শিল্পায়ন ছাড়া কোনো দেশ উন্নতি লাভ করতে পারে না : খাজা টিপু সুলতান

অথর- টপিক- ইন্টারভিউ/লিড স্টোরি

খাজা টিপু সুলতান- বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও আভিজাত্যময় উন্নয়নে তার অবদান ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও আভিজাত্যকর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ সেন্টারের সম্মানিত চেয়ারম্যান তিনি। বাংলাদেশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য সমগ্র বাংলার পর্যটনপ্রেমীসহ সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতি কৃতজ্ঞ। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অলাভজনকভাবে সমাজ সেবাধর্মী কর্মকা- পরিচালনার প্রত্যয় নিয়ে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় খাজা মোজাম্মেল হক (রহ.) ফাউন্ডেশন। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে জনকল্যাণকর বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুধীমহলে বেশ সুনাম অর্জন করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আধ্যাত্মিক সাধনাকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে সমাজসেবা ও মানবকল্যাণধর্মী বিভিন্ন কার্যক্রম আঞ্জাম দিয়ে আসছে এমন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশে বোধ করি এটাই প্রথম। ফ্রি চিকিৎসাসেবা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা এবং গরীব-অসহায় মানুষের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করে তুলতে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। খাজা হজরত ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রহ.)-এর নেসবতভুক্ত অসহায় কর্মক্ষম মানুষদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এককালীন মূলধন প্রদানের মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে সদকায়ে জারিয়ার মতো মৃত প্রায় একটি ইবাদতকে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উজ্জীবিত করেছেন একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। একজন সুফিসাধক। আন্তরিকভাবে নিজ হাতে যিনি পরিচালিত করছেন প্রতিষ্ঠানটি- তিনি আর কেউ নন; তিনি হলেন খাজা মোজাম্মেল হক (রহ.)-এর সুযোগ্য সন্তান, খাজা মোজাম্মেল হক (রহ.) ফাউন্ডেশনের সম্মানিত চেয়ারম্যান খাজা টিপু সুলতান। আধ্যাত্মবাদ চর্চার পাশাপাশি খাজা টিপু সুলতান বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য বিজনেস আইকন। যার ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা কেবল এই বঙ্গজমিনে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশেও সমাদৃত। আধ্যাত্মবাদ চর্চা যার নেশা এবং পর্যটন ব্যবসা তার পেশা। ব্যক্তিগতভাবে খুব স্বচ্ছ-পরিপাটি-সুন্দরতম এক জীবনের মালিক খাজা টিপু সুলতান। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অসংখ্য-অগণিত আধ্যাত্মিক ভক্ত রয়েছে তার। বাংলাদেশের অন্যতম এই বিজনেস আইকনের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মিরাজ রহমান

গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ সেন্টারকে আপনি কী উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মাণ করেছেন?
শিল্পায়ন ছাড়া কোনো দেশ উন্নতি লাভ করতে পারে না। আর এই শিল্পায়ন যদি দেশের আর্থিক উপকারে আসে, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় সেই সাথে যদি আবার সেটা মানুষের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। আমার আসলে অনেক আগে থেকেই এমন একটি শিল্প তৈরি করার ইচ্ছা ছিল যা মানুষের কল্যাণে আসে এবং সেই সাথে সেটা হবে একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান- সেই অনুপ্রেরণা থেকেই মূলত আমি গ্র্যান্ড সুলতান করি। আর আজ দেশ ও দেশের মানুষ এর উপকার পাচ্ছে। এটার কারণে অর্থনৈতিক অনেক সমৃদ্ধি লাভ করেছে। গ্র্যান্ড সুলতানের আশপাশের লোকদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তাদের জীবন পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি একটি কথা বলব সেটা হচ্ছে, পর্যটন শিল্পে আসলে তাদেরই আসা উচিত যাদের শুধু আর্থিক মুনাফা অর্জন করা উদ্দেশ্য থাকে না। পর্দার আড়ালে আরও অনেক মুনাফা আছে সেগুলোও কম নয়। আমরা আসলে জাতিগতভাবে অতিথিপরায়ণ। একজন লোক তার পরিবার নিয়ে আমার গ্র্যান্ড সুলতানে আসবে তাদের সেবা দেওয়া হবে। তারা আনন্দে থাকবে, এটা দেখার মাঝেও অনেক আনন্দ রয়েছে। এই বিষয়টাকেও আমি মুনাফা হিসেবেই দেখব।

