ইসলামী নন-লাইফ বীমার উৎস, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

অথর- টপিক- অপিনিয়ন/ব্যাংক-ইনস্যুরেন্স

একিউএম ছফিউল্লাহ আরিফ : বীমার পরিচয়- মানুষের জীবন যাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে বিপর্যয়জনিত অনিশ্চয়তা প্রতিকূল প্রভাব বিস্তার করে। অনাকাক্সিক্ষত এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে সম্পদ ও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝুঁকি থেকে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এবং অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট ক্ষয় ক্ষতি পূরণ করার চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা বীমা নামে পরিচিত। বীমাকে বহু ব্যক্তির মধ্যে ক্ষতি বণ্টনের সমবায় পন্থা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। বীমা হলো মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকির বিপক্ষে এক ধরনের আর্র্থিক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। বীমা হলো ঝুঁকি বণ্টনের একটি সহায়কমূলক ব্যবস্থা। বীমা হলো ভবিষ্যতে ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে আগাম ব্যবস্থা।

বীমা হলো দু’ই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি যার মাধ্যমে এক বা একাধিক পক্ষ বীমাকারীর নিকট নির্দিষ্ট অংকের প্রিমিয়াম বা নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদার বিনিময়ে সম্পূর্ণ বা আংশিক ঝুঁকির ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয় এবং বীমাচুক্তিপত্রে উল্লেখিত নির্দিষ্ট কারণে বীমাগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্থ হলে বীমাকারী চুক্তির শর্তানুযায়ী বীমাগ্রহীতা বা তাঁর প্রতিনিধিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বা অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়।

Prof. Mark R. Greene এর মতে Insurance is an economic institution that reduces risk both to society and to individuals by combining under one management a large group of objects so situated that the aggregate losses to which society is subject become predictable within narrow limits অর্থাৎ “বীমা হলো এমন একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা একটি মাত্র ব্যবস্থাপনার অধীনে বহুসংখ্যক উদ্দেশ্যকে এমনভাবে সমন্বিত করে যাতে করে সমাজ যেসব ক্ষতির সম্মুখিন হতে পারে সেসবকে সীমিত পরিসরে অনুমানপূর্বক সমাজ ও ব্যক্তি উভয়েরই ঝুঁকি হ্রাস করা যায়।”

Prof. M. N. Mishra বীমার কার্যভিত্তিক সংজ্ঞায় বলেন, Insurance is a co-operative form of distributing a certain risk over a group of persons, who are exposed to it অর্থাৎ “বীমা হচ্ছে এমন এক সমবায়ভিত্তিক যৌথ লোকসান বণ্টন ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট ঝুঁকিজনিত ক্ষয় ক্ষতি একাধিক সম্পৃক্ত ব্যাক্তির মধ্যে বণ্টন হয় এবং যাঁরা উক্ত ঝুঁকির বিরুদ্ধে নিজেদের বীমাবন্দি করতে সম্মত থাকে।”

প্রখ্যাত বীমা বিশারদ মি. পোর্টার বলেন, Human life is sorunded with lots of danger, creating preventive measure against these dangers is insurance. অর্থাৎ “মানুষের জীবন ও তাঁর কার্যাবলী বিভিন্ন প্রকার বিপদাপদে বেষ্টিত। এসব অজানা বিপদাপদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যবস্থাই হলো বীমা।” সুতরাং একজনের ক্ষতি ভাগাভাগি করে নেয়ার ধারণা থেকে বীমা ব্যবস্থার উদ্ভব।

সাধারণ বীমা বা নন-লাইফ বীমা : বীমা মূলতঃ দুই প্রকার। একটি জীবন বীমা, অন্যটি জীবন বহির্ভুত বীমা (non life insurance)। জীবন বহির্ভুত সকল ধরনের বীমাকে সাধারণ বীমা বা নন-লাইফ বীমা বলা হয়। নতুন বীমা আইনে সাধারণ বীমাকে নন লাইফ ইনসিওরেন্স হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সাধারণ বীমাকে মূলতঃ তিন ভাগে ভাগ করা হয় : ক. সম্পত্তি বীমা (Property insurance) খ. আর্থিক বীমা (Pecuniary insurance) গ. দায় বীমা (Liability insurance)

সম্পত্তি বীমার আওতায় স্থাবর, অস্থাবর প্রায় সকল ধরনের সম্পদের বীমা করা যায়, যেমন : বাড়ী, গাড়ী, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী, খাদ্য, পানীয় ইত্যাদি। বীমা গ্রহীতার নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা বা প্রিমিয়ামের বিনিময়ে বীমাকারী প্রতিষ্ঠান কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকির বিপরীতে ক্ষতিপূরণ দেয়ার যে অঙ্গীকার করেন তাকে আমরা সম্পত্তি বীমা বলে থাকি।

সকল বীমাগ্রহীতার নিকট থেকে সংগৃহীত অর্থ একটি নির্দিষ্ট তহবিলে জমা করা হয়। এই তহবিল থেকে বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের দেশে প্রচলিত অগ্নিবীমা, নৌ-বীমা, দুর্ঘটনা বীমা সম্পত্তি বীমার উদাহরণ। বীমা গ্রহীতা অগ্নি বা দূর্ঘটনাজনিত সম্পদের ক্ষতির অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির জন্য যে বীমা করে থাকেন তাকে আর্থিক বীমা বলা হয়। আর্থিক বীমাকে মুনাফাজনিত ক্ষতির বীমা বা loss of profit insurance বলা হয়।

ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে চুক্তির শর্ত অনুসারে নির্দিষ্ট আইনের বিধান অনুসারে বা অপরাধ আইন (Law of tort) অনুসারে যে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় তার বিপরীতে দায় বীমা করা যায়। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট যে ক্ষতিপূরণ দাবী করে তা বীমা কোম্পানী বহন করে থাকে এবং সংশ্লিষ্ট দায় বীমার শর্ত অনুসারে দায়ী ব্যক্তির পক্ষে ক্ষতিগ্রস্থ তৃতীয় পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে। দায় বীমা বিভিন্ন ধরনের হয়। যেমন :ক. পরিবহনকারীর দায় বীমা (Carrier’s liability)। খ. নিয়োগকারীর দায় বীমা (Employer’s liability)। গ. উৎপাদনকারীর দায় বীমা (Manufacturer’s liability)। ঘ. পেশাজনিত দায় বীমা (Professional liability)। ঙ. জনক্ষতির দায় বীমা (Public liability)

