ওয়ারেন বাফেট : আদর্শবান জাত ব্যবসায়ী

অথর- টপিক- এন্টারপ্রেনারশিপ/লিড স্টোরি

ওয়ারেন বাফেট। বর্তমান বিশ্বের ব্যবসায়িক জগতে এক আলোকিত নাম। তার ব্যবসায়িক জীবনের কৌশল, আদর্শ, সাফল্য নিয়ে লিখে শেষ করা যাবে না । বর্তমানে তিনি বিশ্বের তৃতীয় ধনী হিসেবে আসন গেড়ে আছেন। তার সম্পদের পরিমাণ ৬০ বিলিয়নের ওপরে।


ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক লোন থেকে দূরে থাকুন। নিজের যা আছে তাই বিনিয়োগ করুন। মনে রাখবেন- টাকা মানুষ সৃষ্টি করে না। কিন্তু মানুষ টাকা সৃষ্টি করে।


সংবাপত্রের হকারি দিয়ে শুরু : ওয়ারেন বাফেট এক সময় মুদি দোকানে কাজ করতেন। ছিলেন হকার। বিক্রি করতেন সংবাদপত্র। বর্তমান দুনিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী। বর্তমানে ৬৩টি কোম্পানির মালিক। এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার দান করেছেন বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায়। তারপরও তিনি ৪ হাজার কোটি ডলারের মালিক। এখন তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনেক বিশেষণ। মার্কিন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং লোকহিতৈষী বলে পরিচিতি পেয়েছেন। অনেকে তাকে ‘মিরাকল অব ওমাহা’ নামে ডাকেন। বিশেষভাবে বলতে হয়, এতো সম্পদের মালিক হয়েও তার মধ্যে নেই কোন বিলাসিতা।

কিশোর বয়সেই ব্যবসায়ী : ছোটবেলা থেকেই বাফেট অর্থ উপার্জন ও সংগ্রহের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। তিনি অল্প কিছুকাল তার দাদার মুদি দোকানে কাজ করেছিলেন। স্কুলে থাকাকালে বাফেট পত্রিকা, কোকাকোলা ইত্যাদি বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতেন। ছোটকালেই বাফেটের শেয়ার বাজার ও বিনিয়োগের উপর আগ্রহ জন্মায়। দশ বছর বয়সে বাফেট নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ দেখতে নিউ ইয়র্ক শহরে আসেন। ১১ বছর বয়সে তিনি তিনটা শেয়ার ক্রয় করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি জমা দেন আয়কর রিটার্ন। সেখানে তিনি নিজেকে সংবাদপত্র বিলিকারী হিসেবে পরিচয় দেন।

১৯৪৫ সালে তিনি হাই স্কুলে থাকতেই এক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবহার করা একটি পিনবল মেশিন কেনেন মাত্র ২৫ ডলারে। মেশিনটি বসানোর মতো জায়গা ছিল না তাদের। তারা এক নাপিতের দোকানের ভেতরে তা বসিয়ে দিলেন। এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তারা বিভিন্ন স্থানে বসালেন একই রকম তিনটি মেশিন। এভাবেই তার ব্যবসায় যাত্রা শুরু।

১৯৫১ থেকে ’৫৪ পর্যন্ত বাফেট-ফক অ্যান্ড কো.- তে ইনভেস্টম্যান সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেন। নিউ ইয়র্কে গ্রাহাম-নিউম্যান করপোরেশনে সিকিউরিটি এনালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৫৪ থেকে ’৫৬ পর্যন্ত। এছাড়া তিনি বাফেট পার্টনারশিপ লি., বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ইনস্যুরেন্সসহ বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করেছেন। এর বেশির ভাগই এখন তার নিজের প্রতিষ্ঠান।

বিলাসিতাহীন সাদামাটা জীবন : ওয়ারেন বাফেট জীবন যাপন করেন অতি সাধারণ মানের। দীর্ঘ ৫০ বছর আগে  বিয়ের পরে থাকার জন্য তিন বেডরুমের যে বাড়িটি কিনেছিলেন , সেখানেই বাস করেন আজ অবধি । এমনকি বাড়িটির চারপাশে নেই কোন আলাদা প্রাচীর। তিনি বলেন, আমার যা কিছু দরকার তার সবই আছে এখানে। বিশ্বের এত বড় ধনী, তার বাসার চারদিকে নেই কোন বেড়া বা সীমানা প্রাচীর।

