বিষ্ণুপ্রিয়া : একটি প্রেমবতী ভাষার আখ্যান

অথর- টপিক- অপিনিয়ন/লিড স্টোরি

আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হলো— বিষ্ণুপ্রিয়া আদতে ছিলো বিষ্ণুপুরীয়া । অর্থাৎ ভারতের মণিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুর থেকে উদ্ভূৎ শব্দটি; যেখানে বিষ্ণুপ্রিয়ারা সংখ্যায় প্রবল ছিলো । বিষ্ণুপ্রিয়ার সুদেষ্ণা সিংহকে দুনিয়ার পয়লা আদিবাসী ভাষাশহিদ বলা হয় । ১৬ মার্চকে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।


বিষ্ণুপ্রিয়া— কী চমৎকার একটি ভাষার নাম । বুকে আগলে রাখা প্রেয়সীর মতো সুন্দর । লেখার শুরুতে আপনাদের আরও চমৎকার দুটি তথ্য দিচ্ছি—

এক. বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ । তার মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । [1] দুই. পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দুটি ভাষার জন্যে মানুষকে লড়াই করতে হয়েছে রক্ত দিয়ে— বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া । এ ছাড়া তামিল ও কন্নাড়া ভাষাসহ আরও কয়েকটি ভাষার জন্যে লড়াই করতে হয়েছে মানুষকে । কিন্তু রক্ত দেয়ার কৃতিত্ব কেবল এ দুটিরই । বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য যে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে, সে-সংগ্রাম বাংলাভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর । আমরা সে-আলোচনায় একটু পরে আসবো ।

পূর্বকথা

আগেই জানিয়ে রাখি, ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে উদ্ভূত মণিপুরি সম্প্রদায়ের ভাষা মূলত দুটি— মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া । বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাটি আর্য ভাষা এবং বাংলা-অসমিয়া ভাষা পরিবারের সদস্য বিধায় আমরা ক্রমনীতি অনুসারে এই ভাষার আলোচনাটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছি । প্রকারন্তরে মৈতৈ ভাষাটি অনার্য ভাষার শ্রেণিভুক্ত এবং তিব্বতি-বর্মী ভাষা পরিবারের সদস্য । একই সম্প্রদায়ের জন্যে দুটি ভাষা হলো কী করে এবং সেই দুই ভাষা কেনো দুই মেরুতে অবস্থান করে— সে প্রশ্ন যারা করবেন, তাদের শুধু এইটুকু বলছি— বিষ্ণুপ্রিয়ারা ককেশয়েড মহাজাতির আর্য-ভারতীয় উপপরিবারের অন্তর্গত এবং মৈতৈরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির তিব্বতী-বর্মী উপ-পরিবারের অন্তর্গত । বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়ার মতো মৈতৈ ভাষাভাষী মানুষও রয়েছেন, তবে বিষ্ণুপ্রিয়ারাই জনসংখ্যায় প্রবল । আরও একটি জাতি রয়েছে মণিপুরিদের— পাঙন; যারা জাতিতে আর্য, কিন্তু কথা বলে অনার্য মৈতৈ ভাষায় । পর্যায়ক্রমে সে-ভাষার আলোচনাও আমাদের এই সিরিজে স্থান পাবে । ততোদিন অপেক্ষায় থাকুন ।

বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া

মনে রাখতে হবে, বিষ্ণুপ্রিয়ারা আঞ্চলিক কারণে মণিপুরি, ভাষিক কারণে নয়, ভাষিক কারণে তারা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি; একই সাথে এটি তাদের জাতিগত নামও । সাম্প্রদায়িকভাবে মণিপুরে প্রায় ত্রিশটিরও বেশি বৈচিত্র্যময় জাতির বসবাস রয়েছে । ভাষাগত ও ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের মণিপুরিরা তিনটি শাখায় বিভক্ত— বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ, পাঙন; মণিপুরি মুসলিমদের পাঙন বলা হয়।[2] যেমন— বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে, তাদের মধ্যে ভারতীয়রা ‘বাঙালি’ এবং বাংলদেশিরা ‘বাংলাদেশি’ । আবার বাংলাদেশিদের মধ্যেও বিভিন্ন জাতি রয়েছে— ধর্মীয় কারণে, অন্য জাতিসত্তার অধিকারী হওয়ার কারণে কিংবা আঞ্চলিক কারণে । বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ দুটি জাতিকেই রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজে ‘মণিপুরি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে । ১৮৮৯ সনে প্রকাশিত ভারতের ভাষানীতির ভিত্তি স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের Linguistic Survey of India গ্রন্থে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের স্পস্টভাবে ‘বিষ্ণুপুরীয়া মণিপুরি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।[3]

এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হলো— বিষ্ণুপ্রিয়া আদতে ছিলো বিষ্ণুপুরীয়া । অর্থাৎ ভারতের মণিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুর থেকে উদ্ভূৎ শব্দটি; যেখানে বিষ্ণুপ্রিয়ারা সংখ্যায় প্রবল ছিলো । বাংলাদেশে মণিপুরিদের অভিবাসনের ইতিহাসটা এমন— মণিপুরিদের আদিভূমি ভারতের উত্তর-পুর্বাঞ্চলের মণিপুর রাজ্য হলেও বিগত অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে নানান রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের কারণে, বিশেষ করে ১৮১৯-১৮২৫ সনে সংঘটিত ৭ বছরব্যাপী বার্মা-মণিপুর যুদ্ধের সময় ব্যাপক সংখ্যক মণিপুরির অভিবাসন ঘটে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে— আসামের কাছাড়ে, ত্রিপুরায় এবং বাংলাদেশে ।[4]সে-সময় তৎকালীন মণিপুরের রাজা চৌরজিৎ সিংহ, তার দুই ভাই মারজিৎ সিংহ ও গম্ভীর সিংহ সিলেটে আশ্রয়গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে আসা মণিপুরিরা সর্বপ্রথম ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় বসতি স্থাপন করে, যেটি বর্তমানে মণিপুরি পাড়া (বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদের পূর্ব পাশ) নামে খ্যাত। সেখান থেকে দেশের সর্বত্র বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, ময়মনসিংহের দুর্গাপুর এবং প্রধানত বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়ে তোলে।[5]

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা বাংলাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন (ভানুবিল কৃষক প্রজা আন্দোলন), ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু মণিপুরিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছে এবং শহীদ গিরীন্দ্র সিংহ, রবীন্দ্র সিংহসহ তাদের অনেকেই বীরত্ব প্রদর্শন করে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছেন ।[6]

জনসংখ্যা

মণিপুরিদের মধ্যে মৈতৈ ভাষাভাষীরা মোটামুটি শক্তিশালী, যার কারণে সে-অঞ্চলের বহু বিষ্ণুপ্রিয়াভাষীরাও মৈতৈ ভাষা গ্রণ করে নিয়েছে। ফলশ্রুতিতে মৈতৈ ভাষার প্রভাবে খোদ মণিপুরেই বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা বিলুপ্তপ্রায় । যদিও ভারতের সাম্প্রতিক সেন্সাস থেকে মণিপুরের জিরিবাম অঞ্চলে এখনও কয়েক হাজার বিষ্ণুপ্রিয়াভাষীর পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ১৯৫১ সনের সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র ভারতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনসংখ্যা  হলো ১১৪ জন, অথচ এর ৬০ বছর আগে ১৮৯১ সনে স্যার গ্রিয়ারসন মণিপুরে এবং সিলেটে প্রায় ২৩,০০০ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি অস্তিত্বের কথা উল্লেথ করেছেন । একইভাবে ১৯৬১ সনে আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের জনসংখ্যা মাত্র ১ জন নারী দেখানো হয়, অথচ সেখানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের জনসংখ্যা ছিলো ২২,০০০ এরও বেশি। ত্রিপুরায়ও ২০,০০০ বিষ্ণু্প্রিয়া মণিপুরির বিপরীতে গননা করা হয় মাত্র ১১ জন পুরুষ। এমনকি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের ঘনবসতিপুর্ণ অঞ্চল কাছাড়ের প্রায় ৬৬,০০০ এর জায়গায় ধরা হয় ১৫,১৫৫ জন । আবার দেখুন, ১৯৭১ সালে সেই পাথারকান্দির জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১০,১৬৪ জন ।[7] প্রশ্ন হতে পারে— ১ জন নারী ১০ বছরে কোন পুরুষের সহায়তা ছাড়াই ১০,১৬৪ জন কী করে জন্মদান করলো?

উইকিতে মণিপুরিদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাভাষীদের যে-সংখ্যা দেখানো হয়েছে, তা হলো— আসামে ৩ লাখ; ত্রিপুরায় ৬০ হাজার; অরুণাচল প্রদেশে ১ হাজার; নাগাল্যান্ডে ১৫০ জন; মিজোরামে ১০০ জন, দিল্লিতে ১০০ জন; মণিপুরের নিঙথৌখঙে ১২ হাজার, বিষ্ণুপুরে ১০ হাজার ও জিরিবামে ৫ হাজার; মেঘালয়ে ২ হাজার, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে ২ হাজার, মিয়ানমারে ১ হাজার । এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৬০ হাজার জন । তবে কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয় নি । কিন্তু এসআইএল ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪০ হাজার ।[8] সে-হিসেবে ২০১৭ সালে ৬০ হাজার অনুমান আশা করি ভুল হবে না । যা-হোক, তাতে সারাবিশ্বে বিষ্ণুপ্রিয়াদের জনসংখ্যা মোট দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৩ শত ৫০ জন ।সংগ্রাম সফলতা

