পর্ণোগ্রাফি আসক্তির ভয়ঙ্কর ক্ষতি ও মুক্তির উপায়

অথর- টপিক- প্যারেন্টিং/লিড স্টোরি

ইদানিং পর্ণোগ্রাফিতে আসক্তের সংখ্যা খুব ভয়াবহ আকারে বেড়ে যাচ্ছে। ছোটো ছোটো বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্কদের মাঝেও আসক্তির মাত্রা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। যৌনতা প্রাণীজগতে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু সমস্যাটা তখনই হয়, যখন তা পর্নোগ্রাফির মতো একটি বিষয়ে আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। পর্নোগ্রাফির ভয়াবহ ছোবল থেকে কীভাবে নিজেকে এবং সেই সাথে আমাদের সমাজটাকে রক্ষা করা যায়, সেই সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি।


মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ, চারটি উপায়েই পর্ন ফিল্মে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পাঠকরাও যদি কোনও প্রিয়জনের পর্ণফিল্মে অতিরিক্ত আসক্তি কাটাতে চান, তাহলে এই চার উপায় ব্যবহার করে দেখতে পারেন।


পর্ণ আসক্তি মাদকাসক্তির মতোই। যতই দেখবেন ততই দেখতে ইচ্ছা হবে। সাময়িক সুখের বিনিময়ে আপনাকে বিষণ্ণ এবং নিঃসঙ্গ মানুষে পরিণত করবে। যা আপনাকে আপনার স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। পর্ণ আসক্তির কারণে একজন মানুষকে বৈবাহিক জীবনে স্ত্রীর সাথে মিলনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। আসক্তির মাত্রা কখনো কখনো এমন স্তরে পৌছায় যে তা ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন এবং অনভিপ্রেত ঘটনার জন্ম দেয়, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো তরুণদের মাঝে যৌনতা নিয়ে মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দেয়।কখনো কখনো আসক্তের কামশক্তি বা যৌন চেতনা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে এবং শারীরিক মিলন খুব বিরক্তকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।নারীদের তুলনায় পুরুষদের মাঝে পর্ণ আসক্তির মাত্রা বেশি।

চলুন এবার দেখে নেই পর্ণ আসক্তি আপনাকে কীভাবে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ১. শারীরিকভাবে পর্ণ আপনাকে ধীরে ধীরে যৌন অক্ষম করে তোলে। ২. পর্ণ দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয় যা আমাদের আনন্দ, হাসি কান্নাসহ যৌন অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। ৩. পর্ণোগ্রাফি আপনার মস্তিষ্ককে অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত করে তোলে। এতে প্রচুর ডোপামিন ক্ষরণ হয়। ফলে আপনার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ডোপামিন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এভাবে বার বার একই প্রক্রিয়া দীর্ঘ দিন চলতে থাকলে আপনার মস্তিষ্কে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, শারীরিক মিলনের ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। যার ফলাফল আপনি নিজেই দেখতে পান। যেমন – স্ত্রীর সাথে অনুত্তেজক সম্পর্ক, বিষণ্ণতা, সহজেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত হস্তমৈথুন করেও উত্তেজনা ফিরে না পাওয়া ইত্যাদি। ৪. পর্ণ কামশক্তি ধ্বংস করে। ৫. পর্ণ আসক্তি ভালবাসার অন্তরায়। এছাড়া ৬ শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।

পর্ণ আসক্ত পুরুষদেরকে সাধারণ রুচিশীল নারীরা হীনমন্য ও চরিত্রহীন মনে করে। নারীরা যখন জানতে পারে যে তার পরিচিত কোনো পুরুষ নিয়মিত পর্ণ ছবি দেখে তখন তার সম্পর্কে খারাপ মনোভাব জন্ম নেয় এবং তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। বিশেষ করে আমাদের সমাজের নারীরা তো অবশ্যই।

রুচি বোধের অবনতি হয়  : নিয়মিত পর্ণ ছবি দেখতে দেখতে পুরুষদের রূচিবোধের অধঃপতন হয়। পর্ণ সিনেমার অনৈতিক ও যৌনতা নির্ভর বিকৃত সম্পর্ক গুলোকেই তখন ভালো লাগতে শুরু করে। ফলে যারা নিয়মিত পর্ণ সিনেমা দেখে তাদের রুচি বিকৃত হয়ে যায়। জীবনের স্বাভাবিক সম্পর্ক গুলোতেও নিজের অজান্তে বিকৃতি খোঁজে তাদের চোখ।