মোটর গাড়ী ব্যবহারের জন্য তৃতীয় পক্ষের ক্ষতির জন্য দায় মোটর যানের মালিককে বহন করতে হয়। এ কারণে মোটর যান আইন (Motor Vehicle Act) অনুসারে গাড়ীর মালিককে তৃতীয় পক্ষের দায় বীমা (third party liability) বাধ্যতামূলক ভাবে গ্রহণ করতে হয়।

অতএব লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে জীবন বহির্ভুত সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে সম্পত্তির ক্ষতি ছাড়াও পরিণতিজনিত ক্ষতি, দায়জনিত ক্ষতি এমনকি, দুর্ঘটনা বীমার আওতায়, রোগ, পঙ্গুত্ব চিকিৎসাজনিত ব্যয় পূণর্ভরণের জন্য হাসপাতাল খরচ বীমার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ বীমার আওতা বা পরিধি অনেক ব্যপক। একজন সচেতন নাগরিকের এবং সকল বীমা কর্মীর উচিত সাধারণ বীমা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা রাখা।

ইসলামী বীমার পরিচয় : বীমা বা ইন্স্যুরেন্স শব্দটি আমাদের নিকট অতি পরিচিত। তবে ইসলামী বীমার পরিচয় আমাদের অনেকের কাছে খুব পরিচিত নয়। ইসলামী বীমা “তাকাফুল” নামে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তাকাফুল শব্দটি আরবী “كفالة কাফালা” থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে যৌথ নিশ্চয়তা বা কারো আর্থিক প্রয়োজন পুরণের দায়িত্ব গ্রহণ করা।

তাকাফুল ব্যবস্থার অধীনে একদল লোক (পলিসি গ্রহণকারীগণ) নির্ধারিত কিছু বিপত্তির (Peril) দরুন সৃষ্ট ক্ষতি বা লোকসান কাটিয়ে উঠার জন্য নিজেদের মধ্যে যৌথ নিশ্চয়তা প্রদান করতে একমত হন। অংশগ্রহণকারী দলের সকল সদস্য চাঁদা প্রদান করে একটি তাবাররু (অনুদান) তহবিল গড়ে তোলেন। অতঃপর দলের কেহ যদি “তাকাফুল” সনদে বর্ণিত কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয় তাহলে উক্ত তাবাররু (অনুদান) তহবিল থেকে তাঁর ক্ষতিপুরণ কিংবা তাকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। মূলতঃ তাকাফুল হচ্ছে একদল লোকের মধ্যে “অংশগ্রহণকারী বা Policy holders একটি সমঝোতা চুক্তি যেখানে তাঁরা কোন নির্দিষ্ট “চুক্তি পত্রে বর্ণিত” দুর্ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে পরস্পরকে আর্থিক সহযোগিতা করার নিশ্চয়তা প্রদান করে থাকে। তাকাফুল ব্যবস্থার ভিত্তি হলো ভ্রাতৃত্ব, (Brotherhood), সংহতি (Solidaridy) ও পারস্পরিক সহযোগিতা (Mutual assistance)। অংশগ্রহণকারীদের দ্বারা গঠিত তাবাররু (অনুদান) তহবিলটি পরিচালনা করে একটি নিবন্ধিত তাকাফুল প্রতিষ্ঠান। ইসলামের মূলনীতির আওতায় তাকাফুল স্কীম পরিচালনা নিশ্চিত করার জন্য এর যাবতীয় লেনদেন ইসলামী চুক্তি আইন মোতাবেক হতে হবে। তাই ইসলামী বীমা চুক্তি মুদারাবাহ বা লাভ-ক্ষতিতে অংশগ্রহণ নীতিমালার ভিত্তিতে হয়ে থাকে।

প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক ও পন্ডিত আল্লামা ইউসুফ ইবন আব্দুল্লাহ আল সুবাইলি বলেন, “ইসলামী তাকাফুল হচ্ছে, এমন একটি যৌথ চুক্তি, যা কিছু বিপত্তির দরুন সৃষ্ট ক্ষয় ক্ষতি বা লোকসান কাটিয়ে উঠার নিমিত্তে সমজাতীয় ঝুঁকির আশংকাকারী একদল লোক নিজেদের মধ্যে নিষ্পন্ন করে থাকেন। এর পদ্ধতি হচ্ছে : অংশগ্রহণকারী দলের সকল সদস্য চাঁদা প্রদান করে একটি স্বতন্ত্র আর্থিক দায় দায়িত্ব সম্পন্ন বীমা বা ক্ষতিপূরণ তহবিল গড়ে তোলেন। অতঃপর দলের কেউ যদি তাকাফুল সনদে বর্ণিত কোন ক্ষতির সম্মুখিন হন, তাহলে উক্ত ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে তাঁর ক্ষতিপূরণ বা তাকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। এই তহবিল পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে বীমা সনদধারীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের দ্বারা গঠিত একটি সংস্থা কিংবা স্বতন্ত্র কোন কোম্পানি এবং বীমা কার্যক্রম পরিচালনার বিপরীতে পারিশ্রমিক বা বিনিময় গ্রহণ করে। তদ্রুপ সে তহবিলে পুঁজি বিনিয়োগ করেও ওয়াকিল বা মুদারিব হিসেবে লাভের নির্ধারিত অংশ বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করে থাকে।”

তাকাফুলের সংজ্ঞা মালয়েশিয়া তাকাফুল আইনে যেভাবে পাওয়া যায়, Takaful business means business of takaful whose aims and operations do not involve any element which is not approved by the Shariah

