রাসূলুল্লাহ সা. ও মুক্তচিন্তা

অথর- টপিক- অপিনিয়ন/বিলিভারস

বর্তমান বিজ্ঞানোত্তর বিশ্বে সমধিক আদৃত বিষয়সমূহের শীর্ষে সদর্পে অবস্থান করছে যে বিষয়টি, বলা যায় যে তাহলো মুক্তচিন্তা। শিল্পের উৎকর্ষ, সাহিত্যের সৌকর্য, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা, প্রজ্ঞার বিকাশ  ̶  এসবের মৌল গাঠনিক পদার্থ হলো মুক্তচিন্তা। মুক্তচিন্তার অভাব ব্যক্তিকে করে শৃংখলিত, বুদ্ধিকে করে অনুর্বর, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ফেলে রাখে অকর্ষিত বেলাভূমে। মহানবী সা. পার্থিব ও ধর্মীয় উভয় পর্যায়ে গোটা মানব ইতিহাসে সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শকারী ব্যক্তি ছিলেন। মাইকেল এইচ হার্ট তার ‘দ্য হানড্রেড’ গ্রন্থের প্রথম ও শীর্ষ ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এভাবেই মূল্যায়ণ করেছেন এবং বলেছেন, ‘He was the only man in history who was supremely successful on both religious and secular levels.’ (The Hundred:3)

ইতিহাসের সার্থকতম ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা চয়ন করেছেন বৈশ্ব্যিক দূত হিসেবে, তিনি মুক্তচিন্তার জ্যোতি-লাবণ্য ছড়িয়ে যাবেন আমৃত্য, শৃঙ্খলিত বুদ্ধির স্বাধীনতায় পক্ষে সংগ্রাম করে যাবেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, এটাই ছিল স্বাভাবিক। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে মহানবী সা. কীভাবে মুক্তচিন্তা চর্চা করেছেন, মুক্তচিন্তার পক্ষে সংগ্রাম করেছেন, মুক্তচিন্তাকে আশ্রয় দিয়েছেন, আদর করেছেন তা যৌক্তিক আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

মুক্তচিন্তা (Free Thought) একটি আধুনিক পরিভাষা। এর মৌল সুর হলো, ‘জ্ঞান ও যুক্তির অনুপস্থিতিতে দাবিকৃত কোন মতকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ বা বর্জনা না করা।’ এই সুরকে বিবেচনায় রেখে অগ্রসর হলে দেখা যাবে, মহানবী সা. হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি মুক্তচিন্তার প্রথম রাজপথ নির্মান করেছেন খোদ আল্লাহ তাআলার তত্তাবধানে। এর অন্যতম উদাহরণ, তাদানিন্তন পৃথিবীতে কর্তৃত্বরত সকল চিন্তা-জীবনধারা অশৈশব বর্জন করে অনুসন্ধান করেছেন তিনি নিটোল-অটুট সত্যের- (সূরা আদ্-দুহা)। আরব উপদ্বীপে হাজার বছরের লালিত-আদৃত পৌত্তলিকতার বিপক্ষে চলেছেন তিনি শিশুকাল থেকেই। তাইতো কখনো তাকে দেখা যায়নি কোনো প্রতিমার কাছে প্রার্থনা করতে, এমনকী প্রতিমার নামে জবাইকৃত কোনো পশুর মাংস খেতে, (বুখারী, কিতাবুয যাবাইহ ও ওয়াস্ সাইদ) ।

আরব ঊপদ্বীপে খ্রীষ্টবাদ, ইহুদিবাদ, সাবেয়া সহ নানা ধর্ম-দর্শন ও চিন্তার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. এর কোনোটাতেই নিজেকে আরোপিত করেননি। তিনি বরং নবুওতের পূর্বেও চলেছেন চর্চিত প্রথার বিরুদ্ধে।

ওহীপ্রাপ্তির পর রাসূলের (সা.) মুক্তচিন্তাচর্চা শক্তি পেয়েছে কল্পনাতীতভাবে। চিরায়ত প্রথার প্রতি নমনীয়তা দেখালে তাকে দেয়া হবে সিংহাসন, অথবা রূপসী নারী কিংবা অঢেল সম্পদ। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না কোনোটাতেই। এক হাতে সূর্য এবং অন্য হাতে চাঁদ তুলে দিলেও তিনি ক্ষান্ত হবেন না প্রথার বিরুদ্ধে চলা থেকে – পরিষ্কার ভাষায় শুনিয়ে দিলেন তিনি প্রথানুরাগী নেতাদের।

‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের আর আমার ধর্ম আমার’ আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীপ্রাপ্ত হয়ে প্রথানুরাগীদের বলে দিয়ে তিনি মুক্তচিন্তার আদর্শিক ভিত্তি রচনা করে দিলেন নবুওতপ্রাপ্তির কয়েক বছর পরই।

এ পৃথিবী এক পরীক্ষাকেন্দ্র। চিন্তায়-মননে-কর্মে কে উত্তম এবং কে অনুত্তম তারই পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে এখানে। (সূরা আল-মুলক:২)। মুক্তচিন্তার অধিকার ব্যাহত হলে, ব্যাহত হয় পরীক্ষাপ্রক্রিয়ার মূল দর্শন। সে কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে স্পষ্টভাবে বলে দেন, ‘তুমি তোমার রবের পক্ষ থেকে সত্য বলে যাও, যার ইচ্ছে গ্রহণ করবে, যার ইচ্ছে প্রত্যাখ্যান করবে।’ (সূরা আল কাহফ:২৯ )

হিসাব-নিকাশ, বিচার-ফয়সালা হবে পরকালে। যারা মুক্তচিন্তা চর্চা করে সত্যকে আপন করে নিবে, সত্যানুযায়ী জীবন পরিচালনায় সক্ষম হবে, পরকালে তাদের করা হবে পুরুস্কৃত, আর যারা ভিন্ন পথ বেছে নিবে,  তাদের ভোগ করতে হবে শাস্তি। (দ্রঃ যুমার: ৭১-৭৩; সূরা আল হাজ:৫৫-৫৬)

রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর মক্কীজীবনে মুক্তচিন্তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবর-ধৈর্যসহ শান্তিপূর্ণ সকল পথ ও পন্থাই অবলম্বন করেছেন। কিন্তু সে যুগের ফ্যাসিষ্ট মুশরিকশক্তি মুক্তচিন্তা চর্চার সকল পথ রোধ করে রাখে। পরিশেষে তিনি হিজরত করে চলে যান মদিনায় । মদিনায়-থাকা দশ ইহুদি গোত্রকে তিনি স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার অধিকার দিয়ে ঘোষণা দেন,‘ইহুদিদের ধর্ম ইহুদিদের এবং মুসলমানদের ধর্ম মুসলমানদের’ (সহিফাতুল মদিনা, ধারা:২৭) এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মদিনা মুক্তচিন্তার অধিকার নিশ্চিত করেন।

মদিনায় মুনাফেকদের সংখ্যা ছিল তিন শতেরও অধিক। এরা প্রকৃত মুমিনদের সমালোচনায় থাকত উন্মুখ । তাদের নিয়ে  তারা করত তুচ্ছতাচ্ছিল্য, (সূরা তাওবা: ৭৯-৮০)। মুমিনদের তারা বোকা বলে আখ্যা দিত, (সূরা আল-বাকারা:১৩)।  এরা অনুসন্ধানে থাকতো ফাঁকফোকরের এবং সুযোগ পেলেই সত্যের পথ থেকে বিরত রাখত অন্যদের, (সূরা আল-মুনাফিকুন:২)। এরা আল কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে করত বিদ্রুপ, (সূরা আত-তাওবা:৬৬-৬৫)। এমনকী মহানবী সা. সর্বদুর্বল হিসেবে আখ্যায়িত করার দৃষ্টতাও দেখিয়েছিল এদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই, (সূরা আল মুনাফিকুন:৮)।

তাদের এ হীন কার্যাদি ও তীব্র সমালোচনা মুসলিম অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল নিশ্চয়। কিন্তু তবুও তাদের বিষয়টি পরকালে ফায়সালা করবেন বলে ঘোষণা দেন আল্লাহ তাআলা’ (সূলা আন-নিসা:১৪১)।

এর অর্থ মুক্তচিন্তার অধিকার, এমনকী মুনাফেকদের জন্যও, রাখা হয়েছে উন্মুক্ত যদিও তা সৃষ্টি করতে পারে নানা ধরনের সমস্যা । যেমনটি ঘটেছিল তিনশত সৈন্য নিয়ে ওহুদযুদ্ধে গমনের মাঝপথ থেকে আবদুল্লাহ ইবনে উবায়ের মদিনায় ফিরে যাওয়া।

