আবু জাফর শামসুদ্দীন : ত্রিকালদর্শী নিবেদিত সাহিত্যিক

অথর- টপিক-


আবু জাফর শামসুদ্দীনকে নিয়ে যে-আলোচনাটা আজকাল অনেকের জন্যেই বিব্রতকর, তা হলো—  তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা । যদিও তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের প্রভাত পণ্ডিতের পাঠশালায় । তবে ১৯২৪ সালে স্থানীয় একডালা মাদরাসা থেকে তিনি জুনিয়র মাদরাসা পরীক্ষা এবং ১৯২৯ সালে ঢাকা সরকারি মাদরাসা থেকে হাই মাদরাসা পরীক্ষায় পাস করেন । এরপর কিছুদিন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পড়াশোনা করেছেন বটে; কিন্তু এ পর্যন্তই ।[1]অনেকেই মনে করেন— আবু জাফর শামসুদ্দীন যেসময় মাদ্রাসায় পড়েছেন, সে সময় মাদ্রাসা থেকে বড় বড় জ্ঞানী গুণীর জন্ম হতো। তিনি মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন বলেই সর্বপ্রথম ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন ও ধর্মের নামে যারা গোমরাহি করেন তাদের বিরুদ্ধে সাহসী লেখনীর মাধ্যমে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন ।


এ ছাড়াও তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে—  মধ্যপ্রাচ্য, ইসলাম ও সমকালীন রাজনীতি, পরিত্যক্ত স্বামী, মুক্তি, প্রপঞ্চ, দেয়াল, জীবন, শেষ রাত্রির তারা, রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা, ল্যাংড়ী, নির্বাচিত গল্প,  চিন্তার বিবর্তন ও পূর্ব পাকিস্তানী সাহিত্য, সোচ্চার উচ্চারণ, সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস, লোকায়ত সমাজ ও বাঙালি সংস্কৃতি, বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা ইত্যাদি। তার বইগুলো রকমারি.কমে পেতে ক্লিক করুন এখানে…


সন্দেহ নেই, আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল লেখক । তবে বর্তমানে যে-অর্থে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটির ব্যাখ্যা করা হয়, তিনি সে-জাতীয় অন্ধত্ব থেকে ছিলেন বহুদূরে । সাধারণ অর্থে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। উপন্যাস, ছোট গল্প ও মননশীল প্রবন্ধ লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন।[2]

তার রচিত পদ্মা মেঘনা যমুনা বাংলার সাহিত্যের একটি অনন্য গ্রন্থ। এছাড়াও তার রচিত বেশ কিছু গ্রন্থ ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, জাপানি ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করা হয়েছে।[3]

একাডেমিক পড়ালেখার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হওয়ার পরেই তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সাংবাদিকতায় যোগ দেন। শুরুতে তিনি দৈনিক সুলতানের সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন । ১৯৩১ সালে তিনি সরকারের সেচ বিভাগে যোগ দেন। সেচের কাজ ছেড়ে কাজ ১৯৪২ সালে যান কটকে নির্মাণাধীন বিমানঘাটিতে তদারকি অফিসের হেড ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতে । মাত্র কয়েক মাস, তারপর আবার আসেন সাংবাদিকতায়—  এবার দৈনিক আজাদে । ১৯৪৮-এর অক্টোবরে দৈনিক আজাদ ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে তিনি হন সহকারী সম্পাদক । আজাদের  সাথে সম্ভবত বনিবনা হয় নি, তাকে দুই বছরের মাথায় তাকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং তিনি প্রকাশনা ব্যবসা সংস্থা কিতাবিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন । এর পরপরই ৫০ বা ৫১ সালের দিকে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের সম্পাদক হয়ে বসেন ।[4]

তিনি কিছুটা রাজনীতির সাথেও জড়িত ছিলেন । ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্মলগ্ন থেকেই তিনি এ দলের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলে এবং কিছুদিন ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন । ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী । ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন । এরপর ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমির অনুবাদ বিভাগের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১১ বছর দায়িত্ব পালক করে ১৯৭২ সালে অবসর নেন।[5]