ইসলামী নন-লাইফ বীমার কর্মকৌশল (সাধারণ তাকাফুল) : ইসলামী নন-লাইফ বীমার কর্মপদ্ধতি প্রচলিত সাধারণ বীমা ব্যবস্থার অনুরূপ বাহ্যিকভাবে। ইসলামী নন-লাইফ বীমায় অংশগ্রহণকারীগণ যে প্রিমিয়াম দেয় তার সম্পূর্ণটাই তাবাররু হিসেবে প্রদান করে এবং তাকাফুল প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি সুদমুক্তভাবে ইসলামী বিধান অনুযায়ী এই অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। বিনিয়োগের সাকুল্য মুনাফা তাকাফুল তহবিলে জমা হয় এবং অংশগ্রহণকারীর সম্পত্তি বা দায় দায়িত্বের ক্ষতি কিংবা লোকসানের ক্ষেত্রে এই তহবিল থেকে তা পুরণ করা হয়। সাধারণ তাকাফুল তহবিলের উদ্ধৃত্ত পৃথকভাবে সংরক্ষিত, শেয়ারহোল্ডারের তহবিলে জমা হবে না। সাধারণ ইসলামী তাকাফুল তহবিলের লভ্যাংশের একটি নির্ধারিত অংশ (ধরা যাক ৫০%) জমা হবে শেয়ার হোল্ডারের তহবিলে এবং শেয়ারহোল্ডারের তহবিলের হিসাব বিবরণ পৃথকভাবে প্রস্তুত হবে।

জীবনবীমা তাকাফুল স্কীমের মত সাধারণ তাকাফুল স্কীমগুলো সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে না। অবশ্য, অংশগ্রহণকারীগণ তাকাফুলের মেয়াদ শেষে লাভের নির্দিষ্ট অংশ পেয়ে থাকেন। সকল ধরনের পরিচালনা ব্যয়ের পর যদি উদ্ধৃত্ত থাকে, তবে উদ্ধৃত্ত অর্থ অংশগ্রহণকারী ও সাধারণ তাকাফুল প্রতিষ্ঠান বণ্টন করে নেয়। চুক্তি করার সময়েই উদ্ধৃত্ত বণ্টনের ক্ষেত্রে সমঝোতার ভিত্তিতে সম্মতি থাকতে হবে। সাধারণ তাকাফুল তহবিলের উদ্ধৃত্ত পুনঃতাকাফুল (Reinsurance) ব্যয় মেটানো, তাকাফুল অর্থ সংরক্ষণ (technical reserve), ও আনুমানিক সম্ভাব্য দাবি বিবেচনা সাপেক্ষে নিরূপিত হয়ে থাকে।

তাছাড়া প্রচলিত বীমাতে শরী‘য়াহ নিষিদ্ধ তিনটি উপাদান রিবা, গারার ও মাইসির পাওয়া যায় এ উপাদানগুলো পরিহার করে বীমা পরিচালনা করা হলে তাই হবে ইসলামী বীমা।

ইসলামী বীমার ধারণা মূলতঃ তিনটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। সেগুলো হচ্ছে- ১. নিরাপত্তা বা নিশ্চয়তা লাভের আকাংখা। ২. ঝুঁকি ও বিপর্যয় এড়াতে সামষ্টিক সাহায্য-সহযোগিতা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা। ৩. আগাম সতর্কতা । এই তিনটি উপাদানই কুর’আন-সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রমাণিত । নিন্মে এ বিষয়ে পবিত্র আল কুর’আন ও সুন্নাহ এর দলিল সমূহ উপস্থাপন করা হলো-

প্রথমত : নিরাপত্তা বা নিশ্চয়তা লাভের আকাংখা

১. নিরাপত্তা লাভের আকাংখা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। নিরাপত্তা লাভ করা এটি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত বলে তিনি পবিত্র কুর’আনে উল্লেখ করেছেন, “সুতরাং তাঁরা যেন এই ঘরের প্রতিপালকের ইবাদাত করে যিনি তাঁদেরক ক্ষুধায় খাবার দিয়েছেন ও ভয় ভীতি থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।”

২. নিরাপত্তা চেয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.) মহান আল্লাহর নিকট দু‘আ করেন, “হে আল্লাহ এ শহরকে আপনি নিরাপদ ও শান্তিময় করে দিন”। তাছাড়া ইসলামের যাবতীয় নিয়ম কানুন, বিধি বিধান যা কিছু প্রণয়ন করা হয়েছে তার উদ্দেশ্য হলো সুশৃংখল ও নিরাপদ আবাসস্থল এবং মানব সমাজ গড়ে তোলা যাতে করে মানুষ আল্লাহর ইবাদত সুচারুরূপে পালন করতে পারে।

দ্বিতীয়ত : ঝুঁকি ও বিপর্যয় এড়াতে সামষ্টিক সাহায্য-সহযোগিতা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা

পরস্পর সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য মহান আল্লাহ পবিত্র কুর’আনুল কারীমে উল্লেখ করেন যে,

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ অর্থাৎ“আর তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরের সাহায্য কর আর পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সহায়তা করো না।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষা হলো বিপদগ্রস্থ ও নিঃস্ব লোককে সাহায্য সহযোগীতা করা। তিনি তাঁর উম্মাতকে এক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করে বলেন,

১. “পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার ক্ষেত্রে মুমিনের দৃষ্টান্ত হলো একটি অভিন্ন দেহের ন্যায়। যার একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হলে বাকী অঙ্গগুলো তাঁর সাথে অনিদ্রা ও কষ্ট ভাগাভাগি করে নেয়।”

২. “আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, “রাসূল (সা.) বলেন আশ‘য়ারী গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ে বা মদীনাতে তাঁদের পরিবার পরিজনের খাবার কমে যায় তখন তাঁরা তাঁদের প্রত্যেকের নিকট যা কিছু সম্বল থাকে, তা একটি কাপড়ে একত্রিত করে। তারপর একটা পাত্র দিয়ে মেপে তা নিজেদের মাঝে সমানভাবে ভাগ করে নেয়। কাজেই তাঁরা আমার ও আমি তাঁদের।”

