নবীজিকে (সা.) আমরা কেনো ভালোবাসবো?

অথর- টপিক- বিলিভারস/হাইলাইটস

আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন— তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ থেকে প্রিয়তর না হবো। [বোখারি, হাদিস ১৫; মুসলিম, হাদিস ৪৪]

আবু হোরাইরা রা. বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন— সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা ও সন্তান থেকে বেশি প্রিয় না হবো। [বোখারি, হাদিস ১৪; নাসায়ি, হাদিস ৫০৩৫]

এই হাদিস দুটি এত স্পষ্ট যে, এর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন— কাজি আয়াজের বক্তব্যে রয়েছে, এটা হলো ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত। [ফাতহুল বারী, খ- ১, পৃষ্ঠা ৫৯] সুতরাং ইসলামের বিধানমতে নবীজিকে ভালোবাসা ফরজ, নবীজির আনুগত্য করা ফরজ। কথা হলো, ভালোবাসা ফরজ— এ-বিষয়টি ইসলামের গতিপ্রকৃতি যার জানা নেই, তার কাছে অদ্ভুত মনে হবে। সন্দেহ নেই, ভালোবাসা হলো একটি মানবীয় আবেগ। আর আবেগ-অনুভূতি কখনো আদেশ-নিষেধের ছাউনিতে দাখিল হয় না। বলতে গেলে কারও ব্যক্তিক ইচ্ছার পরিধিতেও আসে না। এমনকি নবীজি আপন অন্তরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন— হে আল্লাহ, এটা আমার অংশ, যার মালিক তুমি। সুতরাং যার মালিক তুমি, আমি নই, তার ব্যাপারে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না। [দেখুন— লেখকের কৃত ‘যাওয়াইদুস সুনান আলাস সহিহাইন, হাদিস ৪৫০৪] আয়েশা রা. বলেন— এখানে ‘এটা আমার অংশ’ দ্বারা উদ্দেশ্য ‘কলব’।

ভালোবাসার অনুভূতি তো মানুষের ক্ষমতার আওতাধীন কোনো বিষয় নয় যে, তার ওপর সে কর্তৃত্ব খাটাবে; বরং তা মানুষের হৃদয়ে ধীরে ধীরে আসে ইচ্ছার ক্ষেত্রের বাইরে থেকে। একই সাথে শরীয়তও এটা চায় না যে, অন্তরে এটা আদেশের মাধ্যমে আসুক। কেননা, মানুষ অনেক সময়ই আদেশ পালন করে তাকে বাধ্য করা হয় বলে এবং এই দীনের নীতিমালায় বাধ্যবাধকতা বাতিল হিসেবে গণ্য— দীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। [সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৬]

কিন্তু ভালোবাসা হলো, এমন একটা সম্পর্ক, যা মুসলমান এবং নবীর মধ্যে এবং মুসলমান ও তার ধর্মের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করে। তা এমন নিদর্শন, যা এই পদ্ধতিতে সৃষ্টফল ব্যতীত মানুষের সম্পর্ক তা বুঝতে পারে না। [লেখকের কৃত ‘আন আযওয়াই আলা দিরাসাতিস সীরাহ’, পৃষ্ঠা ১৬-১৮]

কিভাবে ভালোবাসা হবে

প্রশ্ন আসে— তা হলে এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা কীভাবে করবো?

কাজি আয়ায রহ. বলেন— ভালোবাসার প্রকৃতি হলো, মানুষ তার অনুকূল বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার অনুকূল বিষয়টা তার জন্যে হয়—

এক. হয়তো প্রাপ্তির মাধ্যমে উপভোগ করার জন্যে। যেমন— সুন্দর চেহারা, চমৎকার কণ্ঠ, সুস্বাদু খাবার ও পানীয় এবং এ-ধরনের বিষয়াবলিকে ভালোবাসা; যার প্রতি সকল সুস্থ-স্বভাব ধাবিত হয়। কেননা, এগুলো তার অনুকূল বিষয়।