সবাইকে এক ও অভিন্ন চিন্তার ওপর একত্র হতে বাধ্য করা আল্লাহ তাআলার নীতিবিরুদ্ধ, ব্যাপারটি আল্লাহ তাআলা নবী সা. কে স্পষ্ট আকারে বলে দিয়েছেন। নিচের আয়াতগুলো এ কথাই নির্দেশ করে:

‘যদি আল্লাহ চাইতেন তিনি অবশ্যই তাদের হিদায়েতের ওপর একত্র করতেন। সুতরাং তুমি কখনো মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’ (সূরা আল আনআম:  ৩৫)।

‘বল, ‘চূড়ান্ত প্রমাণ আল্লাহরই। সুতরাং যদি তিনি চাইতেন তোমাদের সবাইকে হিদায়েত দান করতেন’(সূরা আল আনআম: ১৪৯)।

বরং মুক্তচিন্তায় আরোপিত হয়ে মানুষ কিয়ামত পর্যন্ত মতানৈক্য করে যাবে বলে এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমার রব চাইতেন, সকল মানুষকে এক উম্মতে পরিণত করতেন, কিন্তু তারা পরস্পরে মতবিরোধকারী রয়ে গেছে, কিন্তু যাদেরকে তোমার রব দয়া করেছেন, তারা ছাড়া। আর এজন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন’ (সূলা হুদ:১১৮-১১৯)।

নবী-রাসূলগণ হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাসত্যের ঘোষক। তবে প্রতি নবীর বিরুদ্ধেই সমালোচনা ও দ্রোহী অবস্থানের সুযোগ দেয়া হয়েছে মানব ও জীন শয়তানদের। সমালোচনায় আরোপিত হয়ে শিল্পিত কথামালায় ওরা একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসবে বলেও ইঙ্গিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে কখনো এমনটি হতো না। তিনি বরং নির্দেশ দিয়েছেন বিপক্ষীয়দের সমালোচনায় কান না দিতে। এটা নিশ্চয় মুক্তচিন্তার অধিকার সুরক্ষিত রাখার উদাহরণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদের, তারা প্রতারণার উদ্দেশে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথার কুমন্ত্রণা দেয় এবং তোমার রব যদি চাইতেন, তবে তারা তা করত না। সুতরাং তারা যে মিথ্যা রটাচ্ছে তার প্রতি তুমি নজর দিয়ো না’ (সূরা আল আনআম:১১২)।

মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মুক্তচিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে নবী-রাসূলগণের ঘোষিত সত্যের পথে চলে পরকালীণ জীবন সুগম করবে অথবা এর বিপক্ষে গিয়ে স্বর্গীয় জীবন থেকে বিচ্যূতও হবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে  কোনো জোরজবরদস্তি করা হবে না।

শুধু তাই নয় বরং খোদ আল কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে যদি কেউ সমালোচনায় লিপ্ত হয়, পরকালে যদিও তাদের পরিণতি হবে জাহান্নাম, কিন্তু ইহাকালে তাদের এ সমালোচনা সহ্য করে নেয়া এবং তারা যদি চায় তবে  তা চালিয়েও যেতে পারে, এই মর্মে ঘোষণা দিতেও আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে,‘নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহ বিকৃত করে তারা আমার অগোচরে নয়। যে অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে সে কি উত্তম, না যে কিয়ামত দিবসে নিরাপদভাবে উপস্থিত হবে? তোমাদের যা ইচ্ছা তাই কর। নিশ্চয় তোমরা যা করবে তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা’(সূরা ফুসসিলাত৪০)

যারা পবিত্র কুরআন নিয়ে সমালোচনায় বসে, শ্রোতা হিসেবে তাদের বৈঠকে অংশ নিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে বারণ করেছেন। তবে তাদের এজাতীয় বৈঠক উচ্ছেদ করে দেয়ার কোনো নির্দেশ তিনি নবী সা. কে দেননি। ইরশাদ হয়েছে,‘আর যখন তুমি তাদের দেখ, যারা আমার আয়াতসমূহের ব্যাপারে উপহাসমূলক সমালোচনায় রত, তুমি তাদের এড়িয়ে যাও যতক্ষণ না তারা অন্য কথাবার্তায় লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্বরণের পর জালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসো না।’ (সূরা আল-আনআম:৬৮)।