আসাম ও ত্রিপুরায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলন দানা বাঁধে ১৯৫০ সন থেকে। অর্থাৎ মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে চলেছে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষীদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। ১৯৫৫ সনে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর দাবীতে ‘নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি মহাসভা’র উদ্যোগে ভাষা পরিষদ গঠিত হয় । ভাষিক সংখ্যালঘু বিষয়ক কমিশনসহ নানান রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে পত্র ও স্মারকলিপিসহ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি নেতৃবৃন্দের বৈঠক হয় বারবার ।[9]৬১ সালের ২ জুলাই ভাষাপরিষদ ‘ভাষা দাবী দিবস’ পালন করে। ৬৫ সালের ২-৮ জুলাই ভাষা দাবী সপ্তাহ পালিত হয়। ৬৭-তে দাবীটি সপ্তাহ ছাড়িয়ে ১২ দিনে দীর্ঘায়িত হয় । সমানতারে চলে কাছড়ের সর্বত্র সভা-সমাবেশ । ৬৮ সালের মে মাস থেকে স্কুল, কলেজসহ রাস্তা ঘাটে পিকেটিং, ধর্মঘট, গণশ্লোগানের কার্যক্রম শুরু হয়। পোড়ানো হয় উপনিবেশিক আদমশুমারী প্রতিবেদন । ৬৯ সালের মধ্য অক্টোবরে শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে রক্তস্বার কর্মসূচি পালন করে। তারপরই ভাষাবিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় ৭ জনকে । একমাসের মধ্যে গ্রেপ্তার সংখ্যা ৩৮৫ জনে উন্নীত হয় । প্রতিবাদে নভেম্বরের শুরুতে আয়োজিত ১১-১৩ গণসমাবেশের পরপরই ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ফেলে সংগ্রামী জনতা ।

আবার ধরপাকড়, আবার সমাবেশ । এই মাসেই অন্তত দেড় হাজার ছাত্র-শিক্ষার্থীকে কারাগারে পাঠানো হয় । ৭০-এ আসে অনশন । ৭২ পর্যন্ত একই ধারা চলতে থাকে । ৭৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারি, বাঙালির মাতৃভাষা দিবসের দিন ধর্মঘট কর্মসূচী করে তারা । ৮৩-তে আসামের রাজ্য সরকারের কেবিনেট সিদ্ধান্ত নেয় কাছাড় ও করিমগেঞ্জের স্কুলগুলোতে বিষ্ণুপ্রিয়াকে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কিন্তু  বাস্তবায়ন হয় নি । ৮৫-এর ২ জুলাইতে আবার আন্দোলনের ডাক আসে । ৮৯ সালের জুলাইতে তারিখে সরকার একটি নোটিফিকেশন করে এবং আবার তা স্থগিতও করে।  ৯২-তে ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে ১৫ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে চরমপত্র দেয় এবং যথানিয়মে তা অগ্রাহ্য হয় । গঠিত হয় ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি গণসংগ্রাম পরিষদ’। ৯২ থেকে ৯৫ পর্যন্ত দফায় দফায় কর্মসূচি চলে এবং বরাক উপত্যকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে ।

৯৫-এর মে মাসে ত্রিপুরা রাজ্য সরকার প্রাথমিক স্কুলে বিষ্ণুপ্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে । এবং আসামে ৫০১ ঘন্টার রেল অবরোধ কর্মসূচীর ঘোষিত হয় । ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ কর্মসূচীতে পুলিশ গুলি চালায়, তাতে বিলবাড়ি গ্রামের বিষ্ণুপ্রিয়া সুদেষ্ণা সিংহ (৩২) নামের এক তরুণী শহিদ হলে গোটা আসাম বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই ঘটনায় অনেক ‘ভাষাবিদ্রোহী’ আহতও হন । অবশেষে আসাম সরকার বিষ্ণুপ্রিয়াকে মেনে নেয় ।[10]

৯৯-এর ৯ এপ্রিল প্রদত্ত একটি রায়ের মাধ্যমে ভারতের গৌহাটি হাইকোর্ট জনগোষ্ঠীর নাম ‘মণিপুরি’ হিসাবে চিহ্নিত করে । ভারতের অসম ও ত্রিপুরা সরকারের ‘ওবিসি’ তালিকার মধ্যে মণিপুরি মৈতৈ, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, মণিপুরি ব্রাহ্মণ ও মণিপুরি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্তিকে আইনগতভাবে অনুমোদন করে। এরপর ভারত সরকার অসম ও ত্রিপুরা রাজ্যের স্কুলগুলোতে মণিপুরি মৈতৈ ও মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া উভয় ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয় । ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বরাক উপত্যকার ১৫২টি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি থেকে চালু হয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় পাঠ্যবই ‘কনাকপাঠ’। তারপর আরও একটি আইনি লড়াইয়ের পরে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের এক যুগান্তকরী আদেশে ২০০৬ সালের ৮ মার্চ ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ ভাষা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পায়।[11]

বিষ্ণুপ্রিয়ার সুদেষ্ণা সিংহকে দুনিয়ার পয়লা আদিবাসী ভাষাশহিদ বলা হয় । ১৬ মার্চকে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় ।