আপনি তো দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন বিজনেসের সাথে জড়িত, আমরা আপনার দীর্ঘদিনের এই অভিজ্ঞতা থেকে পর্যটন শিল্পের ভালো-মন্দ বিষয়গুলো একটু জানতে চাচ্ছি।
প্রত্যেকটা শিল্প প্রতিষ্ঠানেই তো কিছু ভালো-মন্দ দিক থাকে। একটি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় আমাদের দেশে এই ব্যবসায় চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি। আর পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জটা আরও বহুগণ বেশি। এই ব্যবসার ভালো দিকটা হলো এখানে উভয় পক্ষেরই ভালো লাগার একটি বিষয় আছে। একটা পরিবার অনেক ব্যস্ততার মাঝেও এখানে এসে থাকছে এবং আল্লাহপাকের সৌন্দর্য উপভোগ করছে- এটা দেখার মাঝে তাদের একটা আলাদা ভালো লাগার আছে। আর যারা এই ধরনের সেবা প্রতিষ্ঠান করেছে তাদের মানুষকে ভালোভাবে সেবা দেওয়া এবং মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাওয়ার মাঝেও ভালো লাগার একটি দিক আছে। এই সব বিষয় হচ্ছে পজেটিভ। তবে এর নেগেটিভ দিক হচ্ছে, আমাদের দেশ দরিদ্র হওয়ার কারণে চ্যালেঞ্জটা বেশি। আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের জন্য আসলে এই ব্যবসা করা কঠিন। এই ব্যবসায় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, এই ব্যবসার জন্য কানেক্টিভিটি থাকা দরকার। সেই সাথে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা থাকা খুবই জরুরি। উন্নত দেশে তো ফোর লাইন রাস্তা কিন্তু এখনও আমরা দুই লাইনে রয়ে গেছি। উন্নত দেশে এখন রাস্তা শুরুই হয় সিক্স লেন থেকে।
যা-হোক আমাদের দেশে যদি আমরা ফোর লেনও করতে পারি তা-ও কম না। এছাড়া মহা সড়কগুলোর ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন নিয়ম মান্য করা হয়- যা আমাদের দেশে নেই। কিংবা থাকলেও মান্য করা হয় না। সড়ক-মহাসড়কের নিয়মগুলো মানা খুবই প্রয়োজনীয়। সড়ক বড় হলে যাতায়েতে সময় কম লাগবে এবং মহাসড়কে যে সব দুর্ঘটনা হয় সেটাও কম হবে। এ বিষয়গুলোর প্রতি যদি আমাদের সরকার দৃষ্টিপাত করেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাহলে শুধু পর্যটন শিল্প নয় আরও অন্যান্য শিল্পের কমপক্ষে তিনগুণ উন্নয়ন সাধিত হবে। এছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যে কোনো শিল্পেই ভালো করার শর্ত হলো দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা জরুরি।

প্রাকৃতিক বিষয়গুলো হচ্ছে মহান আল্লাহপাকের সৃষ্টি। এটাতো এমনিতেই সুন্দর। তো এই বিষয়গুলোকে কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বে নিয়ে আসা প্রয়োজন কেন?
এসব বিষয়গুলো আসলেই মহান আল্লাহপাকেরই সৃষ্টি। তিনি তার রাসূলের (সা.) মাধ্যমে আমাদেরকে ঘোরাঘুরি করে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিষয়টা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা ঘুরে ঘুরে জ্ঞান অর্জন করি। আর এটা করতে গিয়ে মানুষ যেন কোনো জটিল বা সমস্যাসঙ্কুল অবস্থায় না পড়ে, সেই জন্য সরকারের যারা দায়িত্বে আছেন তারাসহ আমাদের সবার দায়িত্ব সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করা। রাস্তাঘাটসহ সব নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে মানুষ যেন ভ্রমণ করতে পারে সেটা খেয়াল রাখা আমাদের সবারই প্রয়োজন। এটা করতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিকতার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। ঘুরতে এসে মানুষ যদি নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করে, তাহলে পরিবেশ নষ্ট হবে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হবে। এছাড়া ইসলাম ধর্মে রয়েছে, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। সুতরাং এই বিষয়টা আমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে হবে। আমরা যে যেই পেশাতেই থাকি না কেন, সেখানেই পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।

