জেরুসালেম তাহলে কার?

অথর- টপিক- অপিনিয়ন/লিড স্টোরি/হাইলাইটস

কোনো ধর্মমত বিবেচনায় না এনে যদি প্রশ্ন করা হয়— এই মসজিদটি কার? আপনার বাড়ির পাশে কিংবা আপনার ঘরের কাছেই যে মসজিদটি আছে, যেখানে আপনার বাবা কিংবা দাদার দানকৃত ভূমি রয়েছে, সেটা কি আপনার উত্তরাধিকার? কিংবা ওই মন্দিরটি? সেটাও কি একইভাবে আপনার বন্ধু তন্ময় কিংবা সঞ্জয় তাদের মিরাস সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারে? আপনার শহরে অবস্থিত গির্জাটি নিয়েও কিন্তু আমরা একই প্রশ্ন করতে পারি। হতে পারে এমন প্রশ্নের মুখে আপনাকে কখনও পড়তে হয় নি, কেননা, এভাবে কেউ প্রশ্ন করে না। চমকানো সুন্দর মসজিদ (একইভাবে মন্দির বা গির্জা) হলে হয়তো সর্বোচ্চ জিজ্ঞেস করা হতে পারে— এটা কে করেছে? আপনার জানা থাকলে অবলীলায় বলে দিলেন— শরফুদ্দিন সান্টু ইত্যাদি। তারপরও যদি কেউ আপনাকে এমন বেমক্কা প্রশ্ন করেই বসে, আপনি তাকে হয়তো নাস্তিক ভাববেন, কিংবা ঈমানের জোর বেশি থাকলে বলবেন— কার আবার? আল্লাহর। ভিন্ন ধর্মের হলে বলবেন— মুসলমানদের।

যদিও মসজিদ কারও ব্যক্তিগত সম্পদ হয় না। মসজিদ আল্লাহর ঘর, বাইতুল্লাহর অংশ। যেখানে মসজিদ একবার নির্মিত হয়ে যায়, কেয়ামত দিবস অবধি সেটা আল্লাহর মালিকানায় চলে যায়। তাই যদি কোনো মসজিদে সাধারণের প্রবেশাধিকার না থাকে, তাহলে সেখানটায় জুমাবারের সালাত আদায় হবে না— এ-ই ইসলামের বিশ্বাস। কেননা, মালিক যেহেতু আল্লাহ, সুতরাং আল্লাহর বান্দা হিসেবে সেখানের কর্তৃত্ব সবার সমান, একক কারও হতে পারে না।

সন্দেহ নেই, উপসনালয়ের ব্যাপারে একই ধরনের বিশ্বাস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকেই লালন করে পৃথিবীর তাবৎ ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাদের নিজেদেরই হাতে গড়া এবাদতগাহ নির্মাণের পর আর তাদের নিজেদের থাকে না, সেখানে শুধু তাদের এবাদতেরই অধিকার থাকে, অন্য কিছু নয়। এবাদতের স্থানটুকু ঈশ্বরের নামে প্রদত্ত পবিত্র ভূমি।



ভিয়া ডলোরোসা, যে-পথে নবী ঈসাকে (আ.) নিজের ক্রস বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। ছবি  : সংগৃহীত


একই কথা প্রজোয্য জেরুসালেমের ব্যাপারেও। অন্তত তা-ই হওয়া উচিত। সম্ভবত সব মানুষ সেটা জানেও এবং মানেও। কিন্তু জেরুসালেমের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, অন্য যে-কোনো স্থানের বেলায় যে-ধর্ম যেখানটাকে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে স্বীকৃতি দেয়, সেখানটা শুধু সেই ধর্মের লোকদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে, অন্য ধর্মের লোকেরা অল্প-বিস্তর মতানৈক্য না-থাকলেও শান্তি বজায় রাখার নিমিত্ত সেটা মেনেও নেয়। ছোট ‘পবিত্র ভূমি’ যেমন মসজিদ, মন্দির প্যাগোডা, গির্জা, টেম্পল ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাতে গোণা সামান্য কয়েকটি উদাহরণ বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই আপন আপন ধর্মের লোকেরা আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। একান্ত তীর্থভূমি নিয়েও খুব একটা বিরোধ বাঁধে না। হিন্দুদের কাশি, বৌদ্ধদের শোয়েডগ প্যাগোডা এবং মুসলমানদের মক্কা-মদিনা নিয়ে কোনো উৎপাত নেই। কিন্তু জেরুসালেমের বিপত্তি এখানেই যে, এই একই ‘পবিত্র ভূমি’ যখন বিশ্বের ধর্মের এবং তিনটিই আসমানি ধর্ম— ইহুদি, খ্রিষ্ট ও ইসলাম। এ-কারণেই জেরুসালেম অনন্য। এখানেই সাধারণ যে-কোনো তীর্থভূমি বা পবিত্র ভূমির সঙ্গে জেরুসালেমের তফাত।