দুই. অথবা, তার বিবেকবোধ ও আন্তরিক অনুভূতি অভ্যন্তরীণ অবস্থা উপলব্ধি করে তৃপ্তি পাওয়ার জন্যে। যেমন— সজ্জন, ওলামা, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের ভালোবাসা, যাদের সুন্দর জীবন-কাহিনি ও চমৎকার কৃতকর্মের বিবরণ কিংবদন্তী হয়ে আছে। কেননা, মানুষের স্বভাব এ-জাতীয় লোকদের সম্মোহনে আকৃষ্ট হয়।

তিন. অথবা, তার ভালোবাসাটা কেবলই হবে তাকে কারও অনুগ্রহ ও দান-দক্ষিণা থাকার কারণে। কেননা, অন্তরের স্বভাব হলো, সে তাকেই ভালোবাসবে, যে তার প্রতি অনুগ্রহ করবে।

উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত যখন স্থির হলো, তখন আপনি দেখুন, এই বিষয়গুলি নবী স.-এর ক্ষেত্রেও বিদ্যমান রয়েছে কি না। দেখবেন, ভালোবাসার যে যে তিনটি কারণ রয়েছে তার সবগুলো বৈশিষ্ট্যেরই অধিকারী নবীজি স.।

—দেখুন, বাহ্যিক আকৃতি ও সৌন্দর্যে তিনি অনন্য।

—সচ্চরিত্র ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ ।

—তা ছাড়া দেখুন, উম্মাহের প্রতি তার করুণা ও অনুগ্রহের অবদান, দেখুন তার রহম ও দয়া, উম্মাহকে হেদায়াতের পথ দেখানো, তাদের প্রতি তার সীমাহীন মমতা, জাহান্নাম থেকে তাদের পরিত্রাণের বিষয়টি। যার ফলে কোরআনে বিভিন্ন উদ্ধৃতি এসেছে যে, নিশ্চয় তিনি মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল ও দয়াবান, বিশ^বাসীর জন্যে রহমত, তিনি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এবং তিনি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী তারই নির্দেশে, আর তিনি দীপ্যমান সূর্যালোক।

মুমিনদের প্রতি তার যে অনুগ্রহ, তারচে’ বড় ও মহান অনুগ্রহ কী আছে? যেহেতু, তিনিই হলেন উম্মাহের হেদায়াতের উসিলা, অজ্ঞতা থেকে মুক্তিদাতা, সাফল্যের আহ্বায়ক, প্রতিপালকের সমীপে পৌঁছার মাধ্যম, তাদের সুপারিশকারী ও মুখপাত্র, তাদের সাক্ষী এবং তাদের চিরায়ত আবাস ও চিরস্থায়ী নেয়ামতের ব্যবস্থাপক।

যখন কোনো বাদশাকে তার উত্তম চরিত্রের কারণে, কিংবা কোনো শাসককে তার প্রভাব সৃষ্টিকারী পরিচালনা পদ্ধতির কারণে, অথবা কোনো উপদেশদাতাকে তার জ্ঞান গভীরতা ও উত্তম স্বভাবের কারণে স্বাভাবিকভাবে ভালোবাসা হয়, তাহলে তো নবীজি ভালোবাসা পাবার সর্বোচ্চ অধিকারী এবং হৃদ্যতার সর্বাধিক যোগ্য। কেননা, এই সকল সদগুণ ও স্বভাব-প্রকৃতির চূড়ান্ত স্তর ও পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে বিরাজমান ছিলো, তাতে সন্দেহের লেশমাত্র কারও নেই। [কাজি আয়ায কৃত ‘আশ-শিফা’, খ- ২, পৃষ্ঠা ৫৭৯-৮১]

নবীজিকে ভালোবাসবো কেনো?

