জেরুজালেম কেনো এতোটা গুরুত্বপূর্ণ?

অথর- টপিক- অপিনিয়ন

কুরআন-হাদীসের বর্ণনা ও বাইবেলের বর্ণনাসহ সব দিক দিয়ে দেখলে তিনটি ধর্মের কাছেই জেরুজালেম শহরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।  মূলত তিন ধর্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণেই এই শহরটির এতো গুরুত্বপূর্ণ।


পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জনবসতিগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে জেরুজালেম। দুনিয়ার এমন কোন সচেতন ও জ্ঞানী মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে যিনি জেরুজালেমের নাম শোনেননি। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত এই শহরটি আয়োতনে খুব বেশি বড় না হলেও বিশ্বরাজনীতির পরিমন্ডলে এর অবস্থান ও ভূমিকা অন্য যে কোন শহরের তুলনায় বেশি। জেরুজালেম পৃথিবীর একমাত্র শহর বা স্থান যেটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ তিনটি ধর্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম; এই তিন ধর্মের অনুসারীরাই এই শহরটিকে তাদের পবিত্রশহর হিসাবে বিশ্বাস করে এবং সেজন্য শহরটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দাবী করে। অন্যান্য কিছু কারণ থাকলেও মূলত এই তিন ধর্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণেই এই শহরটির এতো গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত বলা যাক ইহুদী ধর্মের কথা। ইহুদীদের সবথেকে পবিত্র জায়গা বা ইবাদাতস্থল হচ্ছে ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা উইলিং ওয়াল। এই দেয়ালটি বাইবেলে বর্ণিত দ্বিতীয় উপাসনালয়ের বাইরের একটি ছোট অংশ। আর এই দ্বিতীয় উপাসনালয়টি মূলত নির্মিত হয়েছে সুলাইমান-এর উপাসনালয়ের স্থানে। দ্বিতীয় উপাসনালয়টিকে বলা হয় সেকেন্ড ট্যাম্পল।  আর আসলটাকে বলা হয় ফার্স্ট ট্যাম্পল। এই উপাসনালয়টি ইহুদিদের প্রাচীন উপাসনালয়গুলোর একটি। পুরো উপাসনালয় এখন না থাকলেও উপাসনালয়ের যে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে তারই একটি অংশ হচ্ছে এই দেয়াল। এখানে এসেই ইহুদীরা প্রার্থনা করে। আবার তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই শহরেই অবস্থিত হায়কল-ই-সোলাইমান বা সোলাইমানের উপাসনাগৃহ। যা ইসলামের নবী সুলাইমান, যিনি তাদের ভাষায় সোলেমন, তার প্রতিষ্ঠিত। এবং এখানে বসেই রাজত্ব পরিচালনা করেছেন সুলাইমানের বাবা দাঊদ (ডেভিড)।

খ্রিস্টানদের কাছেও এই শহরটি অনেক পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের অন্যতম প্রধান চার্চ “চার্চ অব দ্যা হলি সেপালক্রে” এই শহরেই অবস্থিত। এটির অবস্থান পুরোনো দেয়ালের বাইরে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস মতে এই চার্চের জায়গাতেই নাকি ঈসা আ.-এর মৃত্যুর পর মরদেহ আনা হয়েছিলো। এখানেই তার মরদেহ পরিস্কার করে কবরস্থ করা হয়। আবার এখান থেকেই তার পুনর্জন্ম হয়। (ইসলামী বিশ্বাস মোতাবেক ঈসা আ.কে আল্লাহ তা‘আলা জীবিত অবস্থায় উঠিয়ে নিয়ে গেছেন, যে কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। তাই খ্রিস্টান বিশ্বাস অনুযায়ী ঈসা আ. মারা গেছেন এবং তাকে কবর দেয়া হয়েছে এবং এখান থেকে আবার পুনর্জন্ম পাওয়ার ঘটনা নিছক তাদের বানানো মিথ্যা কাহিনী। এটি ইসলামী বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধী।) এই গির্জাকে ঘিরেই খ্রিস্টানদের জেরুজালেমপ্রেম বহমান। তাছাড়া এই শহরের কাছেই রয়েছে বেথেলহেম, যেখানে ঈসা আ. (তাদের ভাষায় জেসাস বা যিশু)-এর জন্ম হয়েছিলো এবং তার মা মেরি (মারিয়াম আ.)-এর কবর।

