বাংলা ভাষার আর্তনাদ

অথর- টপিক- লিটারেচার/লিড স্টোরি

আমিই বাংলাভাষা। আমি তোমাদের মুখে মুখে থাকি। সাথে সাথে থাকি। আমার বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক ভাই। আমাকে নিয়ে তোমরা অভিনয় করতে গিয়ে হিমশিশ খাচ্ছো দেখে আমি নিজেই আমার বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে এলাম। একসময় আমি ছিলাম সুঠামদেহের অধিকারী। এখন ভালোমত হাঁটতেই পারি না। আগে সবাই যত্নকরে আমাকে ব্যবহার করতো। এখন অনেকের থেকে আমি বিতারিত। বলোতো আমি কি জোর করে তাদের কাছে এসেছি?


একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই ক্লাশ বন্ধ। নানা রকম অনুষ্ঠান। দৌড়াদৌড়ি, প্রাণখুলে হাসাহাসি। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া। এই দিনটার জন্য সারাবছর অপেক্ষায় থাকে শান্তরা। কারণ একুশে ফেব্রুয়ারির দিন ওদের স্কুলে মজার মজার অনুষ্ঠান হয়। এবারও হবে। ছাত্ররা নানান রকমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গতবার শান্তরা ভাষা শহীদের অভিনয় করে পুরো স্কুল কাঁপিয়ে দিয়েছিলো।

শান্তরা বলতে শান্ত, রাশু, হাসু আর নিতু। ওরা সালাম, রফিক, বরকত, জাব্বার সেজে চমৎকার অভিনয় করেছিলো। দর্শকরা দারুণ মুগ্ধ হয়েছিলো। স্যাররা খুব প্রশংসা করেছে ওদের। সেখান থেকেই ওদের প্রতি আলাদা ভালোবাসা স্যারদের। দুইদিন আগে হেড স্যার শান্তকে ডেকে নিয়ে বলেন,

: শান্ত, একুশে ফেব্রুয়ারি তো এসে পড়লো।

– জি, মাঝখানে শুধু একটা দিন বাকি।

: আমাদেরকে তো গতবার ভাষাশহীদদের অভিনয় দেখিয়েছিলে। এবার কি অভিনয় করবে তোমরা?

– স্যার, আমরা নিজেরা কোন সিদ্ধান্ত নেইনি এখনো। তবে আপনি কোন বিষয় দিলে আমরা সেই বিষয়েই অভিনয় করে দেখানোর চেষ্টা করবো।



: উম…, আচ্ছা তাহলে তোমরা এবার এক কাজ করো, ব্যতিক্রম একটা অভিনয় করো এবার। যেমন ধরো, এই যে আমাদের বাংলাভাষা, মায়ের ভাষা আজ অন্য ভাষার তলে পিষ্ঠ হচ্ছে। লাঞ্চিত হচ্ছে। কিভাবে হচ্ছে সেটাও কিন্তু আমরা অনেকে বুঝতে পারছি না। অথচ বাংলাভাষা প্রতিনিয়তই আর্তনাদ করে চলছে। আমি চাই ‘ভাষার আর্তনাদ’ শিরোনামে তোমরা বাংলাভাষার দুঃখগুলা সবার সামনে উপস্থাপন করো।

– ওকে স্যার। আমরা অবশ্যই চেষ্টা করবো ভাষার আতর্নাদ শিরোনামে কিছু একটা করার। এই বলে শান্ত অফিস থেকে বেরিয়ে এলো।

তারপর রাশু, হাসু আর নিতুকে নিয়ে স্কুলমাঠের রেন্টি গাছটার তলে গিয়ে বসলো। সবাইকে জানালো স্যারের কথাগুলো। কিভাবে কি করা যায় পরামর্শ চাইলো শান্ত। কিন্তু কেউ কোন আইডিয়া দিতে পারলো না। টিফিন প্রিরিয়ডের সময়ও শেষ হয়ে এলো কিন্তু ওরা কোন সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পারলো না। খসড়াও আঁকতে পারলো না।