অবশ্য এটা ঠিক যে, আমরা কখনও কখনও কয়েকটি ধর্মের উপাসনালায় পাশাপাশি অবস্থান করতেও দেখি। মসজিদের পাশেই গির্জা। গির্জার ঘন্টার ধ্বনি ও মসজিদের আজান ধ্বনি সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মসজিদ কিংবা গির্জাবাসীরা একে অপরের উপাসনালয় দখল করতে যায় না। কিন্তু জেরুসালেমে কী এমন রয়েছে যে, এখানে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীরা কেবল নিজেদের উপাসনালয়ে এবাদত করেই সন্তুষ্ট নয়, বরং এই ভূমিটাই তাদের দখলে রাখতে হবে? অথচ তিন ধর্মই প্রভু হিসেবে আল্লাহকে মান্য করে এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, পবিত্র ভূমির মালিকানা কোনো মানুষের নয়—আল্লাহর। তাহলে দ্বন্দ্বটা কিসের? ঈশ্বরের মালিকানা নিয়ে?

এমনও নয় যে, এই দ্বন্দ্ব দুয়েকবার ঘটেই শেষ হয়েছে। বরং জেরুসালেমের দীর্ঘ ইতিহাসে, শহরটি কমপক্ষে দুইবার ধ্বংস হয়েছে, ২৩ বার অবরোধ হয়েছে, ৫২ বার আক্রমণ হয়েছে এবং ৪৪ বার দখল এবং পুনর্দখল হয়েছে।[1]ধর্মের লড়াইয়ের সাথে সাথে এখানে অধর্মের কাজও যে কম হয়েছে, তা নয়। আজও শহরে কোনো প্রত্নতত্ত্ব সন্ধান করতে গেলেই দেখা যায়, কোনো মসজিদের নীচে ইহুদি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ অথবা কোনো গির্জার নীচে দেখা গেলো মসজিদের চিহ্ন। যদি অধর্মই না হবে, তাহলে রোমান খ্রিষ্টানদের হাতে এই শহর ধ্বংস হবে কেনো? খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভূমি কী করে খ্রিষ্টানদের হাতেই রক্তাক্ত পারে?

বহু জটিলতা আর বহু প্রশ্ন জড়িয়ে আছে জেরুসালেম কার এই প্রশ্নে সাথে। আমরা ইতিহাস ও বর্তমান জেরুসালেমের পবিত্র নিদর্শনগুলো খুঁজতে খুঁজতে সে-সব প্রশ্ন খতিয়ে দেখার প্রয়াস পাবো।

এক. আজ যেখানে জেরুসালেম নামে বিখ্যাত নগরী উপস্থিত, ইতিহাসের প্রারম্ভে, প্রায় ৫০০০ বছর আগে, সেখানে ছিলো একটি ছোট্ট গ্রাম। উঁচুনিচু মরুভূমির অভ্যন্তরে একটি সবুজ উপত্যকার মধ্যে খেজুর ও জলপাই গাছে ঢাকা গ্রামটিতে ঠিক কী ছিলো যা মোজেস, আব্রাহাম, যিশুখ্রিষ্ট (নবী মুসা, ইব্রাহিম ও ঈসা আ.) থেকে মুহাম্মাদ (স.) পর্যন্ত সবাইকে আকর্ষণ করে এসেছে? এখানকার মাটিতে কী আছে যা তিন-তিনটে বিরাট ধর্মের জন্ম দিয়েছে?

শহরের গা ঘেঁষে উঁচু টিলা—মাউন্ট অব অলিভ, জলপাই পাহাড়। মুসলিমরা বলে যাইতুন, কোরআনে এই ফলের কসম খেয়েছেন আল্লাহ। জেরুসালেমসহ এ-অঞ্চলের মানুষের অত্যন্ত্র প্রিয় ও প্রধান খাদ্যেরও একটি অলিভ। এই মাউন্ট অব থেকে সারা জেরুসালেম দেখা যায়। দেখা যায় পাথরে গাঁথা ৫০০০ বছরের পুরোনো শহর (Old City) ও তার মধ্যমণি সোনার পাতে মোড়া ডোম অব রক (Dome of the Rock)। ২০০০ বছর আগে নবী ঈসা (আ.) যখন জেরুসালেম দেখেছেন সেই, কেমন ছিলো শহরটা তখন? হয়তো পুরোনো শহরের আশেপাশে তখন ছিলো শুধু কাঁটাঝোপ। আজকের মতো রাস্তাঘাট, অট্টালিকার চিহ্নও ছিলো না। তখনও কি তিনি জানতেন নিয়তি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ওই জেরুসালেমের মধ্যে দিয়েই ভারি ক্রশ পিঠে চাপিয়ে তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।