ইসলাম হলো শাশ্বত মুক্তির একমাত্র পথ। এ পথের দিকে হিকমত, সুন্দর কথামালা এবং উৎকৃষ্টতম বিতর্কের  মাধ্যমে আহ্বান করাই হলো সকল নবী-রাসূলগণের মূল দায়িত্ব। জোর করে কারও মুক্তচিন্তার অধিকার হরণ করা, কাউকে ধার্মিক বানানো অথবা ধর্মে প্রবেশ করানোর জন্য বল প্রয়োগের দায়িত্ব নবী-রাসূলগণকে দেয়া হয়নি। ইরশাদ হয়েছে,‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরস্তি নেই। (সূলা আল বাকারা: ২৫৬)

অন্যএক আয়াতে এসেছে,‘যদি তোমার রব চাইতেন, তবে পৃথিবীর সবাই ঈমান গ্রহণ করত। তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা ঈমান আনে?’(সূলা ইউনুস:৯৯)।

সন্দেহ নেই, এক আল্লাহর ইবাদত সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতেও মানুষের মুক্তচিন্তাকে বহাল রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নবী সা. কে ঘোষণা দিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত তোমরা করতে চাও করে যাও। তবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘বল, ‘আমি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর জন্য আমার আনুগত্য একনিষ্ঠ করে। অতএব তাকে বাদ দিয়ে যা কিছুর ইচ্ছা তোমরা ইবাদত কর। বল, নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত যারা কিয়ামত দিবসে নিজদের ও তাদের পরিবারবর্গকে ক্ষতিগ্রস্ত পাবে। জেনে রেখ, এটাই স্পষ্ট ক্ষতি।’ (সূরা আয-যুমার:১৪-১৫)।

মানুষকে ঈমান ও কুফরির স্বাধীনতা দেয়ার চেয়ে বড় আর কি বিষয় হতে পারে যার দ্বারা মুক্তচিন্তার অধিকারের পক্ষে প্রমাণ পেশ করা  যেতে পারে।

যারা আল্লাহর মনোনিত পথের বিপক্ষচিন্তায় আরোপিত, তাদের সত্যের প্রতি আহ্বানের ক্ষেত্রে সুন্দরতম পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া মানুষের মুক্তচিন্তা সুরক্ষিত রাখার আরেকটি দলিল। অন্যথায় নির্দেশ দেয়া হতো, বিপক্ষচিন্তাধারণকারীদের দমন করে যাও, তা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন। ইরশাদ হয়েছে,‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত? আর ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত কর তা দ্বারা যা উত্তম। ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা আছে সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।’(সূরা ফুসসিলাত:৩৩)।

আল্লাহ তাআলা প্রতি জাতির আমল তাদের জন্য সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দেন, এবং যাদের অন্তর ব্যাধীযুক্ত তাদের ব্যাধীকে তিনি আরও বাড়িয়ে দেন। এর অর্থও মানুষের মুক্তচিন্তার অধিকার সুরক্ষিত করা। ইরশাদ হয়েছে,‘ এভাবেই আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য তাদের কর্ম শোভিত করে দিয়েছি।’ (সূরা আল আনআম: ১০৮)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে.‘নিশ্চয় যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না আমি তাদের জন্য তাদের আলমসমূহ সুশোভিত করে দিয়েছি। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।’ (সূরা আন-নামল:৪)।

বিপক্ষীয়দের সমালোচনা আল-কুরআনে থাকতে দেয়া মুক্তচিন্তার অধিকার সুনিশ্চিত করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উদাহরণত ইহুদিরা বলেছে,‘আল্লাহর হাত বাঁধা’ (সূলা আল মায়েদা:৬৪) তারা আরও বলেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী’ (সূরা আলে ইমরান:১৮১)। ফেরাউনের দাবি ছিল, সেই হলো একমাত্র ইলাহ এবং শীর্ষতম রব। আল কুরআন এসব সমালোচনা ডিলিট না করে তা বরং হুবহুব উল্লেখ করেছে।