৩. “আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- একদা আমরা মহানবীর (সা.) সাথে সফরে ছিলাম। এমন সময় জনৈক আগন্তুক তাঁর বাহনে চড়ে মহানবীর (সা.) নিকট আগমন করলো। এসেই সে ডানে বামে চোখ বুলিয়ে নিল। অতঃপর মহানবী (সা.) বলেন- যার নিকট অতিরিক্ত বাহন রয়েছে সে যেন তা ওই ব্যক্তিকে প্রদান করে যার কোন বাহন নেই। আর যার নিকট অতিরিক্ত পাথেয় রয়েছে সে যেন তা ওই ব্যক্তিকে প্রদান করে যার নিকট কোন পাথেয় নেই। বর্ণনাকারী বলেন, এভাবে মহানবী (সা.) অনেক ধরনের সম্পদের উল্লেখ করেন। এতে আমাদের মনে হলো অতিরিক্ত সম্পদে আমাদের কারো কোন অধিকার নেই।”

তৃতীয়ত : ঝুঁকি মোকাবেলায় আগাম সতর্কতা অবলম্বন

মানব জীবন পরিচালনায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই রয়েছে বিপদের ঝুঁকি। এরই মধ্য দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য, লেন-দেনসহ যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দিতে হয়। অধিকন্তু শিল্প বিপ্লবের ফলে যান্ত্রিক কলা কৌশল উদ্ভাবন, বৃহদায়ন কল কারখানা প্রতিষ্ঠা, উৎপাদন ও বিপনন ব্যবস্থায় গতিশীলতা, এক কথায় বলতে হয় যে, প্রতিযোগিতার সমাজে টিকে থাকতে জীবনকে ঠেলে দিতে হচ্ছে ঝুঁকির দিকে। যে কোন সময় যে কোন অনাকাংখিত দুর্ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে করতে পারে অন্ধকারাচ্ছন্ন। যেহেতু এ ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন পরিচালনা করতে হয় তাই প্রয়োজন ঝুঁকি মোকাবেলায় আগাম ব্যবস্থা। ঝুঁকি মোকাবেলায় আগাম সতর্কতা অবলম্বনের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর কতিপয় নির্দেশনা নিন্মে পেশ করা হলো-

১. মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللَّهَ وَلْيَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا

অর্থাৎ “যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে (আর্থিক) ভীতি আসবে, সেজন্যে তাদের শঙ্কিত হওয়া (স্বচ্ছলতা আনয়নে চেষ্টা করা) উচিত। সুতরাং তাঁরা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সংগত কথা বলে।”

২. হযরত ইউসূফ (আ.) সাত বছরের দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করার জন্য প্রাচূর্য ও স্বচ্ছলতার সাত বছরে আগাম পরিকল্পনা ও প্রস্ততিমূলক সঞ্চয়ী নীতি গ্রহণ করিছিলেন। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, “ইউসূফ বললেন, তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য কর্তন করবে তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করবে তা ব্যতীত অবশিষ্টাংশ শীষসমেত রেখে দেবে।”

৩. “তোমরা তাঁদের মোকাবেলা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে। এর দ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে তোমাদের শত্রুকে।”

৪. রাসূল (সা.) ভবিষ্যত বংশধরকে অনিশ্চয়তার মধ্যে না রেখে গিয়ে পরিবার প্রধানের অবর্তমানে পোষ্যদের জন্য অর্থ সম্পদ রেখে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর হাদীস

عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ عَادَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ مِنْ وَجَعٍ أَشْفَيْتُ مِنْهُ عَلَى الْمَوْتِ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَلَغَ بِي مِنْ الْوَجَعِ مَا تَرَى وَأَنَا ذُو مَالٍ وَلَا يَرِثُنِي إِلَّا ابْنَةٌ لِي وَاحِدَةٌ أَفَأَتَصَدَّقُ بِثُلُثَيْ مَالِي قَالَ لَا قُلْتُ أَفَأَتَصَدَّقُ بِشَطْرِهِ قَالَ لَا قُلْتُ فَالثُّلُثِ قَالَ وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ وَلَسْتَ تُنْفِقُ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا حَتَّى اللُّقْمَةَ تَجْعَلُهَا فِي فِي امْرَأَتِكَ.

অর্থাৎ “আমির ইবন সা‘দ (রা.)হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেন, বিদায় হজ্জের সময় মহানবী (সা.) আমাকে দেখতে আসেন সেই আঘাতের সময়, যার কারণে আমি মৃত্যুমুখে উপনীত হই। তখন আমি মহানবীকে (সা.) বললাম,  ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! আঘাতের কারণে আমার অবস্থা কোন পর্যন্ত পৌঁছেছে তা আপনি স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন। আমি একজন সম্পদশালী ব্যক্তি। আমার উত্তরাধিকারী বলতে কেবল এক মেয়ে ছাড়া কেউ নেই। আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সাদাকা করতে পারি? মহানবী (সা.) বললেন; না। আমি বললাম- তাহলে কি আমি অর্ধেক সদকা করতে পারি? মহানবী (সা.) বললেন; না, কেবল এক-তৃতীয়াংশ। এক তৃতীয়াংশও বেশি।তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে সম্পদশালী হিসেবে রেখে যাওয়া উত্তম, তাঁদেরকে আর্থিক অনটনের মধ্যে রেখে যাওয়ার চাইতে যে, তাঁরা অন্যের নিকট সাহায্যের জন্য হাত পাতবে। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যে সম্পদ ব্যয় কর না কেন তাঁর জন্য তোমাকে পুরস্কৃত করা হবে। এমন কি সেই গ্রাসের জন্যও যা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও।”

তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা :  কেহ কেহ অভিমত প্রকাশ করেন যে, বীমা পলিসি গ্রহণ করা তাওয়াক্কুল এর পরিপন্থী। আসলে বীমা পলিসি গ্রহণ তাওয়াক্কুল এর পরিপন্থী নহে বরং তাওয়াক্কুলের সহায়ক যা নিন্মোক্ত আলোচনা থেকে জানা যায়: আমরা মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করি মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সকল সৃষ্টি জীবকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের জীবন পরিচালনার জন্য যা প্রয়োজন তাই দিয়েছেন, তিনি সবকিছুই মাধ্যম বিহীন করতে পারেন তবে আমাদের আপাত দৃষ্টিতে তিনি মাধ্যম ছাড়া করেন না। তাই কোন কার্য পরিচালনায় মাধ্যম গ্রহণ হলো আল্লাহর শিখানো পথ আর মাধ্যম বিহীন কোন কাজ হয়ে যাওয়ার আশা করা তাঁর দেখানো পথের বিপরীত অবস্থান গ্রহণ। নিষ্ক্রিয় ও কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকা আল্লাহর উপর নির্ভরতা বা ভরসার নাম নয়। বরং মানুষের শক্তি, সামর্থ্য, মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিভাকে কাজে লাগানোই তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা। তাই মহান আল্লাহ জুমআ‘র সালাত শেষে জমিনে ছড়িয়ে পড়ে রিযক অন্বেষণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন,

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ

অর্থাৎ “সালাত সম্পন্ন হলে তোমরা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে।”

মাধ্যম বিহীন কোন কিছু করার বা হওয়ার আশা করা বোকামী তুল্য। মাধ্যমগুলো গ্রহণ করার পর তাওয়াক্কুল করতে হবে যা নিন্মোক্ত হাদীসগুলো আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে,

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ أَغْلِقُوا الْبَابَ وَأَوْكُوا السِّقَاءَ وَأَكْفِئُوا الْإِنَاءَ أَوْ خَمِّرُوا الْإِنَاءَ وَأَطْفِئُوا الْمِصْبَاحَ.

অর্থাৎ “হযরত জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, মহানবী(সা.)বলেন: তোমরা (রাতে ঘুমানোর সময়) দরজা বন্ধ কর, পানির পাত্রের মুখ বন্ধ কর, পাত্রের মুখ ঢেকে রাখ এবং বাতি নিভিয়ে দাও।”

عن أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يَقُول قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ قَالَ اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ

অর্থাৎ “আনাস ইবন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আমি কি উটটি বাঁধবো এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবো? নাকি উটটি ছেড়ে দেবো এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবো? মহানবী (সা.) বলেন, তুমি উটটি বাঁধবে এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে।” চিকিৎসা না করে শুধু আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে বসে থাকার সুযোগ নেই। যেমন আল্লাহর রাসূল সা. বলেন- ‘হে আল্লাহর বান্দারা চিকিৎসা কর কারণ যিনি রোগ সৃষ্টি করেছেন তিনি ওষুধও সৃষ্টি করেছেন।’

قَالَ عُمَرُبْنُ الْخَطَّابِ لأِنأَسٍ اَلَّذِيْنَ قَعَدُوْا فِى الْمَسْجِدِ بَعْدَالصّلاَةِ : لاَيَقْعُدَنَّ أَحَدُكُمْ عَنْ طَلَبِ الرِّزْقِ وَيَقُوْلُ الَّهُمَّ ارْزُقْنِى –وَقدْ عَلِمَ أَنَّ السَّمَاءَ لاَ تَمْطِرُذَهَباً وَلاَفِضَّةً – اِنَّمَا يَرْزُقُ اللَّهُ النَّاسَ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ- أَمَا قَرَأتُمْ قَوْلُ اللَّهِ تَعَالَى- فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْض-

অর্থাৎ “মসজিদে সালাত আদায়ের পর কিছু সংখ্যক লোককে মসজিদে বসে থাকতে দেখে উমর (রা.) তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন: রিযক অন্বেষণ হতে বিরত থেকে কেউ যেন বসে বসে এই দু‘আ না করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে রিযক দাও। সে তো জানে আকাশ কখনো স্বর্ণ বা রৌপ্য বৃষ্টি বর্ষণ করে না। আল্লাহ তা‘য়ালা কোন কোন লোকের মাধ্যমে অন্যদেরকে রিযক দান করেন। তোমরা কি মহান আল্লাহর বাণী পড়নি: “যখন সালাত সম্পন্ন হবে তখন তোমরা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়?”

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ أَهْلُ الْيَمَنِ يَحُجُّونَ وَلَا يَتَزَوَّدُونَ وَيَقُولُونَ نَحْنُ الْمُتَوَكِّلُونَ فَإِذَا قَدِمُوا مَكَّةَ سَأَلُوا النَّاسَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى { وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى }

অর্থাৎ “ইবন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: ইয়ামানের অধিবাসীগণ কোন প্রকার পাথেয় ছাড়াই হজ্জ সম্পাদন করতে চলে আসতো। আর তাঁরা বলতো: আমরা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী। মক্কায় এসে তাঁরা লোকদের নিকট হাত পাততো। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ নাযিল করেন: “তোমরা পাথেয় নিয়ে যাও। আর সবচাইতে উত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।”

لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا

অর্থাৎ “হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা.) বলেছেন: যদি তোমরা আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কূল কর তাহলে তিনি পাখিকে যেভাবে খালি পেটে সকাল করান ও ভরাপেটে সন্ধা করান তেমনিভাবে তোমাদেরকে রিযক দান করবেন। উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বূঝা যায় পাখি সকাল বেলা খাবারের জন্য বের হয়ে যায় এবং সন্ধায় ভরা পেটে বাসায় ফেরত আসে। তাতে বুঝা যায় পাখি তার চেষ্টা করার ফলে আল্লাহ তার আহারের ব্যবস্থা করেছেন তাই মানুষকেও তার চূড়ান্ত চেষ্টা করার পর আল্লাহ তাকে খাবারের ব্যবস্থা করবেন।

ইসলামী বীমার স্বাতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্য : ইসলামী বীমার অনেকগুলো বৈশিষ্ট রয়েছে। নিন্মে ধারাবাহিকভাবে ইসলামী বীমার বৈশিষ্টগুলো আলোচনা করা হলো-