৬-নং স্টপ-এ ভেরোনিকা তৃষ্ণার্ত নবী ঈসাকে আ. জল দিতে চেয়েছিলেন। ছবি : সংগৃহীত


১৯৪৮-এর পর থেকে পুরো শহরকে ভাগ করে রেখেছে ডিভাইডেড প্রাচীর। একদিকে ঝাঁ-চকচকে নতুন বাড়ি, হাইওয়ে, বিরাট বিজ্ঞাপন, বাস ট্যাক্সির ব্যস্ততা, আর অন্য দিকে জীবন চলে মন্থর গতিতে, পায়ে হেঁটে, ব্যস্ততাহীন প্রার্থনায় মাথা ঝুঁকিয়ে। শহরের চারদিকে বেশ কয়েকটি গেট রয়েছে। পশ্চিমে জাফা গেট—বেশিরভাগ পর্যটকদের এটাই ব্যবহার করতে হয়। উত্তরে দামস্কাস গেট, দক্ষিণে জায়ন (Zion) গেট, এবং পূর্বে লায়ন (Lion) গেট। দক্ষিণপূর্ব কোণে আছে ডাং (Dung) গেট । জেরুসালেমে সাড়ে আট লাখ মানুষের মধ্যে ৩৭ শতাংশ আরব এবং ৬১ শতাংশ ইহুদি। আর রয়েছে কিছু আরব খ্রিষ্টান। সংখ্যায় ইহুদিদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ।

এই শহর একবার সর্বৈবে ধ্বংস হয় ৫৮৬ খ্রিষ্টপুর্বাব্দে পারস্য সম্রাট নেবুকান্দজ্জোরের হাতে। শোনা যায়, তিনি পৌত্তলিক ছিলেন । একজন পৌত্তলিকের কোন বাসনা চরিতার্থ করার রহস্য এখানে রয়েছে, তা কেউ জানে না । তিনশত বছর পরে ১৬৭ খ্রিষ্টপুর্বাব্দে শহরটি আবার ধ্বংস হয় এবং ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে শেষবার একে ধ্বংস করে হেরোড। দ্বিতীয় খলিফা ওমরের (রা.) বিখ্যাত জেরুসালেম সফরের পর মসজিদটি খুলে দেয়া হয়। বর্তমান কাঠামোটি নির্মিত হয়েছে খলিফা আল-ওয়ালিদের দ্বারা ৬৪ হিজরিতে। এরপর এসেছে ক্রুসেড ১০৯৬ থেকে ১২০২ সাল পর্যন্ত মসজিদটি কয়েকবার অবরুদ্ধ হয়েছে কিন্তু ধ্বংস করে নি কেউ। ১১৯২ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন একে সবার জন্য উম্মুক্ত করেন।

দুই. এখানে পর্যটকীয় দৃষ্টিতে জেরুসালেমের প্রধান আকর্ষণ এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে সবচে’ পবিত্রতম স্থান হলো ডোম অব রক বা কুব্বাতুস সাখরা। বিস্ময়ের কথা হলো, ডোম অব রকের সোনালী গম্বুজকেও বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ মসিজেদ আকসা বলে ধারণা করে । তবে ডোম অব রক ও মসজিদে আকসা এক নয়, বরং মসজিদে আকসা কাছেই খুব অনাকর্ষণীয় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ।

ডোমের জানালাগুলোর ওপরেই টানা সিলিং পুরো পাশ জুড়ে। সিলিংয়ের ওপরের অংশে তিন সারি ক্যালিগ্রাফিতে অসাধারণ কৌশলে কুরআনের সেই আয়াত খচিত, যে-আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মাদের স. উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণের সত্যতা বয়ান করেছেন— পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তার বান্দাকে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে দূরতম মসজিদ (আকসা) পর্যন্ত যার চার পাশকে আমি সুশোভিত করেছি যাতে আমার নিদর্শনাবলি তাকে দেখাতে পারি। আমিই সর্বজ্ঞ ও সর্বদ্রষ্টা।[2]  আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর কেন্দ্রীয় গম্বুজের সোনালি শরীরে যা নির্মাণ করা হয়েছে ৮০ কেজি খাঁটি সোনার আস্তরে জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে; চৌকো চৌকা মোজাইক-মেটালের অসংখ্য আশ্চর্য সজ্জায়নে।

জেরুসালেমবাসীর দাবি, একমাত্র পিরামিড ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো নির্মাণে এত রহস্য নেই। ১৯৬৭ সালে জর্ডান ও ইসরাইল এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরের সব কিছু দেখভাল করবে ওয়াক্ফ বা ইসলামি ট্রাস্ট। আর ইসরাইল এটির বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। অমুসলিমরা শুধু পরিদর্শনে যেতে পারবেন। তবে সেখানে প্রার্থনা করতে পারবেন না। প্রার্থনা করার অনুমতি কেবল মুসলিমদের।