স্কুল ছুটি হলে শান্ত সাথীদের জানায়, কারো মাথায় কোন আইডিয়া এলেই যেন বাকিদের খবর দেয়। আর সকলের প্রস্তুত থাকতে হবে, যেকোনো মুহূর্তে ডাক পরতে পারে। এটা বলে শান্ত বাড়ির দিকে হাটতে লাগলো আর কিভাবে কি করা যায় আইডিয়া খুঁজতে লাগলো।

বাড়িতে গিয়ে খেয়েদেয়ে অন্যদিনের মত ব্যাট বল নিয়ে না বেরিয়ে বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলো। একসময় চোখের পাতি বন্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ও। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে লাগলো কে যেন একজন ওকে ডাকছে-‘ শান্ত, শান্ত…এই শান্ত!’ ও চোখ খুলে ইতিউতি করতে লাগলো। কেউ তো নেই পাশে। তাহলে ডাকে কে! শুনতে ভুল হয়েছে ভেবে আবার চোখ বন্ধ করতে গেলো, অমনি আবারো ডাক- শান্ত…। তাকিয়ে দেখে সাদাকাপড়ে মুড়ানো কি একটা জিনিস যেন। দেখতে দারুণ সুন্দর। আওয়াজটাও চমৎকার। তবে একেবারে জীর্ণশীর্ণ। হাড্ডিসার দেহ। ওই জিনিসটা একটু এগিয়ে এসে আবার মিষ্টিস্বরে বলতে লাগলো,

: তুমি বাংলা ভাষার আর্তনাদ বিষয়ে অভিনয় করতে চাচ্ছো, তাইনা?

– হুম, কিন্তু তুমি কে? এই কথা তুমি কার কাছ থেকে জানলে?

: আমিই বাংলাভাষা।

: তুমিই বাংলাভাষা! শান্ত বিস্মিত হয়ে কথাটা বলে হা করে তাকিয়ে রইলো।

: হুম, আমিই বাংলাভাষা। আমি তোমাদের মুখে মুখে থাকি। সাথে সাথে থাকি। আমার বর্তমান অবস্থা খুবই নাজুক ভাই। আমাকে নিয়ে তোমরা অভিনয় করতে গিয়ে হিমশিশ খাচ্ছো দেখে আমি নিজেই আমার বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে এলাম। একসময় আমি ছিলাম সুঠামদেহের অধিকারী। এখন ভালোমত হাঁটতেই পারি না। আগে সবাই যত্নকরে আমাকে ব্যবহার করতো। এখন অনেকের থেকে আমি বিতারিত। বলোতো আমি কি জোর করে তাদের কাছে এসেছি?

তারা মারপিট করে, রক্ত ঝরিয়ে আমাকে আনলো। এখন আবার আমাকে অবাজ্ঞা করে! আগে আমি বুক ফুলিয়ে অন্য ভাষাদের কাছে গর্ব করে বলতাম- আমাকে পাওয়ার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে আমার প্রেমিকেরা। তোমাদের কারো প্রতি ভালোবাসার এমন নজির আছে? নাই। আমি একমাত্র সেই সৌভাগ্যবান ভাষা। এখন যখন কেউ কেউ আমাকে পরিহার করছে, তখন অন্যভাষাগুলো হেসে হেসে চিমটি কেটে টিটকারি মারে। বলে, খুব না ভালোবাসে তোমারে!



জানো ভাই, তখন আমার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। তবে তোমাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তোমরা আমাকে ভালোবাসো। তাই আমি তোমাদেরকে সাহায্য করবো।

: সত্যি তুমি আমাদেরকে সাহায্য করবে?

‘হুম আমি তোমাদের একটি আইডিয়া দিয়ে যাই। এদিকে এসো।’ কথাটি বলে বাংলাভাষা শান্তকে কাছে নিয়ে কানেকানে কি যেন বললো। তারপর চলে গেলো। শান্ত হাত নেড়ে তাকে জোরে জোরে বিদায় জানাতে লাগলো।

শান্তর ডাক শুনে পাশের ঘর থেকে মা দৌড়ে এসে ওর মাথায় হাত দিয়ে বলতে লাগলো, কি হয়েছে বাবা, কি হয়েছে? খারাপ কোন স্বপ্ন দেখেছো?