নবীজিকে ভালোবাসার অনেক কারণ আছে। আল্লামা কাজি আয়ায রহ. নবীজিকে ভালোবাসার তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন— ১. আকৃতির সৌন্দর্য। ২. চরিত্রের মহিমা। ৩. অনুগ্রহের বিশালতা।

আমরা চতুর্থ আরেকটি কারণ যোগ করতে পারি, সম্ভবত ওগুলোর মতো মৌলিক কারণই এটি। তিনি মানুষের রসুল হওয়াটাই সেই মৌলিক কারণ। আর যেহেতু আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন কার কাছে রিসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করবেন। শুধু এই গুণ ও অবস্থানের বিবেচনায়ও তিনি ভালোবাসা পাবার অধিকারী।

তাকে ভালোবাসার কারণ এটাও যে, আল্লাহকে ভালোবাসা আমাদের জন্যে অপরিহার্য। যেহেতু আমাদের ভালোবাসা সেই আল্লাহ তায়ালার জন্যে, যিনি আমাদের ওপর আবশ্যক করেছেন যে, এটা কেবল রাসুল স.-কে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই হতে পারে এবং তিনি রসুল স.-কে যেই অবস্থান দান করেছেন, সেই অবস্থান তার জন্যে অক্ষুণ্ন রাখার মাধ্যমেই হতে পারে।

ভালোবাসার পূর্বশর্ত

ভালোবাসার পূর্বশর্ত হলো— তাকে চেনা। ইমাম গাজালি রহ. বলেন— পরিচয় ও জানাশোনা ব্যতীত ভালোবাসা কল্পনাও করা যায় না। কেননা, মানুষ যাকে চেনে না, তাকে ভালোবাসতে পারে না। [লেখকের কৃত ‘আল-মুহাযযাব মিন ইহয়াই উলূমিদ দীন’, খ- ২, পৃষ্ঠা ৩৬৪]

আমরা বলবো— যারা নবীজির সঙ্গে শত্রুতা করেছে, তাদের অধিকাংশই বৈরী হয়েছে অজ্ঞতা ও দূরত্বের কারণে। যদি তার সান্নিধ্য এবং তার সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ তাদের হতো, অবশ্যই তাদের অবস্থান ব্যতিক্রম হতো। সিরাত গ্রন্থগুেেলাতে এর বেশুমার দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন— আবু হোরাইরা রা. বলেন, নবীজি স. নজদের দিকে একটি অশ্বারোহী বাহিনী পাঠালেন। তারা হোনাইফা গোত্রের এক ব্যক্তিকে নিয়ে এলেন, যার নাম সুমামা বিন আসাল। তারা তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখলেন। নবীজি তার কাছে এসে বললেন— তুমি কী চাও, সুমামা? সে বললো— মুহাম্মদ, আমি ভালো চাই। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে একজন হত্যাযোগ্য ব্যক্তিকেই হত্যা করবেন। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন। যদি সম্পদ চান, তবে যা খুশি তা চাইতে পারেন।

নবীজি তাকে সে অবস্থায় রেখে চলে গেলেন। পরদিন বললেন— তুমি কী চাও, সুমামা? সে বললো— আমি আপনাকে বলেছি যে, যদি আপনি অনুগ্রহ করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন।

নবীজি তাকে ছেড়ে চলে গেলেন। তার পরের দিন আবার এসে জিজ্ঞেস করলেন— তুমি কী চাও, সুমামা? সে বললো— আমার প্রত্যাশা আপনাকে বলেছি। নবীজি বললেন— সুমামাকে ছেড়ে দাও।

সুমামা নিকটবর্তী একটা খেজুর গাছের কাছে গেলো। তারপর গোসল করে মসজিদে প্রবেশ করলো এবং বললো— আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল। আল্লাহর কসম, হে মুহাম্মদ, এই পৃথিবীতে আপনার চেয়ে অপ্রীতিকর চেহারা আমার কাছে আর ছিলো না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সবার চেয়ে প্রিয়। শপথ খোদার, আপনার দীনের চেয়ে অপছন্দনীয় আর কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিলো না, কিন্তু এখন আপনার দীনই আমার কাছে সবচে’ প্রিয় হয়ে গেছে। কসম করে বলছি, আপনার নগরীর চেয়ে খারাপ আর কোনো নগর আমার কাছে ছিলো না, কিন্তু এখন আপনার নগরী আমার কাছে সবচে’ প্রিয় হয়ে গেছে। [বোখারি, হাদিস ৪৩৭২; মুসলিম, হাদিস ১৭৬৪]