এরপর আবার সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন । ১৯৭৫ সালে পূর্বদেশ বন্ধ হয়ে গেলে নিয়োগ পান দৈনিক সংবাদে । এ-সময়ই তিনি ‘অল্পদর্শী’ ছদ্মনাম ব্যবহার শুরু করেন এবং ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ নামে কলাম লিখতে থাকেন । একই সময় কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিভিন্নপদে দায়িত্ব পালন করেছেন।[6]

আবু জাফর শামসুদ্দীনকে বলা হয়, ত্রিকালদর্শী লেখক; সম্ভবত ব্রিটিশ উপনিবেশ আমল, পাকিস্তান শাসন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তকাল—  এই তিনটির সম্মিলন তার জীবন ও লেখালেখিতে বাস্তবরূপে ধরা দিয়েছিলো বলেই বলা হয় । তবে তিনি পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে তৈরি করেছিলেন বৃহত্তর লক্ষ্যে। এই প্রভাব তার সাহিত্যকর্মেও প্রতিফলিত হয়েছে । বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারণার বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে আবু জাফর শামসুদ্দীন তার তিন উপন্যাস ‘সংকর সংকীর্তন’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’র মধ্য দিয়ে মূলত বাঙালির নৃতাত্ত্বিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিযাত্রাকে ধারণ করেছেন।

কর্মজীবনে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৬৮ সালে উপন্যাসের জন্যে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৮৩ সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য একুশে পদক পান। এ ছাড়াও তার প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে—  সমকাল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), শহীদ নূতনচন্দ্র সিংহ স্মৃতিপদক (১৯৮৬), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), ফিলিপস পুরস্কার (১৯৮৮, মরণোত্তর) ইত্যাদি।

দেশপ্রিয় এই গুণী মানুষটি ১৯১১ সালের আজকের দিনে (১২ মার্চ) ঢাকার গাজীপুরের দক্ষিণবাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তার বাবার নাম মোহাম্মদ আক্কাছ আলী ভুঁইয়া । তার দাদা নাদিরুজ্জামান ভুঁইয়া ছিলেন জৈনপুরের বিখ্যাত পীর মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরীর শিষ্য ও স্থানীয় প্রতিনিধি (খলিফা) । সংসার জীবনে তার দাম্পত্যসঙ্গী ছিলেন আয়েশা আখতার খাতুন । ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন বেশ মৃদুভাষী । হাসিটি ছিল আরও মৃদু। গৌরবর্ণের চেহারায় একটা ঔজ্জ্বল্যের প্রলেপ ছিলো । শেষ বয়সেও তার উজ্জ্বলতা হারায়নি।[7] ১৯৮৯ সালের ২৪ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।


তথ্যসূত্র 


[1] আবু জাফর শামসুদ্দীন”। নক্ষত্র। ২০১৪। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬। www.nokkhotro.com/blog

[2] আবু জাফর শামসুদ্দীন এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধির সন্তান”। দৈনিক যায় যায় দিন (ঢাকা, বাংলাদেশ)। জুন ১৩, ২০১২। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬।

[3] আবু জাফর শামসুদ্দীন”। পড়ুয়া। ২০১৪। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬। http://www.porua.com.bd/author/abujafar-shamsuddin

[4] আব্দুল্লাহ আল সিফাত (২৪ আগস্ট, ২০১৪)। “আবু জাফর শামসুদ্দীন: সাহিত্যে নিবেদিত এক প্রাণ”। দৈনিক মানবকণ্ঠ (ঢাকা, বাংলাদেশ)। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬। www.manobkantha.com/2014/08/24/187451.html

[5] আবু জাফর শামসুদ্দীন”। দৈনিক সংবাদ (ঢাকা, বাংলাদেশ)। ১১ মার্চ, ২০১৩। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬। www.thedailysangbad.com/old/index.php?ref=MjBfMDNfMTJfMTVfMl8yM18xXzE3OTA4MQ==

[6] ইমরান রহমান (১১ মার্চ, ২০১৩)। “আবু জাফর শামসুদ্দীন”। দৈনিক আমার দেশ (ঢাকা, বাংলাদেশ)। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬। www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/12/191664#.VwvW2fl97Dc

[7] বুলবণ ওসমান। “শতবর্ষে আবু জাফর শামসুদ্দীন”। বাংলাদেশনিউজ। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল, ২০১৬। bdn24x7.com/?p=5994


 

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