জেরুসালেম মসজিদে আকসা মুসলমানদের প্রথম কিবলা, এখান থেকে মিরাজ, এই মসজিদে নামাজে ৫০ হাজারগুণ সাওয়াব বেশি। একটি সাধারণ ছোট্ট মসজিদ, চোখে পড়ার মতো নয় মোটেই, কিন্তু সেটাই মক্কা ও মদিনার পরে তৃতীয় মহৎ পুণ্যস্থান। অথচ এখানেই ঢুকলেই প্রশ্ন জাগে এখানে কি কখনো নামাজ হতো? এটাই কি মুসলমানদের আদি কিবলা? বায়তুল মাকদাসের ‘কিবলা’ কি একটি শহর, পাহাড়, নাকি এই ডোম? মসজিদুল আকসা নামে যে একতলা মসজিদটি এই পাহাড়েররই দক্ষিণ কোণে অবস্থিত যেটি নির্মিত হয়েছে খলিফা ওমরের নির্দেশে ও নির্দেশনায় সেটি আর ‘এটির’ এই দ্বিঅবস্থান কেন? আর কেনোইবা মসজিদ না হওয়া সত্ত্বেও এই ডোম অব রককেই গড়া হলো এমন আশ্চর্য সৌন্দর্যে? ১৯৬৪ সালে কিং হুসেন তার লন্ডনের প্রাসাদ বিক্রির ৮২ লাখ মার্কিন ডলারের পুরোটা দিয়েছেন যে নির্মাণের জন্য ।



চার্চ অফ হোলি সেপালক্‌র। ছবি : সংগৃহীত


ওল্ডসিটির এক ছষ্ঠাংশজুড়ে অবস্থিত আকসা ও ডোম অব রকের চত্বর। প্রায় ১,৪৪,০০০ স্কয়ার মিটার। মূল ভবন লম্বায় ৮৩ মিটার, প্রস্থে ৫৬ মিটার। মসজিদ ও চত্বর মিলিয়ে পাঁচ লাখ লোক একসাথে এখানে নামাজ আদায় করতে পারে। মক্কায় মসজিদুল হারামের মাত্র ৪০ বছর পর এর ভিত্তি স্থাপিত হয়। যদিও ধর্মবেত্তা ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। কেউ বলেন, আদিপিতা আদেমের আ. হাতেই এর ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। কারও মতে, কাজটি করেছেন ইবরাহিম (আ.)। সর্বাধিক প্রচারিত মত হলো, মসজিদে আকসা তৈরী করেন সোলায়মান আ. খ্রিষ্টপুর্ব ১ হাজার অব্দে।

সারা শহরটা ইহুদিদের অধিকারে হলেও ডোম অব রক জর্ডানের বাদশাহর দখলে। মুসলমানদের জন্য নয়টি গেট সবসময় খোলা, কিন্তু অ-মুসলমানদের জন্যে একটি গেটই খোলা, তাও কেবলমাত্র সকালে দু-ঘন্টার জন্য। তবে ইহুদি আইন অনুযায়ীও এখানে তাদের যাওয়া ও প্রার্থনা করা নিষেধ। কেননা, ইহুদিরা মনে করে, এই কম্পাউণ্ডে ছিলো বাইবেলে উল্লিখিত ইহুদিদের উপাসনালয়। যেখানে প্রবেশ তাওরাত বা মিসনাহ্ অনুসারে মহাপাপ। ‘পরম পবিত্রতা’ ছাড়া এখানে কোনো ইহুদি প্রবেশ করতে পারবে না যার ব্যতিক্রম হবেন কেবল প্রধান রাব্বি আর সেই প্রত্যাশিত মাসিহ্। তবে কম্পাউন্ডের পশ্চিমে মাত্র কয়েক ফুট লম্বা দেয়ালটি ওয়েস্টার্ন ওয়াল (Western Wall) বা ওয়েটিং ওয়াল ( Wailing Wall)  নামে পরিচিত । এখানেই সব ইহুদিরা সকাল সন্ধ্যা দল বেঁধে প্রার্থনা করেন। পুরোনো দেয়ালের পাথরের খাঁজে গুঁজে দেন ছোট্ট কাগজে লেখা প্রার্থনা। সামনে একটু খোলা চত্বরে নানারকম ধর্মাচার করেন । ইহুদিদের বিশ্বাস, এখানেই মূলত হায়কল-ই সোলায়মানের মূল ভিত্তি ছিলো, অটোমান সৈন্যরা সেটা ভেঙে মসজিদ বানায়।