শ্রেণিবিচার

পূর্বের ভাষাগুলির মতোই, তবে সামান্য একটু পার্থক্য আছে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভুক্ত হয়ে ইন্দো-ইরানীয় ভাষাজাত, পেরিয়ে ইন্দো-আর্য ভাষা শ্রেণিতে পড়েছে । এ-পর্যন্ত আগের মতোই ঠিকঠাক । কিন্তু বাংলাভাষা যেমন এসেছে গৌর প্রাকৃত বা মাগধী থেকে, বিষ্ণুপ্রিয়া আসেছে শৌরসেনী প্রাকৃতর অপভ্রংশ থেকে । এ ভাষার কোড—আইএসও ৬৩৯-২ : incও আইএসও ৬৩৯-৩ : bpy।[12] গ্লটলগ কোড— bish1244। [13]

বিষ্ণুপ্রিয়ার দুটি উপভাষা রয়েছে— রাজারগাঙ ও মাদইগাঙ। বাংলাদেশে মাদইগাঙ ভাষাভাষীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ‘রাজার গাঙ’, মানে ‘রাজার গ্রাম’। ‘মাদাই গাঙ’ মানে ‘রানির গ্রাম’।

ইমার ঠার’

আমরা যেমন আমাদের মায়ের ভাষাকে বলি মাতৃভাষা, বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরিরা তাদের ভাষাকে বলে ‘ইমার ঠার’; যার শাব্দিক অর্থ— ‘আমার মায়ের ভাষা’। এই ভাষার বিকাশ ঘটেছিলো প্রাচীন ভারতের মনিপুর রাজ্যের লোকতাক (Loktak Lake) হ্রদ-সংলগ্ন অঞ্চলে । এর সর্বপ্রাচীন নমুনা পাওয়া যায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে পণ্ডিত নভকেন্দ্র শর্মার রচিত খুমল পুরাণে । বাংলাভাষার মতোই বিভিন্ন ভাষার শব্দাবলি মিলে এ-ভাষার শব্দ সম্ভার তৈরি হয়েছে । ভাষাবিদদের মতে— বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় তৎসম শব্দ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার, অর্ধ-তৎসম আছে প্রায় দেড় হাজার, তৎভব শব্দ প্রায় ২ হাজার, হিন্দী-বাংলা ও অসমিয়া শব্দ আছে প্রায় ৮ হাজার, মৈতৈ শব্দ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার, আরবী-পার্শি শব্দ প্রায় ২ হাজার, ইংরেজিও অনুরূপ এবং দেশি শব্দও আছে প্রায় সমসংখ্যক পরিমাণ ।[14] তবে মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া উভয় ভাষাতেই পার্বত্য নাগা ও কুকিভাষার প্রভাব রয়েছে। শব্দভাণ্ডারের দিক থেকে উভয় ভাষাতেই ব্যবহৃত হয় এমন শব্দসংখ্যা আছে চার হাজারেরও বেশি।

কে পি সিনহার মতে, নব্য ইন্দো-আর্য ভাষার উৎপত্তির কালে, কিংবা তার ঠিক পরেই—অর্থাৎ ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতকে—ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার উদ্ভব। শুরুতে এই ভাষা ভারতের মণিপুর রাজ্যে প্রচলিত হয়। এই নতুন ভাষা মোটামুটি পূর্ণাঙ্গতা পায় ষোলো শতকে। তেরো থেকে ষোলো শতক পর্যন্ত বিষ্ণুপ্রিয়া ও মেইতেই জনগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বিষ্ণুপ্রিয়াতে মেইতেই শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। উনিশ শতকের শুরুতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় ব্যাপকভাবে ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের শব্দাবলি প্রবেশ করে।

অহমিয়া ও বাংলার সঙ্গে এই ভাষার সাদৃশ্য থাকায় একে বাংলা বা অহমিয়ার উপভাষাও বলা হয়ে থাকে। তবে পণ্ডিতদের অনেকেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। জর্জ গ্রিয়ারসন তার লিংগুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়াতে (১৯০৩) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা সম্পর্কে লিখেছেন—[বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি] ভাষার মধ্যে দুই ভাষার (অহমিয়া ও বাংলা) বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলেও উভয়ের সঙ্গেই এর বড় ধরনের পার্থক্য আছে।’ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় এ-যাবৎ সংগৃহীত ৩০ হাজার শব্দসম্ভার রয়েছে।[15]

বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার নিজস্ব লিপি নেই, তাই লিখতে তারা বাংলালিপি ব্যবহার করে থাকে । তবে অসমিয়া লিপি থেকে দুটি বর্ণ—ৰ, ৱ—এই ভাষায় ব্যবহার করা হয়। অনেকেই বাংলার বদলে দেবনাগরী লিপি ব্যবহার করে থাকেন ।