ইসলামী বীমা কোম্পানি জিম্মাদার : আইনগত সম্পর্কের মাধ্যমে প্রচলিত ও ইসলামী বীমার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে। প্রচলিত বীমায় বীমাগ্রাহক ও বীমা কোম্পানির মাঝে সম্পর্ক হয় ক্রেতা ও বিক্রেতা আর ইসলামী বীমায় তাঁদের সম্পর্ক হয় অংশগ্রহকারীরা পরস্পরের বীমাকারী আর ইসলামী বীমা প্রতিষ্ঠান হলো ওকিল বা জিম্মাাদার বা ব্যবস্থাপক। বীমা কোম্পানি অংশগ্রহণকারীদের বা পলিসিহোল্ডারদের থেকে পাবে ওয়াকালা ফি ও চুক্তি অনুসারে মুদারাবা ফান্ডের লাভের অংশ।

ইসলামী বীমার ভিত্তি হলো কুরআন, সুন্নাহ,ইজমা ও কিয়াস এবং ইসতিহসান : তাকাফুল এবং প্রচলিত বীমার মধ্যে আরেকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাকাফুল ও বীমা পরিচালনায় বিধিবিধান ও নীতিমালা। ইসলামী বীমা পরিচালনার ভিত্তি হচ্ছে ইসলামী বিধিবিধান যার মধ্যে রয়েছে পবিত্র আল কুর’আনের বাণী, রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস ও ইজতিহাদী ফতোয়া ইত্যাদি। প্রচলিত বীমা পরিচালিত হচ্ছে মূলত চুক্তি আইন, দায় আইন, পার্লামেন্টের অধ্যাদেশ, সাধারণ আইন এবং প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিকশিত প্রথা ও রীতিনীতি দ্বারা।

ইসলামী বীমা সুদ, জুয়া ও গারার বা প্রতারণা মুক্ত : প্রচলিত বীমা ব্যবস্থা সুদের উপাদান, মুনাফা সর্বোচ্চকরণ এবং সম্ভাব্যক্ষেত্রে সুযোগ গ্রহণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত। সুদী লেনদেন ছাড়া প্রচলিত বীমার চিন্তা করা অসম্ভব। অপরদিকে ইসলামী বীমা হলো সুদ, জুয়া, গারার বা প্রতারণা ও অস্পটতা থেকে মুক্ত।

ইসলামী বীমার ভিত্তি হলো পারস্পরিক সহযোগিতা, বদান্যতা ও সাহায্য : ইসলামী বীমায় শুধূ লাভ করাই উদ্দেশ্য নয় এর প্রধান লক্ষ হলো বীমাচুক্তির আওতাধীন পরস্পরের আর্থিক সমস্যা সমাধান করা যার মাধ্যমে সমাজের বন্ধন সুদৃঢ় হয়। আর প্রচলিত বীমার লক্ষ হলো সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। তাতে পরস্পরের মধ্যে ভাতৃত্বের যে সম্পর্ক থাকে তা বিদূরিত হয়। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী: ‘তোমরা সৎ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা কর আর অসৎকাজ ও সীমালংঘনে একে অপরের সহযোগিতা করো না’

তহবিল কেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য: প্রচলিত ধারার বীমা কোম্পানিগুলোতে শেয়ারহোল্ডার তহবিল ও পলিসিহোল্ডার তহবিলের কোন পার্থক্য থাকে না। সকল আয় ও ব্যয় একই ফান্ড থেকে করা হয়। ইসলামী বীমা প্রতিষ্ঠান তাঁদের শেয়ারহোল্ডার তহবিল ও পলিসিহোল্ডার তহবিল আলাদা সংরক্ষণ করে। সকল আয় ব্যয় একই ফান্ডে না রেখে তার মাঝে বিভাজন করেন। একটি পলিসিহোল্ডারের ব্যবসায়িক ফান্ড যাকে মুদারাবা ফান্ড বলা হয় আর চুক্তির অধীন পারস্পরিক আর্থিক সহযোগিতার জন্য আলাদা ফান্ড গঠন করা হয় যাকে তাবাররু ফান্ড বলা হয়।

বিনিয়োগ কেন্দ্রিক : সরকারী নিয়মানুযায়ী বীমা প্রতিষ্ঠান তাঁদের অর্থ বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অধিক মুনাফা যেখানে অর্জন করা যায় তাকে বিবেচ্য বিষয় ধরে বিনিয়োগ করে থাকে প্রচলিত বীমা কোম্পানিগুলো, সেখানে থেকে সুদ আসে কি না তা ভাবা হয় না। আর ইসলামী বীমা  কোম্পানি তাঁদের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নির্দিষ্ট নীতিমালা মানার পরেও তাকে শরী‘য়ার বিধিবিধান তথা সুদমুক্ত উপার্জনের বিষয়টি মাথায় রেখে বিনিয়োগ করতে হয়।

উদ্দেশ্য কেন্দ্রিক : ইসলামী বীমার যারা ধারক, বাহক ও পরিচালক হন তারা কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে বীমা পরিচালনা করেন, তাহলো পলিসি হোল্ডারদের টাকা মুদারাবা হিসেবে বিনিয়োগ করে তাদেরকে মুনাফা প্রদান এবং পরস্পরের চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে তাবাররু বা অনুদান তহবিল গঠন করে একে অপরের সাহয্যের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন যা প্রচলিত বীমায় অনুপস্থিত।

শরীয়াহ কাউন্সিল : ইসলামী বীমাকে নিষিদ্ধ উপাদান থেকে মুক্ত রাখার লক্ষে পরামর্শ দান ও তত্ত্বাবধানের জন্য ইসলামী স্কলারদের একটি কাউন্সিল থাকে, আবার কাউন্সিলের পরামর্শ কোম্পানিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য থাকে প্রয়োজন সংখ্যক শরী‘য়াহ অডিটর বা মুরাকিব যা প্রচলিত বীমায় অবর্তমান এবং এর প্রয়োজনীয়তা প্রচলিত বীমা স্বীকার করে না।

