত্র করে তাকে অধিনায়ক না-করায়, সামাদ অভিমানে দল থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। সামাদবিহীন সর্বভারতীয় দলটি সেবার তেমন কোনো সাফল্যই দেখাতে পারেনি। ১৯৩৬ সালে তিনি খেলার সময় মাঠে গুরুতর আহত হবার পর তিনি আর তেমন করে খেলতে পারেননি কোনোদিনই। তাঁর আহত হবার ঘটনা তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত উপমহাদেশের ফুটবল-জগতকে।

সামাদের যাদুকরী চ্যালেঞ্জ !

খেলার মাঠে মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য সব ঘটনার জন্ম দিতেন সামাদ। তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছিল ইন্দোনেশিয়ায়। সর্বভারতীয় ফুটবল দল গিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার জাভায়। খেলা চলাকালে ইন্দোনেশিয়ার বেশ ক’জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে তীব্র শট করলেন সামাদ। বল গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো মাঠে। বিস্মিত হলেন তিনি। গোল হলো না কেন! কিছুক্ষণ পর আবারো সামাদের তীব্র শটের বল ইন্দোনেশিয়ার গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো। এবার সামাদ রেফারিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন, ‘গোলপোস্টের উচ্চতা কম আছে। তা না-হলে, আমার দুটো শটেই গোল হতো।’ ফিতে দিয়ে মেপে দেখা গেল সত্যিই গোলপোস্টের উচ্চতা স্ট্যান্ডার্ড মাপের চেয়ে চার ইঞ্চি কম!

আরেকবার মাঠের মধ্যস্থল থেকে বল নিয়ে সব খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে বল ড্রিবলিং করে নিক্ষেপ করলেন গোলে, বল গোলে প্রবেশ না করে গোলপোস্টের কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে বাইরে চলে গেলে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে বলকে আউট ঘোষণা করলেন; কিন্তু সামাদ তা গোল হয়েছে বলে চ্যালেঞ্জ করলেন। আমার শটে নিশ্চিত গোল হয়েছে। সামাদের শটের মেজারমেন্ট কোনোদিন ভুল হয়নি। গোলপোস্ট উচ্চতায় ছোট। মেপে দেখা গেল সত্যিই তাই।



‘বিংশ শতাব্দীর তিরিশ দশকের কথা, একদিন বিকেলে কলকাতার ইডেন গার্ডেনের বিপরীত দিকের ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রায় ছয় ফুট লম্বা একজন লোক। হঠাত্ তার পাশে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন স্বয়ং তত্কালীন বাংলার গভর্নর এবং তাঁর কন্যা। গভর্নর সোজা এগিয়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় গভর্নরের সঙ্গী-সাথীদের সবাই হতভম্ব। লম্বা লোকটির হাত ধরে কুশল বিনিময় করলেন। তারপর নিজের মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘এসো, ফুটবলের জাদুকরের সঙ্গে পরিচিত হও (Meet the wizard of football)।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি স্থায়ীভাবে চলে আসেন পূর্ব বাংলায়। পার্বতীপুরে বাড়ি কিনে তিনি শুরু করেন ছিমছাম জীবন। তবে ফুটবলের আকর্ষণটা তিনি কখনোই হারিয়ে ফেলেননি। যুক্ত হন সংগঠক হিসেবে। ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বেতনভুক্ত ফুটবল কোচ হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে সম্মানিত করে রাষ্ট্রপতি পদক দিয়ে। ১৯৬৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পার্বতীপুর শহরের ইসলামপুর কবরস্থানে সমাহিত করার দীর্ঘ ২৫ বছর অবহেলিত ও অরক্ষিত থাকার পর ১৯৮৯ সালে ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিসৌধ। তাঁর স্মরণে একটি স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার । পার্বতীপুরে রেলওয়ে নির্মিত ‘সামাদ মিলনায়তন’ নামে একটি মিলনায়তন আছে।

ফুটবল যাদুকর তার জীবদ্দশায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ পাননি। কিন্তু তিনি ছিলেন বাঙালি ফুটবলারদের আইকন। আজ কালের পরিক্রমায় সামাদকে আমরা হয়তো সেভাবে স্মরণ করছি না। কিন্তু তার অনবদ্য কীর্তি ও অবদানকে আমরা বাঙালিরা কিভাবে ভুলে যেতে পারি ! আজকের এই প্রজন্মের কাছে ফুটবল যাদুকর সামাদ স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকুক অনন্ত…

তথ্যসূত্র : সামহোয়্যার ইন ব্লগ, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক

আমি তারিক আজিজ। ঘুরে-বেড়ানো আমার প্রথম শখ ও আনন্দ। সাংবাদিকতা, লেখালেখি আর উদ্ভাবনমূলক বিষয়কে একীভূত করে নিয়েছি জীবনের সঙ্গে। তাই হেড অফ ক্রিয়েটিভ পদে দ্য সুলতানের সঙ্গে যাত্রা। ছোট্ট একটি মানুষ স্বপ্নবাজ হয়ে ভাবনা-কাজের জগতেই থাকতে ভালবাসি। নির্জন-নির্মল প্রকৃতি আমায় অনেক কিছু শিখিয়ে বেড়ায়। তাই নিরন্তর সৃষ্টির গল্প খুঁজে ফিরি...!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