বর্তমান যুগের বিষ্ণুপ্রিয়ার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকরা হলেন— ভারতের অধ্যাপক ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, ড. কালি প্রসাদ সিংহ, বরুণ কুমার সিংহ, দিল্স লক্ষ্মীন্দ্র কুমার সিংহ, দিল্স দেবজ্যোতি সিংহ প্রমুখ । বাংলাদেশে আছেন শুভাশীষ সমীর, অধ্যাপক রনজিত সিংহ, অসীম কুমার সিংহ প্রমুখ । এঁদের অনেকেই মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়াসহ বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দি, অসমিয়া প্রভৃতি ভাষায় সমানভাবে পারদর্শী।


ব্যাকরণ

বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাটি ব্যাকরণের দিক থেকে, বিশেষ করে ধ্বনিতত্ত্ব ও শব্দকোষ মণিপুরি মৈতৈ ভাষা দ্বারা প্রভাবিত। তবে আর্য-ভারতীয় ভাষাশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিষ্ণুপ্রিয়া বাক্যরীতির সাথে বাংলা, অসমিয়া, হিন্দী ও উড়িয়া ভাষার মিল পাওয়া যাবে।

পদের উদাহরণ : নিম্নে ভাষার সর্বনাম, বিশেষ্য, বিশেষণ ও সংখ্যারূপের কয়েকটি উদাহরণ দেয়া গেলো—

সর্বনাম পদ ক্রিয়াপদ  বিশেষণ পদ  সংখ্যা 
আমি- মি বসা- বহানি ভালো- হবা এক- আগ
তোমরা- তুমি দাঁড়ানো- উবাঅনি মন্দ- হবানেই দুই- দুগো
তুমি- তি বলা- গুজুরানি, টটরানি সুন্দর- চুনা দশ- দশগো
সে- (পুং) তা /(স্ত্রী) তেই পড়া- তামকরানি, পাকরানি বিশ্রী- থি বিশ- আক্কুড়ি
তারা- তানু লিখা- ইকরানি নরম- কঙালা পঞ্চাশ- য়াঙখেই
আমরা- আমি গান করা- এলাদেনা শক্ত- দদা একশত- আহৌ
আমাদের- আমারতা তৈরি করা- হঙকরানি সুগন্ধ- নুংশি হাজার- লিশিং

ক্রিয়াভেদ :বচনভেদে ক্রিয়ার রূপ পরিবর্তিত হয়। যেমন— মি লেইরিক তামকরুরি (আমি বই পড়ি), এটা বহুবচনে গিয়ে হবে— আমি লেইরিক তামকররাঙ (আমরা বই পড়ি) । লিঙ্গভেদেও ক্রিয়ার পরিবর্তন হয়। যেমন— সে বই পড়ে, এটা পুরুষের ক্ষেত্রে হবে, তা লেইরিক তামকরের এবং নারীর ক্ষেত্রে হবে, তেই লেইরিক তামকরিরি । চাটগাঁইয়া ভাষার মতো এ ভাষায়ও না-বোধক বাক্যতে ‘না’ বসে ক্রিয়ার পুর্বে । যেমন— তি লেইরিক না তামকরর (তুমি বই পড় না) । তবে প্রশ্নবোধক বাক্য হলে বিভক্তি বসে ক্রিয়ার পরে । যেমন— তি লেইরিক তামকররগো? (তুমি কি বই পড়?) ।

দিক : এ-ভাষায় পুর্ব,পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ দিকের নামকরণ করা হয় যথাক্রমে ‘মুঙ, পিছ, অওয়াঙ, খা’ নামে।

ব্যবহার : কয়েকটি উদাহরণ দেয়া গেলো—[16]

বাংলা বিষ্ণুপ্রিয়া
কেমন আছেন? কিসারে কিতা/কিমে কিসাদে
ধন্যবাদ, আমি এখন বাড়ি যাবো থাকাত, মি এবাকা গরে যিতৌগা
এই সংবাদটি তাড়াতাড়ি পাঠাও পৌ এহান চালাক্ক দিয়াবেঠা
সে আমার বন্ধু তা মোর মারুপগো
তোমার চেহারা ভারি সুন্দর তর মেইথঙহান জবরে চুনা
তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে? তি মর লগে আহরগো/আহুরিগো?
তুমি কি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা জানো? তি ইমার ঠার হারপারগো?
রবীন্দ্রনাথের লেখা আমার বেশ পছন্দ রবীন্দ্রনাথর ইকরা মরতা হবা লাগের
আমি তোমাকে ভালোবাসি মি তরে বানা পাউরি