ইসলামী নন-লাইফ বীমার উৎস, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ : ইসলামী বীমা কখন থেকে শুরু হয় তার সন-তারিখ বলা না গেলেও ইসলামী স্কলারদের গবেষণার আলোকে বুঝা যায় হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর জন্মের পূর্ব থেকেই আরবদেশে বীমা সদৃশ আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিধান প্রচলিত ছিল। আরবদেশে মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করত। তখন তাঁদের মধ্যে এরকম রীতি প্রচলিত ছিল যে, যদি কোন গোত্র বা গোষ্ঠির কোন ব্যক্তিকে অন্য দল বা গোষ্ঠির কোন ব্যক্তি খুন করত তাহলে উক্ত নিহত ব্যক্তির উত্তরাধীকারীগণকে যে ব্যক্তি খুন করত তাঁর আত্মীয় স্বজন মিলে রক্ত মূল্য বাবদ কোন মূল্যবান জিনিস দ্বারা ক্ষতিপূরণ দিতে হত। হত্যাকারীর আত্মীয়সজন যাদেরকে আকিলা (হত্যাকারীর নিকটাত্মীয়বর্গ বা পিতৃসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়বর্গ) বলা হত তাদেরকে খুনীর পক্ষে রক্তমূল্য পরিশোধ করতে হত। এই পদ্ধতিকে ইসলাম আগমনের পর অনুমোদন দিয়েছে। যেমন : হুযাইল গোত্রের এক মহিলার খুনের রায় প্রদান কালে মহানবী (সা.) অনিচ্ছাকৃত, ভুলক্রমে হত্যার দিয়্যাতের ক্ষেত্রে এই “আকিলাহ” পদ্ধতি গ্রহণ করেন এবং এই দূর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব সমষ্টির উপর অর্পণ করেন। যার বর্ণনা নিন্মে দেয়া হলো- “হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন যে, একদা হুযাইল গোত্রের দু’জন মহিলা বিবাদকালে একজন অপরজনকে পাথর দ্বারা আঘাত করলে সে তার গর্ভের শিশুসহ নিহত হয়। নিহতের উত্তরাধিকারীরা রাসূল (সা.) এর নিকট এর প্রতিকার দাবী জানালে তিনি এই রায় প্রদান করেন যে, গর্ভভ্রুনের জন্য একজন দাস এবং আকিলা রীতি অনুযায়ী নিহত মহিলার জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।”

আদদিয়াত ও ফিদইয়াও প্রায় একই ধরনের যা নিহত ব্যক্তির পরিবারের আর্থিক ক্ষতিপূরণের একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা। এভাবেই বিভিন্ন রীতি নীতির মাধ্যমেই দীর্ঘ সময় কেটে যায়। ১৯ শতকে হানাফী ফিকহ বিশেষজ্ঞ ইবন আবেদীন (১৭৮৪-১৮৩৬) ইসলামী বীমার আইনগত ভিত্তি নিয়ে গবেষণা করেন এবং এক পর্যায়ে ইসলামী বীমা আইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে ও প্রচলিত প্রথার বিকল্প হিসেবে একটি মডেল উপস্থাপিত হয়। এ প্রাতিষ্ঠানিক রূপের কারণে অনেক ঈমানদার মুসলিম তাদের চিন্তা চেতনাকে বীমার দিকে ধাবিত করেন ও ইসলামী স্কলার কর্তৃক লোকজনকে ইসলামী বীমার দিকে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়। ফলশ্রুতিতে নিজেরাও বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন বলে কিংমুলার তাঁর ঐতিহাসিক রচনা The Concept and Development of Insurance in Islamic Countries এ উল্লেখ করেছেন।

দুইশত বছর ইংরেজরা এ দেশ শাসন করে যান, তাদের শাসন আমলে সংস্কৃতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও পরিবার নীতিতে তাদের ধ্যান ধারণার বীজ বপন করে তার পরিচর্যাও করেন যার ফলে  মুসলমানগণ তাদের চিন্তা চেতনার পরিবর্তে ইংরেজদের দেয়া নীতি নিয়ে দিন অতিবাহিত করতে থাকে। বিশ্বশান্তির ধর্ম ইসলামী বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল মুসলমানগণ। বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী পন্ডিতগণ মুসলমানদের নিকট বীমা ব্যবসাকে জায়েয করার লক্ষ্যে ব্যাপক গবেষণা করেন এবং মুদারাবা ভিত্তিতে বীমার বৈধতার ঘোষণা দেন। এ শতাব্দীতে আরো অনেকেই প্রচুর গবেষণা করতে থাকেন। সৌদি বাদশা আল ফয়সাল ইবন আব্দুল আজিজ আল সৌদ ইসলামী অর্থনীতির ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আধুনিক অর্থনীতিকে ইসলামী বিধান অনুযায়ী পরিচালনার উদ্দেশ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পন্ডিত যেমন ইসলামী আইনবিশারদ ও ইসলামী অর্থনীতিবীদদের নিয়ে একটি গবেষণা সেল প্রতিষ্ঠা করেন। এ গবেষণা কর্মকে মুসলিম বিশ্বের ইসলামি পন্ডিতগণ সমর্থন জানিয়েছেন। তারপর বিশ্বখ্যাত আলিম ও ইসলামী স্কলারগণ ইসলামী বীমার স্বপক্ষে রায় দেন ও তার প্রয়োগিক দিক নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করেন। স্কলারদের মধ্যে মুসা আহমেদ, ইব্রাহিম, খান মোহাম্মদ মুসা, আবদুর রহমান ঈসা, আলী খালীফ, মুস্তফা জারকা, ড. নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকী, আবুল আ’লা মওদুদী, মাওলানা আব্দুর রহীম, ড. মোসলেহউদ্দিন. ড. মাসুম বিল্লাহ প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ইসলামী বীমা বাস্তবে রূপ দেয়ার লক্ষে বহুদিন যাবৎ এর উপর সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যার কতিপয় নিন্মে উল্লেখ করা হলো- ক. ইসলামী ফিকহ কনফারেন্স দামেস্ক, ১৯৬১। খ. সেকেন্ড কনফারেন্স অব মুসলিম স্কলার্স, কায়রো ১৯৬৫। গ. সিম্পোজিয়াম অব ইসলামী জুরিসপ্রুডেন্ট লিবিয়া, ১৯৭২। ঘ. ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ইসলামিক ইকোনমিক্স, মক্কা ১৯৭৬। ঙ. কাউন্সিল অব সৌদি উলামা রেজুলেশন, ১৯৭৭। চ. ফিকহ কাউন্সিল অব মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ রেজুলেশন, ১৯৭৮