কিন্তু মুসলিমদের মতে এই পাথরের গায়ে বাঁধা হয়েছিল মহানবী (স.)-এর মিরাজের বাহন বোরাক। জেরুসালেমবাসীদের বিশ্বাস—এখান থেকেই স্বর্গের দূরত্ব সবচে’ কম, নাহলে নবী মুহাম্মাদ (স.) কাবার মতো পবিত্র স্থান থাকতে কেনো এ-পথ দিয়ে মেরাজে যাবেন? খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস, এখানেই হবে গেট-অব-হ্যাভেন, যে পথ ধরে এই টেম্পলে প্রবেশ করবেন মাসিহ্; তার শেষ বিজয়ের নিশান উড়িয়ে।



যিশুর সমাধিস্থল ও তার মরদেহ যে টেবিলে রাখা হয়েছিলো। ছবি : সংগৃহীত


যে পাহাড়টার চূড়ার জন্য ‘টেম্পল মাউন্ট’ নাম হয়েছে সেটি খুব বড়ও নয়। উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত অনেকটা অর্ধচন্দ্রের মতো। ইহুদিরা বলে— এখানেই ইসহাককে কোরবানি দেয়ার পরীক্ষা দিয়েছিলেন নবী ইবরাহিম। মুসলমানদের মতে, সেটা ঘটেছিল মক্কায় এবং সেই পরীক্ষার পাত্র ছিলেন ইসমাইল। কোরআনেও তার বর্ণনা রয়েছে। তাহলে কি দ্বন্দ্ব এই মিথ নিয়েই? বাইবেলের বর্ণনা কি কোরআন থেকে ভিন্ন? পাহাড়টি আরও তিনটি কারণে অতিমাত্রায় পবিত্র। প্রথমত, এখানেই বাদশাহ নবী সোলায়মান (আ.) তার ধর্ম-মন্দির স্থাপন করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, এখানেই সংরক্ষিত ছিল আর্ক অব কোভেন্যান্ট এবং তৃতীয়ত, এখান থেকেই নবী মুহাম্মদ (স.) তাঁর মিরাজ শুরু করেছিলেন।

ডোম-অব-রকের আশপাশেও ছোট-বড় অনেক ক’টি ডোম। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ডোম-অব-চেইন রকের সামান্য পূর্বেই। পশ্চিম উত্তর-কোণের গা ঘেঁষে রয়েছে ডোম অব প্রফেট ও ডোম অব অ্যাসেনশন। ডোম-অব-রকের পশ্চিম দেয়ালের উত্তর কোনায়, প্রায় তিরিশ ফুট দূরেই ডোম অব প্রফেট (কুব্বাতুন নবি)। ডোমটি ছোট । আটটি খুঁটির ওপর দাঁড়ানো ডোমটির ওপরের গম্বুজ নীলচে-সবুজ টাইলস ঢাকা মসজিদে নববীর আদলে। বলা হয়, এখানেই সব নবী নবীশ্রেষ্ঠ মুহাম্মদের নেতৃত্বে নামাজ আদায় করেছেন মিরাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর। আর ডোম-অব অ্যাসেনশন উত্তর-পশ্চিম কোনায় প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে। মুসলমানদের অনেকেই বিশ্বাস করে যে, এখান থেকেই মুহাম্মদ (স.) মিরাজে যান। তবে বিশ্বাসযোগ্যসূত্র বলে— আসলে ডোম অব রক থেকেই তার উড্ডয়ন হয়েছিলো।

এর কাছেই আছে, ওয়েল অব সল কূপ। অনেকেই আজকাল প্রশ্ন করেন, এটা কি ইতিহাসের সেই সল, নাকি আত্মার ইংরেজি শব্দ সৌল? বেশির ভাগ ঐতিহাসিকেরা আত্মার মিথকেই সত্য মনে করে। এখান থেকেই ছাদে উঠে গেছে একটি ফোকর যার পাশে সিঁড়ি আছে বলে মনে হয়। জেরুসালেমের অগণিত রহস্যের মতো তাদের দাবি— এখানেও আছে খিজিরের ঘর। খিজিরও প্যালেস্টাইনি । কেননা, দুই সমুদ্রের মিলনস্থান তো সিনাইয়ের শেষ বিন্দুতে ।

এখানে আরও আছে, নবী সোলায়মান (আ.) তার ধর্ম-মন্দিরের নাম হলো হায়কল-ই সুলাইমান। জেরুসালেম নগরী ইহুদিদের কাছে পবিত্র হবার প্রধান কারণ এটি। এখানে তার বাবা কিং ডেভিড (নবী দাউদ আ.) রাজত্ব করেছেন। মনে রাখতে হবে, নবী সোলায়মান ও দাউদ (আ.) কিন্তু ইসলামেরও নবী। তাদের কারণেই এ-অঞ্চল পবিত্র ঠিক এমন ধারণা না করলেও মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের উভয়কেই অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এবং পবিত্র কুরআনেও তাদের খোদাপ্রদত্ত রাজ্য ও রাজত্ব পরিচালনা সম্পর্কিত অলৌকিক ঘটনাবলি রয়েছে।