এটা সামগ্রিক পরিবর্তন সুমামার মধ্যে ঘটেছে মসজিদের খুঁটিতে তিনদিন বাঁধা থাকা অবস্থায়। এরই মধ্যে সে নবীজির ব্যক্তিত্ব জানতে পেরেছে খুব কাছ থেকে। ফলে সেই অন্ধকার কেটে গেছে, যা তার অন্তর আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো এবং তার সামনে নবীজির স্বভাব ও গুণাবলি পরিষ্কার হয়ে গেছে। আর তাই তার অন্তর থেকে নবীজির সত্তা, দীন ও নগরীর প্রতি যে বিদ্বেষ ছিলো, তা দূর হয়ে গেছে এবং সে-স্থানে সবটুকু জুড়ে ভালোবাসা জায়গা পেয়েছে।

পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এই সব কিছুই ঘটিয়েছে তার ‘পরিচয়’।

ওমাইর বিন ওহাব মদিনায় যান দূত হয়ে সাফওয়ান বিন উমাইয়ার পক্ষ থেকে বদর যুদ্ধের পরপরই, যেনো তিনি গোপনে প্রস্তুত হয়ে নবীজিকে ঘায়েল করে হত্যা করতে পারেন। অথচ তিনি নবীজির সাথে সাক্ষাৎ করামাত্রই তার বিদ্বেষ দূর হয়ে গেলো, যা তার অন্তর পূর্ণ হয়ে ছিলো। এমনকি তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন।

একইভাবে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবার কথাও বলা যায়। সে তো নবীজির সঙ্গে বৈরিতা, শত্রুতা ও বিদ্বেষে ছিলো প্রসিদ্ধ। মক্কা বিজয়ের অব্যবহিত পরই সে রাসূলের নিকট এসে বললো— আল্লাহর রসুল, ভূপৃষ্ঠে  আপনার শিবিরের লোকদের অপমান করা আমার সবচে’ কাম্য ছিলো। কিন্তু আজ এমন হয়েছে যে, এখন আপনার শিবিরের লোকদের সম্মান করাই হলো আমার সবচে’ প্রিয় বিষয়। [বোখারি, হাদিস ৩৮২৫; মুসলিম, হাদিস ১৭১৪]

কোন জিনিস তার মধ্যে এই পরিবর্তন এনেছে? নিশ্চয় সে ক্ষমা ও দয়ার সর্বোচ্চ প্রকৃতি দেখতে পেয়েছে। দেখেছে— যে জাতি নবীজিকে বের করে দিয়েছে তার দেশ থেকে এবং তারা সেখানে গিয়েও তার সাথে যুদ্ধ করেছে, যেখানে গিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি তাদের বদলা নিতে সমর্থ হলেন, তখনও তিনি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলেন না, তাদের সাথে তাদের অনুরূপ আচরণ করলেন না; বরং ক্ষমা করে দিলেন, মার্জনা করলেন।

হিন্দা দেখেছে— মহান বিজয় সূচিত হয়েছে, কিন্তু বিজেতা ব্যক্তি ঘাড় বাড়িয়ে ও অহংকারী ভঙ্গিতে প্রবেশ করেন নি; বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রতি বিনীত, তার কৃতজ্ঞতা আদায়কারী এবং তার প্রশস্তিতে মুখর। এটা এমন একটা অবস্থা, যা দর্শকের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে সেই রূপকল্প বিলীন হয়ে যায়, যার ওপর বিদ্বেষ ও ঘৃণার ভিত রচিত ছিলো।

ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার সূচনা হয়

এটা নিশ্চিত যে, প্রেম-ভালোবাসা কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়। কোনো আদেশ-নিষেধ তা-ই প্রেমের ক্ষতিবৃদ্ধি করতে পারে না। আমার মনে হয়— ভালোবাসার সূচনা হয় একটা কিছুর প্রতি ভালোলাগা থেকে। সেই একটা অন্য আরেকটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একসময় ভালোলাগাটাই ভালবাসায় পরিণত হয়। উপরে কাজি আয়ায রহ. বর্ণিত তিনটি বিষয় কেবল শাখা-নদী বলা যায়, ভালোবাসা এসে গেলে যা কেবল মূলনদীর শক্তিবৃদ্ধি করে।

আনাস রা. বলেন— নবীজির কাছে ইসলামের বিনিময়ে কিছু চাওয়া হলে তক্ষুনি তা দিয়ে দিতেন। তিনি বলেন— এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এলো, তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী একপাল বকরি দিয়ে দিলেন। লোকটি স্বজাতির নিকট ফিরে গিয়ে বললো— হে সম্প্রদায়, ইসলাম কবুল করে নাও। কেননা, মুহাম্মাদ প্রচুর দান করে, দরিদ্রতার ভয় করে না। আনাস রা. বলেন— যদি কেউ পার্থিব উদ্দেশ্যেও ইসলাম গ্রহণ করতো, একপর্যায়ে এমন হয়ে যেতো যে, ইসলাম তার কাছে পৃথিবী ও এর মধ্যকার সবকিছু থেকে প্রিয় হয়ে গেছে। [মুসলিম, হাদিস ২৩১২]

আনাস রা. এইমাত্র যে ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তার সামনে কেবল নবীজির দানশীলতার সুরতটিই ছিলো, যা তার বিবেকে অধিকার করে নিয়েছে এবং তাকে মুগ্ধ করে দিয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে সেটাই তার গভীর ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।

এই অর্থটি আরও প্রত্যয় পাবে সাফওয়ান বিন উমাইয়ার বক্তব্যে। তিনি বলেছেন— আল্লাহর শপথ, নবীজি আমাকে প্রচুর দান করেছেন, অথচ তিনি আমার কাছে সবচে’ অপছন্দের লোক ছিলেন। কিন্তু তিনি আমাকে দান করতে থাকলেন, এভাবে একপর্যায়ে সবচে’ পছন্দের ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। [মুসলিম, হাদিস ২৩১৩]

তাহলে দেখা যায়, দানের প্রথমে সাফওয়ান মুগ্ধতা কিংবা ভালোলাগার অধিক কিছু পান নি। এরপর সেই ভালোলাগা পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে এবং একসময় ভালোবাসার অন্দরে পৌঁছে দেয়।

ভালোবাসার দাবি

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসো, তবে আমার অনুসরণ কর, তা হলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১]

এ আয়াতটি আল্লাহকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটি দলিল হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে সে-ভালোবাসার জন্যে আপনার সামনে এই একটি পথই মাত্র আছে, যে-পথ নবীজিকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে গেছে। সে-পথ হলো, নবীজিকে অনুসরণ করার পথ। যখন অনুসরণ আপনার অর্জন হবে, তখন কোরআনের আয়াত মতে আল্লাহর ভালোবাসাও অর্জন হবে আপনার। আর আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্য কথা কার হতে পারে?

সিরাতে রসুল অধ্যয়ন

এই অনুসরণই আপনার কাছে দাবি করে, আপনি তার পরিচয় সম্পর্কে অবহিত হবেন।

সাহাবা প্রজন্মের সকলেই তাকে দেখা এবং তার সাথে ওঠা-বসার মাধ্যমে পরিচয় লাভ করেছেন। এই মর্যাদা আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে কেবল তাদের দিয়েছেন। তবে তারা ছাড়া অন্যরাও তার সীরাত অধ্যয়নে মাধ্যমে সহজেই পরিচিতি লাভ করতে পারে। তাই পূর্বসূরিরা রসুলের সীরাত অধ্যায়ন ও তার পরিচিতি লাভের ব্যাপারে সচেতন করেছেন, প্রেরণা যুগিয়েছেন, উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