উপরোক্ত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কনফারেন্সে একত্রিত হয়ে প্রচলিত বীমা থেকে তিনটি শরী‘য়াহ নিষিদ্ধ উপাদান বের করেছেন যা দূর করে বীমা পরিচালনা করা হলে শরী‘য়াহ অনুমোদন করবে। নিষিদ্ধ তিনটি উপাদান হলো ১. রিবা বা সুদ, ২. মাইসির বা জুয়া, ৩. গারার বা প্রতারণা। অবশেষে সৌদি আরবের বাদশা প্রিন্স মোহাম্মদ আল ফায়সাল আল সৌদ এর প্রস্তাবমত সুদানের প্রেসিডেন্ট জাফর মোহাম্মদ নিমেরীর উদ্যোগে সুদানের পিপলস এ্যাসেম্বলী এপ্রিল, ১৯৭৭ সালে সর্বসম্মতভাবে ফায়সাল ইসলামী ব্যাংক (সুদান) আইন পাস করে যার উদ্দেশ্য হলো সুদানে ইসলামী অর্থনীতি প্রচলন করা। এই ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয় ইসলামী শরী‘য়াহ এর আলোকে বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার। জানুয়ারী ২২, ১৯৭৯ সালে সুদানের রাজধানী খার্তুমে “ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি” প্রতিষ্ঠা করা হয় ফয়সাল ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগে যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ইসলামী বীমা। এরপরই বিশ্বে ইসলামী  বীমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গত ৩৭ বসরে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামী বীমা বিকশিত হতে থাকে। বর্তমানে নিন্মে উল্লেখিত দেশগুলোতে ৩০০টিরও বেশি ইসলামী বীমা কোম্পানি রয়েছে : ১. আলজেরিয়া। ২. বাহরাইন। ৩. বাংলাদেশ। ৪. ব্রুনেই। ৫. মিশর। ৬. গাম্বিয়া। ৭. ইন্দোনেশিয়া। ৮.   ইরান। ৯. জর্ডান। ১০. কেনিয়া। ১১. কুয়েত। ১২. মালয়েশিয়া। ১৩. মৌরিতানিয়া। ১৪. পাকিস্তান। ১৫. পেলেস্টাইন। ১৬. কাতার। ১৭. সৌদি আরব। ১৮. সেনেগাল। ১৯. সিংঙ্গাপুর। ২০. শ্রীলংকা। ২১. সুদান। ২২. সিরিয়া। ২৩. থাইল্যান্ড। ২৪. সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২৫. ইয়ামেন।

বাংলাদেশে ইসলামী বীমার বিকাশধারা : ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর এর সফল যাত্রা অবিরাম চলতে থাকে। ইসলামী ব্যাংক তার কার্যাবলীকে শরী‘য়ার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে গিয়ে  ইসলামী বীমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। নব্বই দশকে বাংলাদেশের কতিপয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব প্রচলিত বীমার পরিবর্তে ইসলামী শরী‘য়াহ অনুযায়ী বীমা প্রচলনের বিষয়ে গবেষণা করতে থাকেন। ইতিমধ্যে ইসলামিক ইকোনোমিকস রিসার্চ ব্যুরো নামক প্রতিষ্ঠান ইসলামী বীমার উপর প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে মানুষের নিকট ইসলামী বীমার কল্যাণকর দিকগুলো ফুটিয়ে তুললেন। আবার ১৯৯১ সালে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো Some Aspects of Islamic Insurance নামক একটি পুস্তক প্রকাশ করেন।

১-২ মার্চ, ১৯৯৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় ডি ৮ সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে ৮টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একত্রিত হন। সম্মেলনে এ মর্মে একটি সিদ্ধান্ত হয় যে মালয়েশিয়া পুনঃতাকাফুলের সুবিধা ডি ৮ এর সদস্য দেশের জন্য আরো প্রসারিত করবে। এর প্রেক্ষিতে ডি ৮ এর রাষ্ট্রপ্রধানগণ সিদ্ধান্ত নেন তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ দেশে তাকাফুল ও পুনঃতাকাফুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

১৯৯৯ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের বীমা শিল্পে তিনটি প্রতিষ্ঠান নব শিশু হিসেবে জন্ম লাভ করে সরকারের অনুমোদনের মাধ্যমে যার প্রথমটি হলো ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড, ২য় ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, আর ৩য় তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।

তাছাড়া পারিবারিক বা লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর মধ্য থেকে যে কোম্পানি সর্বপ্রথম ইসলামী জীবন বীমা হিসেবে অনুমোদন লাভ করে তাহলো ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। তারপর প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ও পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড অনুমোদন লাভ করে। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ইসলামী বীমা কোম্পানি হিসেবে অনুমোদন লাভ করে।

বর্তমানে ইসলামী লাইফ ও নন লাইফ বীমা কোম্পানির সংখ্যা হলো সর্বমোট ২৫টি।

এক. পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বীমা কোম্পানি (নন-লাইফ)

১. ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড

২. তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৩. ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

দুই. ইসলামী বীমা উইং (নন লাইফ)

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

তিন. পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বীমা কোম্পানি (লাইফ)

১. ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

২. প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৩. পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৪. ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৫. প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

৬. আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৭. মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

৮. জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

চার. ইসলামী বীমা উইং (লাইফ)

১. পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

২. গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৩. সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৪. হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

৫. প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

৬. মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

৭. ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

৮. মেট লাইফ আলিকো

৯. সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

১০. রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

১১. সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

১২. বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড

১৩. প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড


লেখক, সেক্রেটারি জেনারেল, সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ


 

দ্য সুলতান- এটি দ্য সুলতান.কমের একটি অফিসিয়াল আইডি। যাদের নামে কোনো আইডি দ্য সুলতানে নেই, তাদের নাম লেখার মাঝে ব্যবহার করে আমরা সাধারণত এই আইডির মাধ্যমে তাদের লেখাগুলো দ্য সুলতান.কমে প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