খ্রিষ্টানরা এই শহরকে পবিত্র মান্য করে যিশু-মেরীর (নবী ঈসা আ. ও তার মাতা মারিয়াম) স্মৃতিবিজড়িত স্থান বলে। কারণ, এর পাশেই বেথেলহেম অবস্থিত যেখানে যিশুর জন্ম, মা-মেরির কবর রয়েছে। বেথলেহেম এখন যদিও উঁচু দেয়াল ঘেরা, ওয়েস্ট ব্যাংক-এর আওতাধীন। তবে চার্চ অব নেটিভিটি (Church of Nativity) নামে একটি চার্চ তৈরি করা হয়েছে এখানে। অন্য দিকে আছে নাজারেথ, যেখানে যিশু তাঁর বাণী প্রচার শুরু করেছিলেন। একটু দূরে মাউন্ট সিনাই, এই পর্বতের কথা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে ‘তুর’ শিরোনামে। মুসলমানদের বিশ্বাস, এখানেই প্রথম নবী মুসার (আ.) ওপর আসমানি প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছিলো । ইহুদিদেরও তাতে দ্বিমত নেই ।



ওয়েস্টার্ন ওয়ালের পাথরের খাঁজে গুঁজে দেন ছোট্ট কাগজে লেখা প্রার্থনা। ছবি : সংগৃহীত


যিশুর যাওয়ার রাস্তাটি ভায়াডোলোরোসা (Via Dolorosa) সযত্নে সংরক্ষিত। পথের ধারে নম্বর দেওয়া ফলকে লেখা কোথায় যিশু একটু বিশ্রামের জন্যে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, বা কোথায় তিনি হোঁচট খেয়ে পরেছিলেন বা কোথায় কেউ তাঁকে খাবার জল দিতে যাওয়ায় রোমান রক্ষীদের হাতে গঞ্জনা সয়েছিলেন। রাস্তাটি শেষ হয়েছে খ্রিস্টানদের সব থেকে শ্রেষ্ঠ পুণ্যভূমি চার্চ অফ হোলি সেপালক্‌র (Church of the Holy Sepulchre)-এ। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসমতে, এইখানেই মৃত্যুর পর যিশুর মরদেহ আনা হয়েছিল। এখানে বড়ো হলটির নীচে মাটির গভীরে একটি পাথরের টেবিলের মতো জিনিসের উপরে যিশুর দেহটি পরিষ্কার করা হয়। এবং এখানেই তার পুনর্জন্ম (Resurrection) হয়। খ্রিষ্টানরা ওই পাথর ছুঁয়ে হাপুস নয়নে কাঁদে। আসল কবরটির বা দেহর তো কোনো চিহ্ন নেই কিন্তু কবরস্থানের বিরাট পাথরের চাঁই দেখা ও ছোঁয়া যায়। গির্জাটি পরে এই কবরস্থানের উপরেই গড়ে তোলা হয়। তবে মুসলমানরা মনে করেন, নবী ঈসাকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা উঠিয়ে নিয়ে গেছেন, তার মৃত্যু হয় নি । সুতরাং তার পুনর্জন্ম হয় নি । বরং মহাপ্রলয়ের (কেয়ামত) পূর্বে তিনি দাজ্জালকে দমন করতে আবার অবাতরিত হবেন। জেরুসালেমের অনতিদূরেই জর্ডান নদী, যেখানে ডুব দিয়ে ব্যাপটিজ্‌ম করা হয়। দলে দলে পুণ্যার্থীরা আসে এই নদীতে ডুব দিতে।

তিন. এতক্ষণের আলোচনায় কী বোঝা যায়, কার শহর জেরুসালেম? কোন বিচারে আপনি কোন ধর্মের অনুসারীকে প্রাধান্য দেবেন? ফিলিস্তিনি-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুতে বিখ্যাত সাংবাদিক ইয়াসির আরাফাতকে বলেছিলেন, আপনি এখান থেকে সারা পৃথিবীতে তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘুরে বেড়াতে বলতে পারেন না। আরাফাত জবাব দিয়েছিলেন, তাহলে আপনি কি চান, আমরা ফিলিস্তিনিরা পৃথিবীজুড়ে বাস্তুহারা হয়ে ঘুরে বেড়াই? ইহুদি হোক কিংবা মুসলিম, অথবা খ্রিষ্টান, তারা যখনই এ-অঞ্চল দখল করেছেন, ধর্মীয় ইস্যু ও আবেগকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন, সন্দেহ নেই। তুলনামূলক মুসলিম শাসনামলে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিলো সত্য, কিন্তু ধর্মীয় ইস্যু সামনে থাকায় অন্য ধর্মের লোকেরা মুসলমানদের দখদারিত্বকে নিজেদের ধর্মে জন্য অপমান ভেবে আবার পুনর্দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো।

