আলতামাস কবীর : উপমহাদেশের উজ্জ্বল আইন জ্যোতিষ্ক

অথর- টপিক- /সুলতান স্টোরি

রবিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সকালে তিনি কলকাতায় নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। একই সাথে সমাপ্ত হলো তার ৬৮ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি রেনাল রোগ, ডায়াবেটিস মেলিটাস, করোনারি আর্টারি ডিজিজ ভুগছিলেন।


আলতামাস কবীরের জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯ জুলাই ১৯৪৮ সালে ।[1] তার বাবা জাহাঙ্গীর কবীর ছিলেন কংগ্রেসের নেতৃত্বস্থানীয় প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক ইউনিয়নের লিডার । বিধানচন্দ্র রায় ও প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন জাহাঙ্গীর।[2] তার চাচা হুমায়ুন কবীর ছিলেন একজন বাঙালি লেখক এবং জওহরলাল নেহেরু ও লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ইউনিয়ন ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ।

আলতামাস তার প্রাথমিক পড়ালেখা শুরু করেন দার্জিলিংয়ের ‘মাউন্ট হারমোন’ স্কুলে এবং এরপরে তিনি কলকাতা বয়েজ স্কুলে ভর্তি হন । তখনকার সামাজিক একটি ইস্যু নিয়ে তার বিতর্ক এবং সে-বিষয়ে তার সুচারু সমাধানের যোগ্যতা লক্ষ্য করে শিক্ষকগণ তাকে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের পরামর্শ দেন ।

কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর তিনি কলকতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন শুরু করেন ।[3] তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে এল.এল.বি এবং পরে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও লাভ করেন ।[4]

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ১৯৭৩ সালে তিনি বার কাউন্সিলে ভর্তি হন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের প্রাকটিস শুরু করেন; প্রথমে নিম্ন আদালতে, তার পরে কলকাতা হাইকোর্টে।[5] ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পদে নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালের ১১ মার্চ তিনি পদোন্নতি পেয়ে কোর্টের প্রধান বিচারপতি হন। সে বছরই জানুয়ারিতে তিনি ঝাড়খণ্ডের অ্যাক্টিং চীফ জাস্টিস হিসেবে যোগ দেন এবং সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়ে দিল্লি চলে যান আলতামাস কবীর। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে তিনি ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটিতে এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ পান ।[6]২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আলতামাস কবীর ভারতের ৩৯তম প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন[7] এবং মাত্র নয়মাস পরে ২০১৩ সালের ১৮ জুলাই তিনি অবসর নেন।



প্রধান বিচারপতি থাকাকালে তিনি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব জুরিডিক্যাল সায়েন্স’-এর চ্যান্সেলর ছিলেন । তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন অধ্যপনাও করেছেন এবং শিশুআইন বিষয়ে পূর্ণ একটি কোর্স সম্পন্ন করিয়েছেন । এ ছাড়া তিনি গুজরাট ন্যাশনাল ল’ কলেজের সাধারণ পরিষদের চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল ল’ স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ।[8]

সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি থাকাকালে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্পূর্ণ মামলার নিষ্পত্তি করেন, যেগুলো বিশেষভাবে মানবাধিকার ও নির্বাচন আইন সংক্রান্ত ঝামেলার বিষয় ছিলো ।[9]তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০১১ সালের ‘অমরাবতি জেলার ‘সন্ধ্যা মনোজ ওয়াংখেড়ে’র মামলা । ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর তার রায়ে সাংবাদিক সাইয়েদ মোহাম্মাদ আহমেদ কাজমি জানি লাভ করেন; যাকে ইসরায়েলি দূতাবাসে গাড়িবোমা হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো ।[10]

দেশের প্রধান বিচারপতি পদে এ যাবৎ যে ক’জন বাঙালিকে দেখা গিয়েছে, আলতামাস কবীর ছিলেন তাঁদের মধ্যে শেষ ব্যক্তি। ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরে বিজন মুখোপাধ্যায় প্রথম বাঙালি হিসেবে দেশের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। তার পরে বিভিন্ন সময়ে সুধীররঞ্জন দাস, অমল সরকার, অজিতনাথ রায়, সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়, এবং আলতামাস কবীরের মতো বাঙালিরা দেশের প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। তবে ২০১৩ সালে আলতামাস কবীর অবসর নেওয়ার পর আর কোনও বাঙালি এখনও দেশের প্রধান বিচারপতি পদে বসেননি।[11]