এ বিষয়ে তার পরামর্শ হলো- প্রকৃতপক্ষে আপনার যতটুকু দরকার তার বেশি কিছু কিনবেন না। আপনার সন্তানদেরও এমনটা ভাবতে ও করতে শেখান। নিজের গাড়ি তিনি নিজেই চালান। তার আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেট কোম্পানি। কিন্তু ভ্রমণ করেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে ইকোনমিক ক্লাসে। অনেকেই ভাবতে পারেন, এটা অসম্ভব। কিন্তু তিনি তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

সম্প্রতি তিনি সিএনবিসি-কে এক ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তুলে ধরেছেন জীবনের উত্থান কাহিনী। তার মতে, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য নিজেকে আগে স্থির করতে হয় তার লক্ষ্য। তিনি এমনই এক লক্ষ্য নিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রথম শেয়ার কিনেছিলেন। তারপরও তিনি মনে করেন এ ব্যবসায় আসতে তার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরও আগে ব্যবসা শুরু করা উচিত ছিল। তাই তার পরামর্শ আপনার সন্তানকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করুন।

সংবাদপত্র বিক্রি করা অর্থ দিয়ে তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ছোট্ট একটি ফার্ম কেনেন। তার মতে, অল্প অল্প করে জমানো অর্থ দিয়ে যে কেউ কিনতে পারেন অনেক কিছু। সেজন্য সন্তানদের তিনি কোন না কোন ব্যবসায় নিয়োজিত করার পরামর্শ দেন।

পারিবারিক জীবন : কংগ্রেস নির্বাচন প্রাথী বাবা হাওয়ার্ড বাফেট ও মা লিলা বাফেট এর ঘরে নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের ওমাহাতে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন ওয়ারেন বাফেট। তার পূর্ণ নাম ওয়ারেন এডওয়ার্ড বাফেট। বাফেট হলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। রোজ হিল এলিমেন্টারি স্কুলে বাফেট পড়ালেখা শুরু করেন। ১৯৪২ সালে বাফেটের বাবা কংগ্রেসে নির্বাচিত হন এবং সপরিবারে ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বাফেট অ্যালিস ডিল জুনিয়র হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং উড্রো উইলসন হাই স্কুল থেকে পাস করেন।

ব্যবসায় পরিচালনার কৌশল : তিনি খুব ভাল তাস খেলতে জানেন। তাস খেলেন শ্যারন ওসবার্গ ও বিল গেটসের সঙ্গে। সপ্তাহে ১২ ঘণ্টা কাটে তার তাস খেলে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে খবর প্রকাশিত হয় যে, ওয়ারেন কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাছাড়া তার ডেস্কে নেই কোন কম্পিউটার। তার কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে এখন ৬৩টি কোম্পানির মালিক। এসব কোম্পানির প্রধান নির্বাহী অফিসারকে তিনি বছরে মাত্র একটি চিঠি লেখেন। তাতে সারা বছরের কর্মকৌশল বলে দেয়া থাকে। নিয়মিত তাদেরকে নিয়ে তিনি মিটিং করেন না। এজন্য তার পরামর্শ হলো- ঠিক জায়গায় ঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত কর্বন। অর্থাৎ ঠিক জায়গায় ঠিক ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হলে তাকে কাজের কথা বলে দিতে হয় না। ওয়ারেন বাফেট তার নির্বাহীদের দু’টি মাত্র নিয়ম বলে দিয়েছেন। তার প্রথমটি হলো- শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ নষ্ট করো না। দ্বিতীয় নিয়মটি হলো- প্রথম নিয়মকে ভুলে যাবে না। লক্ষ্য স্থির করো এবং সেদিকে লোকের দৃষ্টি কাড়তে চেষ্টা করো।

