মানব শরিয়াহ বিশেষজ্ঞের স্থান দখল করতে চলছে রোবট শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ?

অথর- টপিক- ইনোভেশন/লিড স্টোরি

মূল— মুফতি ইউসুফ সুলতান। ভাষান্তর—  মিরাজ রহমান


কিছুদিন আগে আমি কুয়ালালামপুরে ফিনটেক (ফাইন্যানশিয়াল টেকনোলজি) বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করি। দুই দিন ব্যাপী সে সেমিনারে কয়েকজন তরুণ শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভবিষ্যত ক্যারিয়ার নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অর্থনৈতিক প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় রোবট-উপদেষ্টার উত্থানের সাথে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনেক রোবো-শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ বা উপদেষ্টার উত্থান ও সুদৃঢ় অবস্থান লক্ষ্য করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এর মানে কি এই যে, মানব শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ বা শরিয়াহ পরামর্শদাতার আর প্রয়োজন হবে না? মানব-শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের স্থান দখলে নিবে রোবো শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ? এটা কী আদৌ সম্ভব? এই বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

বর্তমানে কেবল শরিয়াহ সম্মত বিনিয়োগ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় রোবো শরিয়াহ অ্যাডভাইজার বা বিশেষজ্ঞের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, ওয়াহেদ ইনভেস্ট এবং অ্যালজেবরা– উভয় প্রতিষ্ঠান রোবো-শারিয়াহ বিশেষজ্ঞের প্ল্যাটফর্মের অগ্রদূত হিসাবে বিবেচ্য। শরিয়াহ অনুবর্তী পোর্টফলিও ফিল্টার করা এবং বিনিয়োগকারীদের তাদের ঝুঁকি গ্রহণের অভিরুচির ওপর ভিত্তি করে আর্থিক পরামর্শ প্রদান করার জন্য অ্যালগরিদমভিত্তিক মেকানিজম কাজে লাগানো হয় এগুলোতে। অ্যালজেবরা মূলত এশিয়ান বাজারের জন্য তৈরি। স্টক বিশুদ্ধিকরণ এবং বিনিয়োগ সেবা ছাড়াও প্ল্যাটফর্মগুলো আর্থিক, ব্যবসায় এবং পরিচালনাগত শারিয়াহ স্ক্রীনিং প্রদান করে।

তবে আর্থিক উপদেষ্টা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপকের বাইরেও আগামীতে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ রোবটদের বিস্তৃত ভূমিকা থাকতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এই রোবটগুলো যেকোনো পণ্য অথবা চুক্তির শরিয়াহ-যথার্থতা যাচাই বাছাই করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিক্রয় চুক্তিতে যথাযথভাবে প্রস্তাব এবং গ্রহণ করা হয়েছে কিনা, চুক্তির মূল বিষয় (সাবজেক্ট ম্যাটার) যেমন পণ্য, এবং পণ্যের মূল্য চূড়ান্তভাবে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে কিনা, কোনো অনিশ্চয়তা চুক্তিতে রাখা হয় নি তো, ইত্যাদি। অনুরূপভাবে অংশীদারিত্বের চুক্তিতে লাভের হার সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে কিনা, অংশীদারিত্বের কোনো পর্যায়ে কোনো অংশীদারকে লাভ থেকে বঞ্চিত করার উপায় রাখা হয় নি তো, ইত্যাদি। একইভাবে মূলধনের হার সুনির্দিষ্ট করা, যেন ক্ষতি বা লস ভাগাভাগির হিসাব সঠিক হয় (যদি লস হয়)।

উপরন্তু, রোবো-উপদেষ্টা চুক্তি বা পণ্যের ক্ষেত্রে শরিয়াহর বিভিন্ন লক্ষ্য পূরণ করছে কিনা তা-ও তদন্ত করতে পারে। একইভাবে এটি ইএসজি (এনভায়রনমেন্টাল সোশ্যাল গভর্নেন্স) বা পরিবেশগত-সামাজিক-শাসনগত মানদণ্ডগুলোর সকল নির্ণায়ক পূরণ করছে নাকি তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং এর ভিত্তিতে একটি স্কোর দিতে পারে।

যখন একটি রোবট এসকল তদন্ত শেষ করে একটি ফলাফল প্রকাশ করবে, তখন মানব শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা তাদের কুরআন-সুন্নাহ থেকে আহরিত জ্ঞানের ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়াটিকে যাচাই বাছাই করবেন, এবং পণ্য বা চুক্তিটির বিষয়ে ফাতওয়া প্রদান করবেন। মানব শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের এহেন ভূমিকা সবসময়ই থাকবে। আল্লাহ্‌ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘তোমরা যদি না জেনে থাকো তাহলে তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর। (সূরা- আল আম্বিয়া, আয়াত- ৭)

আল-কুরআনের ‘আহল আল-যিকর’ বা জ্ঞানীর ব্যাখ্যা করা হয় অহির জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হিসেবে। এজন্যেই মানব শরিয়াহ বিশেষজ্ঞের সবসময় একটি ভূমিকা থাকবেই।

মানব শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম একটি মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্যে শরিয়াহসম্মত উপায় বলে দেওয়া। অন্যদিকে প্রযুক্তি আমাদের সকল কাজ সহজ, দ্রুত এবং কর্মদক্ষ করে তুলছে। এজন্যেই শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদেরকে সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যাপারে সচেতন এবং জ্ঞাত থাকাটা সময়ের প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, বিগ ড্যাটা, ব্লকচেইন ও স্মার্ট কন্ট্রাক্টসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিগত আবিষ্কার দিয়ে বহু কাজ করা সম্ভব এবং এইগুলোর ব্যবহারে শরিয়াহরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হতে পারে।

মূল ইংরেজি আর্টিকেলটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে…

 

মুফতি ইউসুফ সুলতান- বাংলাদেশের তরুণ আলেমদের মধ্যে বেশ অগ্রগণ্য একটি নাম। বাংলাদেশের সীমানা ছাপিয়ে বিশ্বের বুকে লাল সবুজের পতাকাতে উড্ডীনকারী একজন আলেমেদ্বীন। জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা থেকে কওমি মাদরাসার কারিকুলামে পড়াশুনা সম্পন্ন করেছেন তিনি। ২০০৮ সালে তাকমিল পরীক্ষায় বাংলাদেশে কওমি শিক্ষা বোর্ডে প্রথমস্থান অধিকার করেন ইউসুফ সুলতান। ২০১২ সালে দেশের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া শারিইয়্যাহ মালিবাগের ইফতা বিভাগে সহকারী মুফতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তিনি। পাশাপাশি গাজীপুরে অবস্থিত ওআইসি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় আইইউটিতে তিনি খণ্কাডলীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন ইন ইসলামিক ফাইন্যান্সে ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি করছেন। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি ইথিস ভেঞ্চার্সে শরিয়াহ-টেক কন্সালটেন্ট এবং ঢাকাস্থ পারফেক্ট গ্রুপের শরিয়াহ এক্সিকিউটিভ কমিটিতে মেম্বার সেক্রেটারি হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা ও গবেষণা জার্নালে ইসলামী অর্থনীতি, ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট বিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ ও গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তার। দ্য সুলতানে লিখছেন অতিথি লেখক হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