ভারতে নিযুক্ত প্রধান বিচারপতি পদে এ পর্যন্ত মাত্র ৪ জন মুসলিমকে দেখা গেছে । সঙ্গত কারণেই আলতামাস কবীর ছিলেন চতুর্থতম ব্যক্তি । ভারতের ১১তম বিচারপতি মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ, ১৫তম বিচারপতি মির্জা হামিদুল্লাহ বেগ, ২৬ তম বিচারপতি আজিজ মুসাব্বের আহমাদির পরে আলতামাস একজন মুসলিম হিসেবে ভারতের প্রধানবিচারপতির পদ অলঙ্কৃত করতে সমর্থ হয়েছেন ।[12]

গতকাল (রবিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) সকালে তিনি কলকাতায় নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন । একই সাথে সমাপ্তা করে তার ৬৮ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন । দীর্ঘদিন ধরেই তিনি রেনাল রোগ, ডায়াবেটিস মেলিটাস, করোনারি আর্টারি ডিজিজে ভুগছিলেন। [13]

তাকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠবিচারপতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । কবিরের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘দেশ এবং রাজ্যের বিচারব্যবস্থা হারাল এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে।’[14]

তথ্যসূত্র : 


[1] Mahapatra, Dhananjay (30 September 2012). “Justice Altamas Kabir takes oath as 39th CJI” . Times of India . Retrieved 26 December 2012 . http://timesofindia.indiatimes.com/india/Justice-Altamas-Kabir-takes-oath-as-39th-CJI/articleshow/16607729.cms?referral=PM

[2] Swamy, V. Kumara (12 September 2012). “Batting for the underdog”. The Telegraph. Calcutta, India. Retrieved 26 December 2012. www.telegraphindia.com/1120912/jsp/opinion/story_15966230.jsp#.UNpTaYnjmGK

[3] প্রাগুক্ত

[4]  IANS (13 September 2012). “Justice Altamas Kabir to be next Chief Justice of India”. IBN Live. Retrieved 26 December 2012. www.news18.com/news/altamas-kabir-the-next-chief-justice-of-india/291226-3.html

[5] Kabir, by convention”. Frontline. www.frontline.in/stories/20121005291904400.htm

[6] ANI (29 September 2012). “Justice Altamas Kabir sworn in as new Chief Justice of India”. Deccan Chronicle.

[7] Altamas Kabir sworn in as Chief Justice of India”. The Times Of India. Retrieved 29 Sep 2012. timesofindia.indiatimes.com/india/Altamas-Kabir-sworn-in-as-Chief-Justice-of-India/articleshow/16599658.cms?referral=PM

[8] Hon’ble Mr. Justice Altamas Kabir”. Supreme Court of India. Archived from the original on 25 August 2010. Retrieved 11 August 2010. www.supremecourtofindia.nic.in/judges/bio/sitting/akabir.htm

[9]  Venkatesan, J. (29 September 2012). “Altamas Kabir sworn in as CJI”. The Hindu. Chennai, India. Retrieved 26 December 2012. www.thehindu.com/news/national/altamas-kabir-sworn-in-as-cji/article3948730.ece

[10] ANS (20 October 2012). “SC grants bail to journalist in Israeli embassy vehicle blast”. MSN India. Retrieved 26 December 2012. www.msn.com/en-in/news/national

[11] www.anandabazar.com/national/former-cji-altamas-kabir-is-no-more-dgtl-1.566935

[12] supremecourtofindia.nic.in/judges/rcji.htm

[13] www.thequint.com/india/2017/02/19/former-chief-justice-of-india-altamas-kabir-is-in-critical-condition-apollo-hospital-kolkata-prolonged-illness

[14] এবেলা, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৭, ebela.in/national/altamas-kabir-passes-away-dgtl-1.566997

 

 

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