দৈনিক ইত্তেফাক : একাল-সেকাল

অথর- টপিক- ফিচার/হাইলাইটস

দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের প্রাচীনতম দৈনিকগুলোর একটি। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়; এর আগে এটি ছিল সাপ্তাহিক। এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়ে থাকে। ভাষা : বাংলা। এছাড়া অনলাইন একটি ইংরেজি ভার্সনও রয়েছে।

জন্মলগ্ন থেকে ইত্তেফাক সাধু ভাষা রীতি অনুসরণ করে আসলেও পরবর্তী সময়ে চলতি ভাষা রীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এ পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তাসমিমা হোসেন। তিনি একাধারে একজন সফল উদ্যোক্তা এবং সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করছেন দেশের সবচেয়ে প্রচলিত নারীবিষয়ক পত্রিকা পাক্ষিক ‘অনন্যা’। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রণ করা হয়। পত্রিকাটির দাপ্তরিক ওয়েবসাইট :http://www.ittefaq.com.bd/

দৈনিক ইত্তেফাকের নিয়মিত আয়োজনে আছে- প্রথম পাতা, শেষ পাতা, অন্যান্য খবর, সম্পাদকীয়, দৃষ্টিকোন, চিঠিপত্র, বিশ্ব সংবাদ, রাজধানীর আশেপাশে, অনুশীলন (শিক্ষাবিষয়ক পাতা) খেলার খবর, ইত্তেফাক সাময়িকী (সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক), কড়চা, প্রজন্ম, আইটি কর্ণার, তথ্যপ্রযুক্তি, শেয়ার বাজার, রাশিফল, তরুণকন্ঠ, অর্থনীতি, এই ঢাকা, বন্দর নগরী, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, মহিলা অঙ্গন, ক্যাম্পাস, কচি-কাঁচার আসর, ধর্মচিন্তা, বিনোদন প্রতিদিন, আনন্দ বিনোদন।

ফিরে দেখা : মালিকানার হাতবদল

দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রকাশনা শুরু হয় ১৯৫৩ সনের ২৪ ডিসেম্বর হতে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও ইয়ার মোহাম্মাদ খান এর হাত ধরে। ইয়ার মোহাম্মাদ খান হলেন এর প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক। তবে তাঁরা দুজনেই সক্রিয় রাজনীতি ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত থাকায়, তাঁরা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে সম্পাদক নিয়োগ করেন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্টের জয়ে ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং আইয়ুব খান হতে ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত সকল সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে। যে কারণে আইয়ুব খান ১৯৬৬ সনের ১৭ জুন হতে ১১ জুলাই এবং ১৯৬৬ সনের ১৭ জুলাই হতে ১৯৬৯ সনের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রচারণা বন্ধ রাখেন। মানিক মিয়াকে কয়েকবার জেলেও যেতে হয়।[1] উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয়দফা কর্মসূচি পেশ করলে ইত্তেফাক এর সমর্থক ও প্রচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বলা যায়, ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইত্তেফাক পূর্ববাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সনের ১ জুন মানিক মিয়া মৃত্যুবরণ করলে তাঁর দুই ছেলে মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। পাকিস্তান আর্মি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইত্তেফাকের অফিস পুড়িয়ে দেয় এবং পুনরায় এর প্রকাশনা (পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে) শুরু হতে ঐ বছরের ২১ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৭ জুন তৎকালীন সরকারের ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। এ সময়ে সম্পাদক ছিলেন নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী এবং পত্রিকাটি নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, ১ রামকৃষ্ণ মিশন রোড, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে।

১৯৭৫ সনের ২৪ আগস্ট মানিক মিয়ার ছেলেদেরকে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ২০০৭-২০০৮ সনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জরুরি অবস্থা চলাকালে পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন ওই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। ২০১০ সনের ২ মে বিকেলে ঢাকার শেরাটন হোটেলে দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হয় এবং ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু (বর্তমানে মন্ত্রী) এবং দুই মেয়ে (ও তাঁদের সন্তানেরা) মালিকানা গ্রহণ করেন। বিনিময়ে বড় ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ১০ কোটি টাকা ও ইত্তেফাক ভবনের পুরা মালিকানা লাভ করেন।

ভেতরের ইতিহাস

১৯৫৪ এর নির্বাচনে মুসলীগ লীগ বিরোধী জোট যুক্তফ্রন্ট জিতে ক্ষমতায় বসে। কিন্তু মন্ত্রীত্ব নিয়ে শুরুতেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ভাসানী, ফজলুল হক (শেরে বাংলা) এবং সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দেখা দিয়ে ইত্তেফাকেও এর প্রভাব পরে। মুখ্যমন্ত্রী তখন সোহরাওয়ার্দী। তাঁর নির্দেশে ১৯৫৪ সালের ১৪ মে ঢাকার জেলা প্রশাসন থেকে ইয়ার মোহাম্মদ খানের জায়গায় মানিক মিয়ার নাম প্রিন্টার ও পাবলিশার করা হয়। একই সময়ে মওলানা ভাসানীর নাম প্রতিষ্ঠাতার বদলে পৃষ্ঠপোষক ছাপা হতে থাকে। জানা যায়, এ নিয়ে ভাসানী মামলা করার কথা ভাবলেও দলীয় ভাবমূর্তির কারণে আর সে পথে যান নি। তারপর একদিন প্রতিষ্ঠাতার জায়গার মানিক মিয়ার নাম ছাপা হতে শুরু করে। ভাসানী নাম আর কোথায় রইলো না তারপর থেকে।[2]