শান্ত মায়ের হাতের ছোঁয়া পেয়ে বিছানা থেকে উঠে যায়। পরে মুখে একচিলতে হাসি নিয়ে বলে, না মা, কাজ হয়ে গেছে। তারপর তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পড়ে বেরিয়ে যায়। সাথীদের নিয়ে স্বপ্নে বলা বাংলাভাষার আইডিয়ানুযায়ী রিহার্সাল করতে থাকে। পরদিন যথাসময়ে অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়।

একপর্যায়ে ওদের ডাক পড়ে। ওরা মঞ্চে গিয়ে অভিনয় শুরু করে। একজন হয় বাংলাভাষা, বাকিরা বাঙালী। বাঙালীরা আন্দোলন করে রাক্ষসের মুখ থেকে বাংলাভাষাকে উদ্ধার করে আনে। তারপর খুব যত্ন করতে থাকে তারে। কথায়, লেখায় শুদ্ধ বাংলা চর্চা হতে থাকে। একসময় সমৃদ্ধ হয়ে যায় বাংলা ভাষা। প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে নিতু আর রাশু বাংলা ছেড়ে অন্যভাষায় কথা বলতে থাকে। তারপর হাসুও। এতে বাংলাভাষা আক্রান্ত হতে থাকে। কেউ একটা ভিন্নভাষা বলে তো বাংলাভাষার গায়ে একটা ফোঁড়া ওঠে। আরেকজন আরেকটা শব্দ বলে আরেকটা ফোঁড়া ওঠে বাংলাভাষার শরীরে। এভাবে বাংলাভাষার পুরো দেহে ফোঁড়ায় জর্জরিত হয়ে গেলো।

তখন শান্ত একজন ডাক্তার নিয়ে আসে। পরীক্ষা করে ডাক্তার জানায় এই রোগে অস্তিত্ব বীলিন হয়ে যায়। প্রচণ্ড ভয়াবহ রোগ এটা। একে সুস্থ ও সুঠামদেহের অধিকারী করতে হলে এর খুব যত্ন নিতে হবে। এটা বলেই ওদের অভিনয় শেষ হয়।

হেড স্যার মঞ্চে উঠে ওদের প্রত্যেককে জড়িয়ে ধরে। কপালে চুমু খায়ে বলেন, তোমরা অল্পসময়ে খুব সুন্দর একটা অভিনয় তৈরি করে ফেলেছো। ভেরিগুড। একেবারে বাংলাভাষার বর্তমান অবস্থাটা ফুটে উঠেছে এতে। আচ্ছা আইডিয়াটা কার? শান্ত বলে ওঠে, স্যার, যার দুরবস্থা তারই। মানে কী? স্যার বিস্মিত হয়ে জানতে চায়। শান্ত বলে, মানে হলো আইডিয়াটা বাংলাভাষার নিজের।

পরে ও স্বপ্নে দেখা বাংলাভাষার বিবরণ দিতে থাকে…



 

আমি আবদুল্লাহ মারুফ। বর্তমানে অধ্যয়নরত আছি মালিবাগ জামেয়া শরইয়্যাহতে। পাশাপাশি নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি হেরার জ্যোতি ও মাসিক ঘাসফড়িঙ -এর। পড়াশুনা, লেখালেখি আর ঘুরে বেড়ানো এই আমার ছোট্ট জীবন। দ্য সুলতানের সাথে আছি কন্ট্রিবিউটিং রাইটার হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

ফিলিস্তিনি গল্প— শোধ

মূল— ইবরাহিম নাসরুল্লাহ। ভাষান্তর— মিরাজ রহমান বড় বেশি রকম পীড়াপীড়ি করছে নিয়াজ।
গো টু টপ