যাইনুল আবেদিন রহ.—যিনি হোসাইন রা.-এর ছেলে এবং আলী রা.-এর দৌহিত্র—বলেন— আমরা নবীজির গাযওয়া-অধ্যায় (নবীজির জিহাদি জীবনের পাঠ ও দর্শন) সেভাবেই জেনেছি, যেভাবে জেনেছি কোরআনের সূরাগুলো। [ইবনে কাসির রহ. কৃত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ- ৩, পৃষ্ঠা ২৪২] কেননা, গাযওয়া-অধ্যায় তার মহিমান্বিত সিরাতেরই একটি অংশ।

ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন— বান্দার উভয় জগতের সফলতা নিহিত রসুল স.-এর দেখানো পথেই। তাই যে ব্যক্তি নিজের কল্যাণ কামনা করে এবং মুক্তির প্রত্যাশা করে, তার জন্যে আবশ্যক হলো, রসুলের পথ ও সীরাত  সম্পর্কে জানা এবং এটাই তাকে অজ্ঞদের দল থেকে বের করে আনবে। [ইবনুল কাইয়িম রহ. কৃত যাদুল মায়াদ, খ- ১, পৃষ্ঠা ৬৯]

তিনি রসুল প্রেমিকের উদ্দেশ্যে আরও বলেন— যে ব্যক্তি তাকে অর্থাৎ নবীজিকে তার ইমাম, শিক্ষক, ওস্তাদ, শায়খ ও আদর্শ বানায়, যেমন আল্লাহ তাকে নবী, রসুল ও তার পথের দিশারী বানিয়েছেন, সে অধ্যয়ন করবে তার সীরাত ও তার কর্মনীতি এবং তার প্রতি অহি অবতরণের অবস্থা, আর জানবে তার আবাসিক ও প্রাগতিক জীবনের এবং তার ঘুমে ও জাগরণকালের আখলাক ও আচরণ, প্রভুর সামনে সমর্পণ এবং পরিবার ও সাথিবর্গের সাথে তার লেনদেনের হাল-হকিকত। এভাবে যেনো সে নিজেই হয়ে যাবে তার সঙ্গে থাকা সাহাবিদের একজন। [ইবনুল কাইয়িম রহ. কৃত মাদারিজুস সালেকিন, খ- ৩, পৃষ্ঠা ২৬৮]


[লেখক পরিচিতি : সালেহ আহমদ শামী। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লেখালেখির কথা মোটেই ভাবেন নি এবং একসময় একটি সিরাত-সেমিনারে ডাক পাওয়ার পর ৫৪ বছর বয়সে প্রথম লেখেন ‘মিন মায়ীনিস সীরাত’ শিরোনামে সাড়া জাগানো গ্রন্থ। এবং সীরাত রচয়িতা হিসেবেই প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। যদিও আখলাক, ঈমান, ইসলাম ও ফারায়েজ বিষয়ক আরও দশের অধিক গবেষণা গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন।

দামেস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দুমা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালে। অনন্য কৃতিত্বের সাথে পড়ালেখা সমাপ্ত করেন করেন ১৯৫৮ সালে সিরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে, যা বর্তমান দামেস্ক ইউনিভার্সিটি নামেই সমধিক পরিচিত। প্রথমেই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের কিং সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অধীনে অধ্যাপনা করেছেন। এরপর থিতু হয়েছেন রিয়াদে।]


মূল— সালেহ আহমদ শামী। অনুবাদ— মনযূরুল হক। আরবি ‘মিন মায়ীনিশ শামায়েল’ নামক গ্রন্থটি বাংলাতে ‘মুহাম্মাদ সা. ব্যক্তি ও নবী’ নামে প্রকাশ করেছে আকিক পাবলিকেশন্স।


 

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