ফ্যান্টাসির দুনিয়া : নিয়মিত পর্ণ ছবি দেখতে দেখতে বাস্তব জগৎ ছেড়ে পুরুষরা ফ্যান্টাসি দুনিয়াতে চলে যায়। অর্থাৎ বাস্তব জীবনেও তাঁরা পর্ণ সিনেমার মত সঙ্গী আশা করে এবং তাঁরা স্বপ্ন দেখে তাদের যৌন জীবনটাও পর্ণ সিনেমার মতই হবে। তাই ফ্যান্টাসি দুনিয়ার স্বপ্নে বিভোর হারায়। সাধারণ নারীদেরকে তখন আর তাদের যথেষ্ট মনে হয় না।

মূলত নিঃসঙ্গ/ অসুখী হয়ে পড়ে :  অতিরিক্ত পর্ণ নেশার কারণে সাধারন নারীদের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে পর্ণ আসক্তদের। তাঁরা পর্ণ সিনেমার নায়িকাদের মত আকর্ষনীয় দেহ ও চেহারার নারী খোঁজে বাস্তব জীবনে। কিন্তু পর্ণ সিনেমার নায়িকাদের সৌন্দর্য মূলত কৃত্রিম সৌন্দর্য, তাদের আচরণও কৃত্রিম। মেকআপ, লাইট ও ক্যামেরার কারসাজিতে তাদেরকে মোহনীয় ভাবে দেখানো হয় যা বাস্তব জীবনে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। তাই পর্ণ আসক্তরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিঃসঙ্গ থেকে যায় অথবা সংসারে অসুখী হয়।

শারীরিক ক্ষতি : নিয়মিত পর্ণ ছবি যারা দেখে তাদের মধ্যে হস্ত মৈথুনের অভ্যাসটাও বেশি থাকে। অতিরিক্ত হস্ত মৈথুন করার ফলে তাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে এবং যৌন জীবনে নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

ভয়াল নেশা : পর্ন সিনেমার নেশা মাদকের নেশার মতই ভয়ংকর। মাদকাশক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যেমন কষ্টসাধ্য, পর্ণ আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়াও দূরহ ব্যাপার। পর্ণ আসক্তির কারণে পরিবারের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়, পড়াশোনায় ক্ষতি হয় এমনকি নিজের মধ্যেও হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়।

সামাজিক ভাবে হেয় হতে হয় : পর্ণ আসক্তদের মোবাইলে, কম্পিউটারে, পেন ড্রাইভে সব খানেই পর্ণ ছবি থাকে অধিকাংশ সময়। অনেক সময় এসব অনৈতিক বিষয় গুলো পরিবারের কাছে ধরা পড়ে যায়। ফলে পরিবারের কাছে হেয় হতে হয় পর্ণ আসক্তদেরকে। এছাড়াও সমাজের মানুষজন, বন্ধুবান্ধব বিষয়টি জেনে গেলে তাদের কাছেও হেয় হতে হয় তাদেরকে।

পর্ণ আসক্তির কুফল জানা হলো, চলুন সমাধানটাও শুনে নেই। ১. পর্ণ আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে নিজেকে নিজের প্রতি সৎ থাকতে হবে। প্রথমেই আপনার সংগ্রহে থাকা পর্ণ ভিডিওগুলো ডিলিট করুন। কারণ এ ব্যাপারে আসক্তদের সংগ্রহশালা বেশ উন্নত এবং পরিবর্ধনশীল! ২. নিয়মিত যেসব সাইটে ভিজিট করে আপনি আসক্ত হয়েছেন সেসব সাইট ব্লক করুন। ৩. আপনার পরিবারের সদস্যদের পর্ণ জগতের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রাখতে হলে Parental Controls ব্যবহার করতে পারেন। প্রথমে Settings > Control Panel > Family Safety > Manage settings on the family safety websites। তারপর প্রয়োজন মতো বাকি কাজ নিজের মতো করে করবেন। কিংবা আপনি চাইলে বাচ্চার কম্পিউটার টেবিল বাসার এমন জায়গায় সেট করতে পারেন যেখান থেকে তার মনিটর দেখা যায়। এতে আপনার সন্তান কিছুটা হলেও এর থেকে রেহাই পাবে। ৪. অনেক আসক্তদের কিছুক্ষণ পর পর পর্ণ দেখতে হয় কিংবা কাজের মাঝামাঝি সময়ে পর্ণ দেখতে হয়। আপনি যদি সেই দলের অন্তর্ভুক্ত হন তবে পর্ণ ছাড়া আপনার পছন্দের কোনো সখ বা বিনোদনের উৎস খুঁজে বের করুন। কাজের মাঝে মাঝে পর্ণ না দেখে সেই পছন্দের কাজ করুন কিংবা গান শুনতে পারেন অথবা ৫ মিনিট হেঁটে আসতে পারেন বাহিরের মুক্ত বাতাসে। এতে আপনার মস্তিষ্ক এবং দেহ থাকবে সতেজ এবং ফুরফুরে। ৫. এছাড়া আরো বিভিন্নভাবে কম্পিউটার, মোবাইল বা ট্যাবে বিভিন্ন সাইট ব্লক করে রাখার বিভিন্ন উপায় রয়েছে সেগুলো জেনে যেসব সাইট থেকে দূরে থাকতে চান সেগুলো ব্লক করে রাখতে পারেন।

মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ, চারটি উপায়েই পর্ন ফিল্মে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পাঠকরাও যদি কোনও প্রিয়জনের পর্ণফিল্মে অতিরিক্ত আসক্তি কাটাতে চান, তাহলে এই চার উপায় ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

১. নিজের মনের থেকে ভালো শাসক আর কেউ নয়। তাই পর্ন ফিল্মে আসক্তি কমাতে নিজেই একদিন প্রতিজ্ঞা করে ফেলুন, আজ দেখব না। একবার ভাবুন পর্ণফিল্মের অতিরিক্ত আসক্তি কী ভাবে আপনার পেশা ও সামাজিক জীবনে কুপ্রভাব ফেলছে। পর্ন ফিল্মের আসক্তি কি আপনাকে অসামাজিক করে তুলছে? জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলি উপভোগ করতে পারছেন না? এই প্রশ্নগুলি নিজেকে করুন। উত্তরও নিজেই খুঁজে পাবেন। দেখবেন, আসক্তি কেটে গিয়েছে।

২. আরও একটি কার্যকরী উপায় হলো- কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের অ্যাডাল্ট কনটেন্ট মুছে ফেলুন। প্রত্যেক পর্ন ফিল্ম আসক্ত ব্যক্তিই পর্ন ভিডিও জমিয়ে রাখেন। এমন কোনও সফটওয়্যার ব্যবহার করুন, যা পর্নোসাইট ব্লক করে দেয়। কিংবা ব্রাউসার হিস্ট্রি ক্লিয়ার করে দিন। দেখবেন সুফলটা হাতেনাতে পাবেন।

৩. মনোবিদরা বলছেন, কোনও কাজ না থাকলেই পর্ন ফিল্ম দেখার ইচ্ছে বাড়ে। অর্থাৎ‌ ব্যস্ততা না-থাকাই পর্নফিল্মে আসক্তি বাড়ার অন্যতম কারণ। তাই তাঁদের পরামর্শ, চেষ্টা করুন অন্যান্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে। একা একা কম্পিউটারের সামনে বিনিদ্র রাত কাটানোর অভ্যেস বন্ধ করুন। সে রকম হলে, বিছানায় চলে যান, ঠিক সময়ে ঘুম আসবে। ঘুম না এলে কোনও সিনেমা দেখুন বা বই পড়ুন। পর্ন ফিল্মের আসক্তি ধীরে ধীরে কেটে যাবে।

৪. শুধুই কম্পিউটারে সময় কাটানো অভ্যাসে পরিণত করবেন না। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যাঁরা বাড়িতে বেশি সময় কম্পিউটারে বসে সময় কাটান, তাঁদের মধ্যে পর্ন ফিল্ম দেখার প্রবণতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই শখ করে পর্ন ফিল্ম না দেখে অন্য কোনও শখে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। যদি কোনও কাজ না থাকে, বই পড়া অভ্যাস করে ফেলতে পারেন। কোনও লাইব্রেরির সদস্য হয়ে যান। দেখবেন ব্যক্তিত্বে অসাধারণ পরিবর্তন আসবে। সর্বোপরি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচক চিন্তাই পর্নফিল্মে আসক্তি থেকে মুক্তি দেয় বলেই জানাচ্ছেন মনোবিজ্ঞানীরা।

আমি তারিক আজিজ। ঘুরে-বেড়ানো আমার প্রথম শখ ও আনন্দ। সাংবাদিকতা, লেখালেখি আর উদ্ভাবনমূলক বিষয়কে একীভূত করে নিয়েছি জীবনের সঙ্গে। তাই হেড অফ ক্রিয়েটিভ পদে দ্য সুলতানের সঙ্গে যাত্রা। ছোট্ট একটি মানুষ স্বপ্নবাজ হয়ে ভাবনা-কাজের জগতেই থাকতে ভালবাসি। নির্জন-নির্মল প্রকৃতি আমায় অনেক কিছু শিখিয়ে বেড়ায়। তাই নিরন্তর সৃষ্টির গল্প খুঁজে ফিরি...!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

গো টু টপ