সত্যবিচ্যূত মুক্তচিন্তাকারীদের ক্ষমা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে। তাদের কথাবার্তায় কান না দিয়ে সুন্দরতম পদ্ধতিতে তা এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি তাঁকে। ইরশাদ হয়েছে,‘ আর তারা যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ করো এবং সুন্দরভাবে তাদের পরিহার করে চল।’ (সূরা আল মুয্যাম্মিল:১০)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের এড়িয়ে চল।’ (আল আরাফ: ১৯৯)।

মুক্তিচিন্তার অধিকার সুনিশ্চিত করে আল্লাহ তাআলা তার নবীকে ঘোষণা দিতে বলেন,‘ বল,‘আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদের রিয্ক দেন? বল,‘ আল্লাহ’, আর নিশ্চয় আমরা অথবা তোমরা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত’। বল, ‘আমরা যে অপরাধ করছি সে ব্যাপারে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে না, আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে না।’ (সূরা সাবা:২৪-২৬)।

এর অর্থ কখনই এটা নয় যে, মহানবী সা. কর্তৃক প্রচারিত সত্য ভুলও হতে পারে। বরং এটা মুক্তচিন্তার একটা সাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করা এবং সাথে এটাও বলে দেয়া যে, মুক্তচিন্তা অশুভ পথে পরিচালিত হলে তার পরিণতি হবে অশুভ যা আল্লাহ তাআলা পরকালে খুলে দিবেন এবং কে অপরাধী কে নিরপরাধ তা ফয়সালা করে দিবেন।

মুক্তিচিন্তার তাত্ত্বিক ক্ষেত্র তৈরি করেই মহানবী সা. ক্ষান্ত হননি। রবং মুক্তচিন্তার অধিকার দিতে যখন বিপক্ষীয় শক্তি খরগহস্ত হলো, মাদানী জীবনে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মহানবী সা. নির্দেশিত হলেন। মুক্তচিন্তার অধিকার হরণকে আল কুরআনে ফিতনা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্যাতক শিরক যা আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে অন্যকেউ শিরকের বলয়ে থাকতে বাধ্য করে, এবং যারা তার বলয় থেকে বের হয়ে যেতে চায় তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করে যুদ্ধ। ইরশাদ হয়েছে,‘ আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। সুতরাং তারা যদি বিরত হয়, তাহলে যালিমরা ছাড়া কারো ওপর কোনো কঠোরতা নেই।’ (সূরা আল বাকারা:১৯৩)।

অর্থাৎ যতদিন পর্যন্ত নির্যাতক শিরক শেষ না হবে এবং মুক্ত চিন্তার অধিকার সুরক্ষিত হবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে আল্লাহর আনুগত্যের আওতায় আসতে পারবে, স্বাধীনভাবে আল্লাহর দ্বীন চর্চার অধিকার পাবে ততদিন পর্যন্ত যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। বিপক্ষীয়রা যখন শান্তিকামী হয়ে পড়বে। অর্থাৎ মুক্তচিন্তা ও আচরণের অধিকার দানে সম্মত হবে তখন যুদ্ধের পর্ব শেষ হয়ে যাবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তারা শান্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তুমিও শান্তির প্রতি ঝুঁকে পড়, আর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কর, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আল আনফাল:৬১)।

রাসূলুল্লাহ সা. মহান আল্লাহর নির্দেশনায় মুক্তচিন্তার যে বৃক্ষ রোপন করেছিলেন তারই শীতল ছায়ায় লালিত হয়েছে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান। জন্ম নিয়েছে আল ফারাবি, ইবনে সিনা, গাজালী, ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুনের মতো মহামনিষী যারা রচনা করেছেন আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। জার্মান ওরিয়েন্টালিষ্ট Sigrid Hunke -এর ভাষায় পাশ্চত্যের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা মূলত আরবীয় সূযর্, যা উদিত হয়েছে ইউরোপের আকাশে।

ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক- ইসলামিক ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) এবং এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ -এর খণ্ডকালীন শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি আল বাসার ইন্টারন্যাশনাল ফাউণ্ডেশনের চিফ ট্রান্সলেটর ও প্লানিং এণ্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। আরবী, ইংরেজি, উর্দূ এবং বাংলা ভাষায় বিদগ্ধ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত একজন ইসলামিক স্কলার জনাব শামসুল হক সিদ্দিক। দ্য সুলতানের সাথে আছেন অতিথি লেখক ও উপদেষ্টা হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