এই লড়াই-সংগ্রাম কি ‘জেরুসালেম’ নামেরই অভিশাপ? তাই আমরা অনুসন্ধান করতে চেয়েছি— জেরুসালেম শব্দের অর্থ কী? অভিধানে লেখা আছে স্বর্গরাজ্য । হিব্রু ভাষায় নাম ‘ইয়েরুশালেম’ আর ইংরেজিতে বলা হয় ‘জেরুসালেম’[3]; যার অর্থ— শান্তির পবিত্র ভুমি । আরবিতে বলে ‘আল-কুদস’। কুদস শব্দের অর্থ— মহিমান্বিত, পবিত্র, শান্তির অভয়ারণ্য। বিভিন্ন সময়ে এ নগরীকে উরুসালিম (Urusalim), সালেম ( Salem), মাউন্ট মরিয়া ( Mount Moriah), আদোনাই উরাহ ( Adonai Urah), জেবুস ( Jebus) জীয়ন (, Zion) সিটি অফ ডেভিড ( the City of David), এরিয়েল ( Ariel), আলিএয়া ক্যাপিটোলিনা (Aelia Capitolina) নামেও ডাকা হয়েছে ।

তবে এখন এই সময়ে এই শহর অজস্রবার হাত বদল হতে হতে এখন ইহুদিদের দখলে। পুরোটা নয়, কিছু অংশ জর্ডানের হাতে। সন্দেহ নেই, এ-অঞ্চলে ইহুদিরাই সবচে’ প্রাচীন প্রতিষ্ঠিত জাতি, অন্তত বাকি দুই ধর্মের তুলনায়। অর্থাৎ প্রথম অবস্থান তাদেরই। ইহুদিরা সবসময় নিজেদেরকে মজলুম মনে করে। কারণ প্রাচীন বাসিন্দা হলেও খ্রিষ্টান ক্রুসেডার বা মুসলমান অটোমানদের মতো তাদের অত সৈন্যবল ছিলো না, তাই বার বার মার খেয়ে তারা দেশত্যাগ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

খ্রিষ্টানরা ভাবে—ইহুদিদের পরে খ্রিষ্টানদের যিশু মাসীহই হলেন প্রতিশ্রুত খোদার পুত্র। তিনিই মানুষকে পবিত্র করতে এসেছেন এবং সব খ্রিষ্টধর্মানুসারীর পাপ নিজের কাঁধে নিয়ে গেছেন। তাই খ্রিষ্টধর্মেই রয়েছে মুক্তি ও ইহুদি ধর্ম বিকৃত। সুতরাং পবিত্র স্থান, যেখানে যিশু জন্ম নিয়েছেন ও দেহাবসান ঘটিয়েছেন, মানুষের কল্যাণের জন্যেই তা তাদের অধিকারে থাকা উচিত ।

আর মুসলমানরা মনে করে— নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও জেরুসালেম ও আল আকসার প্রকৃত উত্তরাধিকারী মুসলিমরা। কেননা, ইহুদিরা যাদের অনুসারী বলে দাবি করে সেই কিং ডেভিড দাউদ ও সলোমানের আনীত ধর্মের ওপর তারা ছিলো না, বরং তারা ইসলামের সম্মানিত নবী ছিলেন। নবী মুসার (আ.) মাধ্যমে ইহুদিদের ওপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাব তাওরাত তুর পাহাড়ে অবতীর্ণ হলেও ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তার পক্ষে ফিলিস্তিনে বসবাস সম্ভব হয় নি। এমনকি বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টেও (তাওরাত) তারা বিকৃতি ঘটিয়েছে । তাই জেরুসালেম, তাওরাত বা ইহুদিদের ভূমি সংক্রান্ত ইসরায়েলি দাবি অর্থহীন। বরং মুহাম্মাদ (স.) জেরুসালেম তথা বাইতুল মাকদিস থেকে মিরাজে যাওয়ার কারণে এবং পূর্ববর্তী অসংখ্য নবী রাসুলের ইবাদাতের কেন্দ্র হওয়ার কারণে তা ইসলামেরই পবিত্র স্থান ও পুণ্যভূমি। একটি বিষয় লক্ষণীয় যে খ্রিষ্টানরাও মাসীহের জন্য অপেক্ষা করছে, তিনি মুসলিমদের মাসীহ ঈসা (আ.); যিনি খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন দাজ্জালকে দমন করার জন্য, কেননা, তখন দাজ্জালকে স্বাগত জানাবে ইহুদি-খ্রিষ্টানরা। এই যুদ্ধ ইসলামে ‘মালহামা’ তথা ভয়ঙ্কর যুদ্ধ নামে পরিচিত এবং খ্রিষ্টানদের কাছে ‘আরমাগেড্ডন’ নামে পরিচিত। মুসলমানরা আরও বিশ্বাস করেন— ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা যতই শক্তির প্রদর্শন করুক না কেনো, তাদের পরাজয় অতি নিকটে। মুহাম্মাদ (স.) তার উম্মাতকে শেষ জামানায় সারা দুনিয়ায় বিজয়ের ওয়াদা দিয়েছেন, যা ইমাম মাহদির খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে ।[4] ইসরাইল এখন যৌবনে উপনিত হয়েছে, স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে।