সাহিত্য-সংস্কৃতি

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার প্রাচীন আমলের সাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— আপাঙর য়্যারী (লোককথা), লোকগান, লোককবিতা, ছড়া ও পৌরেই (প্রবচন) । এদের মধ্যে রয়েছে বরন ডাহানির এলা বা ‘বৃষ্টি ডাকার গান’ (রচনাকাল, ১৪৫০-১৬০০ খ্রি.) এবং প্রাচীন জীবনযাত্রা নিয়ে রচিত ‘মাদই সরারেলর এলা’র কথা (রচনাকাল ১৫০০-১৬০০ খ্রি.)  ইত্যাদি । এখনও খরার সময় বৃষ্টি কামনা করে বিষ্ণুপ্রিয়ারা তাদের ঐতিহ্যবাহী বৃষ্টি ডাকার গান পরিবেশন করে থাকে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে তৎকালীন বৃটিশ ভারতের রাজনৈতিক এজেন্ট Colonel McCullock তার Valley of Manipur and Hill Tribes গ্রন্থে ইংরেজি, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরি মৈতৈ ভাষার তুলনামুলক সংক্ষিপ্ত অভিধান প্রণয়ন করেন। বিংশ শতকর তৃতীয় দশক থেকে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী সাহিত্যের আধুনিক যুগ শুরু হয় । সে-সময়কার প্রধান চার লেখক হলেন— লেইখমসেনা সিংহ (নাটক: বভ্রুবাহন, মণিপুর বিজয়), মদনমোহন শর্মা (গ্রন্থ: বালিপিন্ড, হরিশ্চন্দ্র, সুবলমিলন, তিলত্তমা, বাসক, সুদমাবিপ্র), আমুসেনা সিংহ (নাটক: অঙ্গদ রায়বার, শক্তিশেল, তরনীসেন বধ, নাগপাশ, মহীরাবণ বধ) এবং গোকুলানন্দ গীতিস্বামী (মাতৃমঙ্গল গীতাভিনয় নাটক, সমাজ জাগরণমূলক নানান পদাবলি, এলা, বারো কবিতা)। এ-ছাড়া রোহিনী রাজকুমার, গোলাপসেনা সিংহ বারো গোষ্ঠবিহারী সিংহের নামও উলেখ করা যায় ।

বিষ্ণুপ্রিয়ারা মণিপুর ছাড়ার পরপরই নিজেদের ভাষা প্রায় ভুলতে বসেছিলো। বর্তমানে এই ভাষায় প্রচুর সাহিত্য চর্চা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের আধুনিক বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্য পত্র-পত্রিকার হাত ধরে নাটক, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনীর পথ পেরিয়ে অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। বিশ্বের নানান ভাষার সাহিত্য বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। যেমন—

পত্রপত্রিকা : বাংলাদেশে মণিপুরি সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয় ১৯২৫ সনে শ্রীফাল্গুনী সিংহ সম্পাদিত মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার দ্বিভাষিক সাময়িকী ‘জাগরণ’ প্রকাশনার মাধ্যমে । এ সময়কালে আরো কয়েকটি দ্বিভাষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যেমন— ‘মেখলী’ (১৯৩৩), ‘মণিপুরি’ (১৯৩৮), ‘ক্ষত্রিয় জ্যোতি’ (১৯৪৪) ইত্যদি। ১৯৭২ সনে প্রকাশিত ‘খঙচেল’ স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যের প্রথম প্রকাশনা। এরপর ৭৭ সনে ‘ইমার ঠার’, ৮৫-তে ‘সত্যম’, ৮৮-তে ‘মিঙাল’, ৮৯-তে ‘মণিপুরির সাহিত্য’ ও ‘পৌরি’, ৯০-তে ‘জাগরণ’, ৯১-তে ‘যেবাকা যেদিন’ ৯৪-তে ‘ইথাক’, ৯৮-তে ‘তেইপাঙ’, ৯৯-তে ‘গাওরাপা’, ২০০৩-এ ‘মণিপুরি থিয়েটার পত্রিকা’ ০৪-এ ‘কুমেই’, ০৫-এ ‘পৌরি পত্রিকা’ ইত্যাদি নামক সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা বাংলাদেশের বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যকে গতিশীল করেছে ।

গ্রন্থ : গোপীচাঁদ সিংহের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ এবং রণজিত সিংহের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে মণিপুরি সমাজ’ গ্রন্থ দুটি বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় রচিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অসামান্য গ্রন্থ । কাব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাংলাদেশ মণিপুরি সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত ‘থাম্পাল’, ‘নিয়োতি’, ‘চিকারী বাগেয়া’ ও ‘কনাক কেথক’ এবং মণিপুরি তথ্য ও গবেষণা কেন্দ্র (পৌরি) প্রকাশিত ‘রসমানজুরি’, ‘জীর মেরিক’, ‘তোর নিংসিঙে’, ‘ছেয়াঠইগীর যাদু’, ‘তানকালেই’ ইত্যাদি এবং মণিপুরি থিয়েটার প্রকাশিত ‘সেনাতম্বীর আমুনিগৎত সেম্পাকহান পড়িল অদিন’ ও ‘বিষ্ণুপ্রিয়া, চাকমা ও মান্দি ভাষার কবিতা সংকলন ‘রৌদ্রজলের পংক্তিমালা’ । কবি রনজিত সিংহের ‘বলি ইয়া আছৎ, দাদা’ কবিতার কয়েকটি লাইন এমন— ‘হারৌহানে বাহেছিলে মোরে পেয়া/ আকখুলাগয় তর গরে-মাংকলে-কোঠাৎ বয়া/ কতিয়ৌ সহজ করে পানা;/ কিন্তু বিধির বিধানে লেখা/ বিদায় লগ্নৎ নাহে ইল দেখা/ তেব অনন্তকাল সুপৌ দুক্খ নাকেকা পানা।’ কবি নিজেই তাঁর কবিতার তর্জমা করেছেন— ‘আনন্দে বিভোর ছিলে আমাকে পেয়ে/ একা, তোমার ঘরে-উঠোনে-সাজকক্ষে/ কতই না সহজ ছিলো এ পাওয়া!/ কিন্তু বিধির বিধানে লেখা/ বিদায় লগ্নে হলো না দেখা/ তবু অনন্তকাল যেন হয় না এ দুঃখ বাওয়া।’[17]