আল্লাহপাক কোরআনে বলেছেন, তোমরা ভ্রমণ করো। আপনার কাছে এর অর্থ কী মনে হয়? আল্লাহ আমাদেরকে কেন ভ্রমণ করতে বলেছেন?
আল্লাহপাক সমগ্র বিশ্বের অধিপতি। আমরা খুবই ভাগ্যবান এই কারণে যে আমরা মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি। তিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। আর এই কারণে তার দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া। সেই সাথে তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দিয়েছেন এবং ভালো-মন্দ বিচার করার বুদ্ধি দিয়েছেন। ভালো-মন্দ তথা পাপ ও পূণ্যের পার্থক্য করার ক্ষমতা আমাদের দিয়েছেন। আল্লাহপাক মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ মহান শুধু মানুষ সৃষ্টি করেছেন বিষয়টা এমন নয়। অসংখ্য-অগণিত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। অপরূপ দৃশ্যময় পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। থরে থরে সাজিয়েছেন পৃথিবীর নানা জীব-বৈচিত্র্যকে। ভ্রমণ করা ছাড়া আমরা আল্লাহপাকের এই পৃথিবী এবং অসংখ্য-অগণিত সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করব কীভাবে? এটাই তো হচ্ছে বাস্তব জ্ঞান। ভ্রমণ করা ছাড়া এইভাবে বাস্তব জ্ঞান আর কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। সুতরাং জ্ঞান অর্জন করার জন্যই ভ্রমণ করতে হবে। আর এ জন্যই পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন প্রয়োজন। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আপনি বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন পর্যটন ব্যবসায়ী বা বিজনেস আইকন এবং ধর্মীয় দিক থেকেও আপনি একজন বড় মাপের ব্যক্তিত্ব। পর্যটন ব্যবসায় কি এমন কোনো দিক বা বিষয় রয়েছে, যেটা থাকলে পর্যটন ব্যবসা হালাল বা বৈধ হবে না।
আপনার প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি যদি আপনার প্রশ্নের উত্তরটা শুধু পর্যটন বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে উত্তর দেই তাহলে বিষয়টা আরও ব্যাপক হবে। মহান আল্লাহ আমাদের ধর্ম দিয়েছেন। একজন মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কিভাবে চলবে তার পথ বাতলে দিয়েছেন। আমাদের নবী (সা.) সেই আদর্শই বাস্তবায়ন করেছেন। এরপর যুগে যুগে যত আল্লাহর অলি-আউলিয়া এসেছেন তারাও এই একই আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। আমরা যদি সেই আদর্শ অনুযায়ী চলি, তাহলে আমাদের সমাজের এই অবক্ষয় দূর হতে সময় লাগবে না। আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যাবো।
ব্যবসা-বাণিজ্যসহ মানুষের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে কোনটা হালাল আর কোনটা হারাম এই সব বিষয়গুলো পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিস্তারিত বর্ণিত রয়েছে। যদি আমরা পারিবারিক ও সমাজিকভাবে সেই সব বিষয় বাস্তবায়ন করি, তাহলে এতো সুন্দর একটা সমাজ গড়ে উঠবে যা মানুষ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের মাঝে সামান্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধ না থাকার কারণে খাবারে বিষ (বিভিন্ন বিষাক্ত কেমিক্যাল) যুক্ত করে থাকি। এটা দেশ ও জাতির জন্য কতটা ক্ষতিকর সেটা বর্ণনা করে বুঝানো অসম্ভব। মূলত এখানেই ঈমানের কথা চলে আসে। নিজের নফসের সাথে জিহাদ করতে হবে। মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা অকল্যাণকর যে কোনো বস্তু বা বিষয় ব্যবসায় যুক্ত না রাখা এবং এমন ক্ষতিকরতাকে ব্যবসার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য না বানানো। এগুলোই আসলে মূলকথা। ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘিত হয় বা ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা পরিপন্থী কোনো কাজ বা কোনো বিষয় কোনো ব্যবসায় যুক্ত না রেখে বরং ধর্মীয় দিক-নির্দেশনার ব্যবসা পরিচালনা করলে ব্যবসা আরও দ্রুত সফল হবে বলে আমি মনে করি।

একটু অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে পর্যটন শিল্পসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিমদের আধিপত্য ছিল। কিন্তু এখন পর্যটন শিল্পসহ কোনো ব্যবসাতেই মুসলমানদের আধিপত্য দেখি না। এই যে একটা সময় আধিপত্য ছিল আর এখন নেই- এর কারণ কী হতে পারে? আপনি এর কারণ কী বলে মনে করেন?
আপনার প্রশ্নকে আমি দুইটি ভাগে ভাগ করি। প্রথম ভাগ হচ্ছে, আপনি বলেছেন পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্রে মুসলমানদের আধিপত্য নেই। আপনার এই কথার সাথে আমি একমত হতে পারছি না। আপনার যদি বিশ্ব ভ্রমণ করার সুযোগ হয়; তাহলে আপনি দেখতে পাবেন যে, হাজার হাজার মুসলিম তাদের পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। বিভিন্ন কারণে তারা হয়তো বাংলাদেশে আসেন না। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে গেলে আপনি প্রচুর মুসলিম পর্যটক খুঁজে পাবেন। এছাড়া বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলো পর্যটন শিল্পের বিকাশে বহু উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক এগিয়েও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলছি, দুবাই একটি মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র। সেখানকার পর্যটন হচ্ছে বিশ্বের সর্বোত্তম পর্যটন ব্যবস্থা। তুরস্কও একটি মুসলিম দেশ। এই দেশটিও পর্যটনের জন্য বিশ্বের ঐতিহ্য হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। বর্তমানে মালায়েশিয়া পর্যটনের জন্য খুবই পরিচিত হয়ে ওঠেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, কাতার, মিসর, জর্ডান, ইরান, ইরাকসহ প্রায় সব মুসলিম প্রধান দেশই পর্যটনের স্বর্ণভূমি। সুতরাং আমি বলতে চাই, পর্যটন শিল্পের বিকাশ-উন্নয়ন ও ক্রমবর্ধমান প্রায় প্রতিটি ধারায় মুসলিমদের সুষম অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। আর ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের আপনি আধিপত্যের বিষয়ে আমি বলবÑ আমাদের কিছুটা কমতি রয়েছে। কারণ একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের যে আদর্শ থাকার কথা, সেটা আমাদের মাঝে নেই। আমার মনে হয় এই কারণেই আমাদের এই অবক্ষয় বা কমতি। তবে এতে ভয়ের কিছু নেই। আমরা যদি আবার সেই আদর্শের ঝা-া, সেই ভালোবাসার মন্ত্র ধারণ করতে পারি তাহলে ইসলামের আবার জয় হবে। সারা বিশ্বের মুসলিমরা সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন।