তার জীবনধারাকে স্পর্শ করেনি সমাজের উচ্চশ্রেণীর সামাজিকতা। তিনি নিজেই নিজের খাবার তৈরি করেন। কিছু পপকর্ন নিজেই প্রস্তুত করে খান এবং বাসায় বসে টেলিভিশন দেখেন। তার সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বিল গেটসের পরিচয় হয় মাত্র ৬ বছর আগে। তখনও বিল গেটস জানতেন না যে, ওয়ারেনের সঙ্গে তার অনেকটাই মিল আছে। ফলে মাত্র আধা ঘণ্টা পর তিনি ওয়ারেনের সঙ্গে দেখা করেন। যখন ওয়ারেনের সঙ্গে তার দেখা হয় তা স্থায়ী হয়েছিল দশ ঘণ্টা। এর পর থেকেই তার ভক্ত হয়ে যান বিল গেটস।

বাফেটের অসাধারণ কিছু পরামর্শ : উপার্জন প্রসঙ্গ- কখনো একটিমাত্র আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল হবেন না। দ্বিতীয় কোনো উৎস তৈরির জন্য বিনিয়োগ করুন। ব্যয়ের ক্ষেত্র- আপনি যদি এমন কিছু কেনেন যা আপনার দরকার নেই, তাহলে শিগগিরই (দৈনন্দিন খরচ মেটাতে) আপনার দরকারি জিনিসপত্র বিক্রি করে দিতে হবে। তাই হিসাব করে ব্যয় করতে হবে। সঞ্চয়ের ক্ষেত্র- খরচ করে যেটুকু বাকি থাকে তা থেকে সঞ্চয় না করে বরং সঞ্চয় করে যা থেকে যায় সেখান থেকেই খরচ করুন। ঝুঁকি নেওয়ার সময়- কখনোই উভয় পা পানিতে রেখে নদীর গভীরতা পরিমাপ করতে যাবেন না। অর্থাৎ, সব সময় কিছু সম্বল রেখে দেবেন। পুরোটাই ঝুঁকি নেওয়ার জন্য ব্যবহার করবেন না। বিনিয়োগের জন্য- সবগুলো ডিম একই ঝুড়ির মধ্যে নেবেন না। অর্থাৎ, একটি মাত্র ক্ষেত্রে বিনিয়োগ না করে ভিন্ন ভিন্ন অনেকগুলো খাতে ইনভেস্ট করুন, যাতে মূলধন হারানোর ঝুঁকি কম থাকে। প্রত্যাশা- সততা হচ্ছে একটি অত্যন্ত ব্যববহুল উপহার; যেনতেন লোকদের নিকট এটি আশা করবেন না যেন!

যুবকদের জন্য তার সুপরামর্শ : ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক লোন থেকে দূরে থাকুন। নিজের যা আছে তাই বিনিয়োগ করুন। মনে রাখবেন- টাকা মানুষ সৃষ্টি করে না। কিন্তু মানুষ টাকা সৃষ্টি করে।  যতটা সম্ভব জীবনধারাকে সহজ-সরল করার চেষ্টা করুন। অন্যরা যা বলে তাই করবেন না। তাদের কথা শুনুন। তারপর আপনার যা ভালো মনে হয় তাই করুন। অপ্রয়োজনীয় কোনো বিষয়ে অর্থ খরচ করবেন না। জীবন আপনার। সেজন্য আপনার জীবনকে চালাতে অন্যদের কেন সুযোগ দেবেন ? তএব, ভাল থাকুন। সুস্থ থাকুন। জীবনকে ভালোবাসুন।

আমি তারিক আজিজ। ঘুরে-বেড়ানো আমার প্রথম শখ ও আনন্দ। সাংবাদিকতা, লেখালেখি আর উদ্ভাবনমূলক বিষয়কে একীভূত করে নিয়েছি জীবনের সঙ্গে। তাই হেড অফ ক্রিয়েটিভ পদে দ্য সুলতানের সঙ্গে যাত্রা। ছোট্ট একটি মানুষ স্বপ্নবাজ হয়ে ভাবনা-কাজের জগতেই থাকতে ভালবাসি। নির্জন-নির্মল প্রকৃতি আমায় অনেক কিছু শিখিয়ে বেড়ায়। তাই নিরন্তর সৃষ্টির গল্প খুঁজে ফিরি...!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