ইসলাম ধর্ম। ইসলাম ধর্মে কাছে জেরুজালেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতের জায়গা। ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয়- উভয় দিক থেকেই জেরুজালেম শহরটি মুসলিমদের নিকটও গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিমদের নিকট জেরুজালেম এতটা গুরুত্ব পাওয়ার কয়েকটি কারণ হলো- এই জেরুজালেমে অবস্থিত রয়েছে মাসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস, যে মসজিদ কাবা নির্মাণের মাত্র ৪০ বছর পরেই তৈরি করা হয়েছিলো। এবং পরে সুলাইমান (আ.) জীনদের মাধ্যমে পুননির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদের কথা কুরআনেও উল্লেখ রয়েছে। (সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ০১) এই মসজিদই ছিলো মুসলিমদের প্রথম কিবলা। এই মসজিদের দিকে ফিরেই মুসলিমরা ১৬/১৭ মাস সলাত কায়েম করেছেন। এই মসজিদ থেকেই শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.) মিরাজে রওয়ানা দিয়েছিলেন। বিশেষ ছাওয়াবের আশায় এই মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয। মক্কার মাসজিদে হারাম, মদীনার মাসজিদে নবভী ও জেরুজালেমে অবস্থিত মাসজিদুল আকসা- এই তিনটি মাসজিদ ছাড়া অন্য কোন মাসজিদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বাড়তি ছাওয়াবের আশায় সফর করা নিষেধ। এই মাসজিদে সলাত আদায় করলে তা মক্কা-মদীনার দুই মাসজিদ ছাড়া অন্য যে কোন মাসজিদের তুলনায় ৫০০ গুণ ছাওয়াব বেশি হয়।মোটকথা বাইবেলের বর্ণনা ও কুরআন-হাদীসের বর্ণনা সব দিক দিয়ে দেখলে তিনটি ধর্মের কাছেই জেরুজালেম শহরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। দীর্ঘদিন এই শহরটিতে ইহুদী ও মুসলিমরা মিলেমিশে বসবাস করে আসলেও ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বরের বেলফোর ঘোষণা দেয়া এবং ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনী ভূখ-ে মধ্যপ্রাচ্যে বিষফোড়া নামে কুখ্যাত ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিমদের সাথে ইহুদীদের সংঘাত চলে আসছে। হাজার বছরের ফিলিস্তিনী মুসলিম আদিবাসীরাই আজ নিজভূমে পরবাসী। শুধু পরবাসীই নয়, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যূত।

দীর্ঘদিন যাবৎ এই সংঘাত চলছে। কিন্তু বিশ্ব মোড়লরা কেউই ইসরাইলের অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কিছুই করছে না। আরব রাষ্ট্রগুলো একাধিকবার ফিলিস্তিনীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ করলেও ইসরাইলের সাথে পেরে ওঠেনি। ফলে আমেরিকার সমর্থনে ও সহযোগিতায় প্রায় পুরো ফিলিস্তিন জবরদখল করে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃত ইসরাইলে মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে নিয়ে আসার আনুষ্ঠানিক বিলে স্বাক্ষর করে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিলো। অথচ এই জেরুজালেম মূলত ফিলিস্তিনের রাজধানী। তিনটি ধর্মের কাছে জেরুজালেম পবিত্রস্থান হলেও নিয়ন্ত্রণাধিকার মূলত ফিলিস্তিনীদের। কারণ তারা এখানের আদী বাসিন্দা। তাই জেরুজালেমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে হলে জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনীদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল- একজন তরুণ লেখক ও গবেষক। তিনি ২০০৮ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কওমী মাদরাসা “মাদরাসাতুল হাদীস” থেকে দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষায় মুমতায মানে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। তারপর তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-এর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় হয়ে স্নাতক (সম্মান) ও প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে এম.ফিল গবেষণায় রত আছেন। একই সাথে তিনি বর্তমানে ঢাকার উত্তরার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট ফর এডুকেশন এন্ড রিসার্চ-এ গবেষক হিসাবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বিভিন্ন রচনা, উপস্থিত বক্তৃতা ও জ্ঞানভিত্তিক টেলিভিশন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। ২০১১ সালে ইসলামিক টিভি আয়োজিত সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতা “হিটাচী চৌকস”-এ চ্যাম্পিয়ন হন এবং ২০১৫ সালে চ্যানেল নাইনে “আলোকিত জ্ঞানী” প্রতিযোগিতায়ও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিবন্ধ লেখেন। ইতোমধ্যে তার বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধ ইসলামী আইন ও বিচার এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। দ্য সুলতানে লিখছেন অতিথি লেখক হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