ঠিক এখানেই যিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। ছবি : সংগৃহীত


এ-পর্যায়ে আমরা বলিউডের বিখ্যাত মুভি ‘পিকে’র দিকে আরেকবার চোখ ফেরাতে চাই । মুভির শেষ মুহূর্তগুলিতে একজন হিন্দু পুরোহিতের সঙ্গে বিতর্কের এক পর্যায়ে পিকে দুটি কথা বলেছিলেন— এক. আপনার এই মন্দির ভজনালয় কেনো, ইশ্বরকে রক্ষা করার জন্য? আপনি ঈশ্বরকে রক্ষা করবেন নাকি ঈশ্বর আপনাকে? দুই. এক ঈশ্বর আছেন, যিনি আমাদের বানিয়েছেন, আরেক ঈশ্বর আছে যাকে আমরা আমাদের মনমতো গড়ে নিয়েছি। যে ঈশ্বর আমাদের বানিয়েছেন, তার আদেশ এখন আর আমরা মানি না, বরং আমরা নিজেরা মনমতো যাকে গড়ে নিয়েছি, তার কথা মানছি। জেরুসালেম কার সেই প্রশ্নের বিচারের আগে, আমাদের বিচার করা উচিত, জেরুসালেম সম্পর্কে কোনো ধর্মে এমন কোনো নির্দেশনা কি আছে যে, জুলুম-পীড়ন যা-ই হোক, মসজিদ-মন্দির ছারখার করে হলেও জেরুসালেমের মালিকানা অবশ্যই তাদের দখলে থাকতে হবে? যদি না থাকে এবং তিনটি ধর্মই যদি পবিত্র স্থানকে ঈশ্বরের বলে বিশ্বাস করেন, তাহলে তারা ঈশ্বরের বন্দেগিকেই প্রাধান্য দেবেন, তার মালিকানায় নাক গলানো নয় ।

সবিশেষ—থিওরিস্ট বিশেষজ্ঞ তথা চলচ্চিত্র প্রযোজক ইউভাল ওভাডিয়ার দাবি, আগামী ২০ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে পৃথিবীর ওপর দিয়ে যাবে নিবিরু বা এক্স গ্রহ। তার আকর্ষণে দুই মেরু সহ পৃথিবীর নানান প্রান্তে হবে ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, সুনামি, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়। একথা লেখা আছে বাইবেলের গ্রেট সাইন অফ রিভিলেশন ১২ এবং গিজার পিরামিডে। সেখানে আরও উল্লেখ আছে, সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে আশ্রয় নিতে হবে ইসরায়েলের রাজধানী জেরুসালেমে। কারণ, একমাত্র জেরুসালেমই পৃথিবীর মধ্যভাগে অবস্থিত। তাই ধ্বংসের প্রভাব পড়বে না সেখানে। যদিও নাসা এই সব দাবিকে নস্যাৎ করে ফের সাফ জানিয়েছে, নিবিরু বলে কোনও গ্রহ বা নক্ষত্রমণ্ডল নেই। পুরোটাই কন্সপিরেসি থিওরিস্টদের কল্পনা। তাই ভয়ের কোনও কারণ নেই। কিন্তু ট্রাম্পের ঘোষণা এবং সারা বিশ্বের উদ্বেগ বলে দেয়, আরেকটি ধ্বংস সম্ভবত জেরুসালেমের জন্য ঘনিয়ে এসেছে ।


তথ্যসূত্র


[1] Do We Divide the Holiest Holy City? Moment Magazine। সংগৃহীত ৫ মার্চ ২০০৮, লিংক : www.momentmag.com/Exclusive/2008/2008-03/200803-Jerusalem.html

[2] সূরা ইসরা, আয়াত ১

[3] উচ্চারণ বিভ্রাটের কারণে অনেকেই ‘জেরুজালেম’ বলে থাকেন । ইংরেজি এস (S) বর্ণের কারণে এই বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছে । আমেরিকান উচ্চারণে ‘মুসলিম’ শব্দকেও তা-ই ‘মোজলেম’ বলতে শোনা যায় ।

[4] সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৯৬; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ৪০৮৮


 

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