১৯৫৮ সালের দিকে তোফাজ্জল হোসেন পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশকের নাম পরিবর্তন করে নিজের নাম ব্যাবহার করা শুরু করেন। কিভাবে এটা সম্ভব হলো, এটা জানতে না পারলেও এটুকু জানা গেছে, সেই সময়ের এই পরিবর্তন রাজনৈতিক কারণে হয়েছিলো এবং এতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের সমর্থন ছিলো।[3]

ইত্তেফাকের সম্পাকমণ্ডলি

আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালে মুসলীম লীগের বিরোধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। একই বছরে এই রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এর। আবদুল হামিদ খান ভাসানী পত্রিকাটির আনুষ্ঠানিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫১ সালে মানিক মিয়া পত্রিকাটির দায়িত্ব নিলেও ১৯৫৩ সালের আগ পর্যন্ত সম্পদক হিসেক ভাসানী থাকেন ।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯৫৩ সালে তার সম্পাদনায় দৈনিক ইত্তেফাকের যাত্রা হয়। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন । মধ্যখানে ১৯৬৬ সনের ১৭ জুন হতে ১১ জুলাই এবং এরপর ১৯৬৬ সনের ১৭ জুলাই হতে ১৯৬৯ সনের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পত্রিকাটি সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ছিলো । ১৯৬৯ সালের ১ জুন তিনি মারা গেলে সম্পাদনার দায়িত্ব কে পালন করেন, তা আর জানা যায় নি । যদিও পরিচালনার দায়িত্ব ছিলো তার দুই ছেলের মধ্যে । যুদ্ধকালে কিছুদিন পত্রিকা বন্ধ থাকে এবং পরে পাকিস্তান সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত । ১৯৭২ সালে পত্রিকাটির সম্পাদক হন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং ১৯৭৫ সালে ১৭ জুন দৈনিক পত্রিকার জাতীয়করণ হলে নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী সম্পাদক হন ।[4] কিন্তু আগস্টে আবার মালিকানা মানিক মিয়ার ছেলেদের হাতে চলে এলে সম্পাদনার দায়িত্ব দুই ছেলে আনোয়ার হোসেন ও মইনুল হোসেনের মধ্যেই ভাগাভাগি হতে থাকে । যদিও সম্পাদক হিসেবে মঞ্জুর নামই উচ্চারিত হতে থাকে বেশি । বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে আছেন মঞ্জুর স্ত্রী তাসমিমা হোসেন ।

তথ্যসূত্র : 


[1] লশকর বাউজী, সাপ্তাহিক লিখনী। মানিক মিয়া ও দৈনিক ইত্তেফাক।

[2] বাংলাদেশের রাজনীতি, ১৯৭২-৭৫। হালিম দাদ খান। আগামী প্রকাশনী

[3] ইতিহাসের রক্তপলাশ, পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর। আবদুর গাফফার চৌধুরী

[4] সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, দৈনিক ইত্তেফাক (০১ জুন ২০১৪)। “মানিক মিয়া : অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস”।


 

সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন- ধ্রুপদী এক লেখক। জন্ম ১৯৭৭ সালের ২৩ জুলাই। বাবা সৈয়দ মঞ্জুরুল হামিদ, মাতা মরহুমা ফাতেমা বেগম। পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার ছয়সূতী গ্রামে। ‘সৈয়দ শিশির’ নামে যিনি সমধিক পরিচিত। প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কলাম, সাহিত্য সমালোচনা, গল্প, গবেষণা, কবিতা, ছড়াসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় যার সুদীপ্ত বিচরণ। শিল্প-সাহিত্য ও ইসলাম ধর্মের নানা দিক ও বিষয় নিয়ে সুদীর্ঘ গবেষণা করেছেন ফয়জুল আল আমীন। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্য ‘আমি তার, যে আমার’। এক সময়ে সম্পাদনা করতেন ছোটকাগজ ‘অবিশঙ্ক প্রতীতি’, তারপর ‘আড়াইলেন’। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার রিপোর্টার, ফিচার লেখক, সাব এডিটর, সহযোগী সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে পাঠকপ্রিয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্য সুলতানের সাথে থাকছেন অতিথি লেখক হিসেবে।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

এক ডিমের মসজিদ

ফয়সল চৌধুরী। লোকমুখে প্রচার পৃথিবীতে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বেঙ্গির মা নামে এক
গো টু টপ