অনুবাদ : পৌরি প্রকাশিত ‘কুরৌ আহান রবীন্দ্রনাথ’ বাংলাদেশের বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘রুদ্রচন্দ্র’ নাটকটিরও অনুবাদ হয়েছে। বঙ্কিমমসাহিত্য, শরৎসাহিত্য, কালিদাসের মেঘদুতম, ইষোপনিষদ, শ্রীমদভাগবতগীতা, বাইবেল, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, সফোকিসের আন্তিগোনে, উইলিয়াম শেক্সপীয়রের নাটক, জাপানী হাইকু কবিতা বাংলাদেশেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অনুবাদ হয়েছে বেরতোল্ড ব্রেশ্ট, বোদলেয়ার, লোরকা, পলএল্যুয়ার, মালার্মে, এজরা পাউন্ড, রিলকে, বোর্হেসের লেখা পর্যন্ত । এমনকি বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার অনেক সাহিত্য বাংলা, অসমিয়া, ককবরক, হিন্দী, ইংরেজি ভাষায় অনুবাদিত হয়ে সাড়া জাগিয়েছে বোদ্ধামহলে । সম্প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়ারা প্রকাশ করেছে বিশ্বের প্রায় ষাটটি ভাষার অনুবাদ কবিতার সংকলন ‘অনুবাদকল্প’ ১ম ও ২য় খণ্ড।

সাহিত্যিক : বর্তমান যুগের বিষ্ণুপ্রিয়ার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকরা হলেন— ভারতের অধ্যাপক ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, ড. কালি প্রসাদ সিংহ, বরুণ কুমার সিংহ, দিল্স লক্ষ্মীন্দ্র কুমার সিংহ, দিল্স দেবজ্যোতি সিংহ প্রমুখ । বাংলাদেশে আছেন শুভাশীষ সমীর, অধ্যাপক রনজিত সিংহ, অসীম কুমার সিংহ প্রমুখ । এঁদের অনেকেই মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়াসহ বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দি, অসমিয়া প্রভৃতি ভাষায় সমানভাবে পারদর্শী ।

গবেষণা : গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ছন্দ পরিচয়’, ‘ভানুবিল কৃষক প্রজা আন্দোলন বারোহ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজ’ উল্লেখ করার মতো।

গান : গানই বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন মনে করা হয় । তাদের বিখ্যাত ‘বরন ডাহানির এলা’ গানটি

৯টি ‘পদো বা পংক্তিতে বিভক্ত । গানটির প্রথম দিকের কথাগুলো হলো— “সরালেলতে রাজারো লেইপাক কুমৌ কইলো/লেইপাকে মাড়ায় মাখঙে খইমুরে জাঙাল দিলো।/ খুমলর মাটি হুকেইলো, বরন দিয়াদে দৌরাজা ।/লুকোঙ মাহেই লুকুলিল, বরন দিয়াদে দৌরাজা ।” অর্থাৎ— সরালেল তুমি দেবতাদের রাজা, একটু দয়া করো/ খইমু ঘাসে আর নানান জিনিষে তৈরী করেছে বাঁধ/ খুমোলের মাটি খরায় ফেটে যায়, বৃষ্টি দাও হে দেবরাজ/ খা খা করে আজ খুমোলের ভুমি, বৃষ্টি দাও হে দেবরাজ ।[18]

বিষ্ণুপ্রিয়াদের ধর্ম

পাঙনরা জাতিতে আর্য অর্থাৎ বিষ্ণুপ্রিয়া জাতিভুক্ত এবং মুসলিম—সে-কথা আমরা আগেই বলেছি । তবে মণিপুরিদের নিজস্ব লৌকিক ধর্মের নাম ‘আপোকপা’; যা অত্যন্ত প্রাচীন, আধ্যাত্মিকতায় গভীর ও দার্শনিকভাবে উচ্চস্তরের । প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী তারা মনে করে— সৃষ্টিকর্তা নিজের প্রতিকৃতি থেকে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি মানুষ সৃষ্টিকর্তার একেকটি ছায়া। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মণিপুরিরা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হলেও বিষ্ণুপ্রিয়াদের একাংশের মধ্যে এখনও ‘আপোকপা’ পূজার প্রচলন রয়েছে ।[19]