আমাদের মনীষীরা ভ্রমণকে জ্ঞান অর্জনের অন্যতম একটা মাধ্যম মনে করতেন। আসলে ভ্রমণ বিষয়টি মানুষের জীবনে ও জ্ঞান অর্জনে কীভাবে প্রভাব ফেলে? মানুষ ভ্রমণের মাধ্যমে কীভাবে জ্ঞান-শিক্ষা বা দীক্ষা গ্রহণ করে বা করবে?
আমরা যদি একটা নির্দিষ্ট ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকি, একটি ছোট সমাজের মধ্যে আবদ্ধ থাকিÑ তাহলে আমি কিন্তু জেনে বুঝে আমার জীবনকে একটি খাঁচার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেললাম। আমার মাঝে আল্লাহপাক যে প্রতিভা দিয়েছেন আমি সেটা বিকশিত করার চেষ্টাও করলাম না। আমার ভিতরের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হওয়ার আগেই আমি দুনিয়া থেকে চলে গেলাম। মনীষীরা ভ্রমণকে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম এই জন্য বলেছেন যে, ভ্রমণের মাধ্যমেই মূলত মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মানুষের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে- আমি হয়তো আপনার থেকে কিছু শিখতে পারব আবার অপর একজনের থেকে কিছু শিখতে পারব। বাইরের দেশের বিভিন্ন মানুষের মাঝে নানাধর্মী যেসব গুণ রয়েছে; আমি যদি সেখানে না যাই তাহলে তো আমি সেটা শিখতে পারব না। সুতরাং ভ্রমণ করার মাধ্যমেই মানুষের দৃষ্টি খুলে যাবে। মানুষের অন্তর-আত্মা উন্মুক্ত হবে এবং আল্লাহ মহানের সৃষ্টিকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারা সহজ হবে।

একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
প্রতিটি মানুষের মাঝে দুটি শক্তি থাকে। একটি হলো ভাল বা শুভ শক্তি। আরেকটি হলো খারাপ বা অশুভ শক্তি। যখন মানুষের সামনে খারাপ বা নেগেটিভ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, মানুষের মধ্যকার অশুভশক্তি তখন জেগে ওঠে। তাই সমাজের ভালো এবং কল্যাণকর বিষয়গুলো নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। পত্রিকার পাতা উল্টালেই কেবল নেগেটিভ প্রতিবেদন চোখে পড়ে। এই সব প্রতিবেদনগুলো মানুষের মধ্যকার অশুভ শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে খোরাক জোগায়। এভাবে সমাজের পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সামাজিক পরিবর্তনের জন্য চাই সহনশীলতা। চাই ভালো ব্যবহার এবং শুভশক্তির সু-মূল্যায়ন। বর্তমান সময়ের গণমাধ্যমগুলোকে পজেটিভ মানসিকতার পক্ষে বেশি বেশি কাজ করা উচিত। ভালো এবং কল্যাণমুখী কাজ নিয়ে যত আলোচনা হবে, ভালোর প্রতি মানুষের আগ্রহ তত বেশি বাড়বে। মানুষ ভালো কাজ করবে এবং সুন্দর হবে আমাদের সমাজ।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছে- ০৩ মে ২০১৭

দ্য সুলতান- এটি দ্য সুলতান.কমের একটি অফিসিয়াল আইডি। যাদের নামে কোনো আইডি দ্য সুলতানে নেই, তাদের নাম লেখার মাঝে ব্যবহার করে আমরা সাধারণত এই আইডির মাধ্যমে তাদের লেখাগুলো দ্য সুলতান.কমে প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