বর্তমান অবস্থান

বর্তমানে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় বিষ্ণুপ্রিয়া জনগোষ্ঠীর লোক বাস করে। বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাদেশি ব্যতীত অন্য কোনো জাতির স্বীকৃতি নেই । তাই বলে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা আটকে পড়া বিহারিদের মতো ভাগ্য বরণ করতে রাজি হয় নি । বরং বাংলাদেশে যে তারা উপজাতি, এটা স্বীকার করেই আধুনিক বাংলাদেশের শিক্ষা, চাকুরি ও বেতার টিভিতে অনুষ্ঠান করার সুযোগ গ্রহণ করে আসছে । ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র থেকে প্রতি সপ্তাহে ‘মণিপুরি অনুষ্ঠান’ শিরোনামে পর্যায়ক্রমে বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয় এবং এই অনুষ্ঠানের সম্প্রচার এখনো অব্যাহত রয়েছে। ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সাহিত্য শিংলুপ’ নামে তাদের একটা সাহিত্য সংগঠনও আছে । বাংলাদেশ সরকার এই তাদের সংস্কৃতি বিকাশে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানায় একটি ‘মণিপুরি ললিত কলা একাডেমী’ স্থাপন করেছে। তাদের উদ্যোগে প্রতিবছর মার্চে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক ‘মণিপুরি সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসব’-এর আয়োজন হয়ে থাকে ।[20]এ ছাড়াও ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মণিপুরিদের সাংস্কৃতিক বিকাশকে অব্যাহত রাখতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স’ ।[21]

বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা ভারতে যেহেতু ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি লাভ করেছে, তাই আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের স্কুলগুলোতে এ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে।

সবিশেষ—২০০০ সালে জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে দুনিয়ার ১৮৮ টি দেশ বাংলাভাষর আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে মনোযোগ তৈরি হয়েছে দুনিয়ার সকলের মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি ও গুরুত্ব দেয়ার । কিন্তু বাংলাদেশে কি এই বিষয়ে এখনও কার্যকরি রাষ্ট্রীয় মনোযোগ তৈরি হয়েছে? মাত্র ৫ লাখ মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষাকে কতটা আদরে রাখলে সেই ভাষার জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিতে রাজি হয়—আমরা শুধু অনুভব করতে পারি । আমরা অবাকও হতে পারি— কিভাবে একটু একটু করে তারা তাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে চলছে । কিন্তু তারা জানে না— কতোটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়?

তথ্যসূত্র : 


[1] https://en.wikipedia.org/wiki/Surendra_Kumar_Sinha

[2] মৌলভীবাজার জেলার জনজীবন/ অধ্যক্ষ রসময় মোহান্ত, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৮৭

[3] Linguistic Survey of India/ Sir G. A. Greirson, Vol V, 1891, Page 419

[4] Religious development in Manipur in the 18th and 19th Century/ Dr M Kirti singh,Imphal, 1980, page 12-13

[5] বাংলাপিডিয়া, প্রকাশকঃ বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ২০০০, পৃষ্ঠা ৪৬৮

[6] স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের মণিপুরি সমাজ (১৯০১ -১৯৭১)- রণজিত সিংহ, ১৯৯৭

[7] মণিপুরি জাতিসত্তা বিতর্ক: একটি নিরপেক্ষ পাঠ/ অসীমকুমার সিংহ, সিলেট, ২০০২

[8] www.ethnologue.com/show_country.asp?name=Bangladesh

[9] ফাগু (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার পত্রিকা), বর্ষ ২, সংখ্যা ১০, শিলচর ১৯৬২

[10] বরাক উপত্যকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত ঘটনাপঞ্জী (১৯৫৫-১৯৯৬), পাভেল পার্থ, somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28778546

[11] Hammarström, Harald; Forkel, Robert; Haspelmath, Martin; Bank, Sebastian, eds. (2016). “Bishnupriya”. Glottolog 2.7. Jena: Max Planck Institute for the Science of Human History. http://glottolog.org/resource/languoid/id/bish1244

[12] www-01.sil.org/iso639-3/documentation.asp?id=bpy

[13] http://glottolog.org/resource/languoid/id/bish1244

[14] http://manipuri.freeservers.com

[15] বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

[16] ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮, www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28771374

[17] online-dhaka.com/newsarchive/ni/12010/

[18] Tribals and their Culture in Manipur and nagaland / G.K. Ghosh

[19] মৌলভীবাজার জেলার জনজীবন/ অধ্যক্ষ রসময় মোহান্ত, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৮৭

[20] মণিপুরিদের অন্য রকম একদিন, মুজিবুর রহমান, ২১-০৩-২০১১, http://archive.prothom-alo.com/print/news/140070

[21]www.bhorerkagoj.net/print-edition/2015/01/06/12788.php

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