এরদোগান— অ্যা গ্রেট সুলতান

অথর- টপিক- /লিড স্টোরি/হাইলাইটস

দ্য গ্রেট সুলতান— ০১


কবি এবং ফেরিওয়ালা—এ-দুটির মধ্যে সাজুয্য খুঁজে পাওয়া এবং খুঁজতে যাওয়া অসম্ভব এবং সে-ক্ষেত্রে ব্যক্তি যখন হবেন একজন রাজনীতিক, তখন আপনি বিস্মিত হবেন। হতে চাইবেন। ভেবেও বসবেন, আসলে তিনি কবি নন। তিনি রাজনীতিকই বটেন। হয়তো রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে কিংবা কাউকে ডিকটেশান দিয়ে লিখিয়ে দুয়েকবার কাব্য করেছেন। আমরা আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, অন্তত এরদোগানের বিষয়ে আপনার ভাবনা অমূলক।

এরদোগান শুধু কবি নন, তিনি কবিতার জন্য জেলে খেটেছেন এমন এক সময়ে, যখন তিনি দেশের ক্ষমতাধর একজন। এমনকি তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির তখন জয়জয়কার। ২০০২ সালের নভেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিজয়ী হয়েও এরদোগান প্রধানমন্ত্রী হতে পারছেন না। কারণ, ইস্তাম্বুলের মেয়র থাকা অবস্থায় একটা কবিতা পাঠের অপরাধে তিনি শাস্তি ভোগ করছিলেন। শাস্তির মেয়াদ তখনও পূর্ণ হয় নি।

যদিও ২০০৩ সালের ১৪ মার্চ অবশেষে নানা আইনি জটিলতা পেরিয়ে তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ-জন্য প্রথমে তার দলের সিনিয়র সদস্য এবং পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ গুলকে তার আসন থেকে পদত্যাগ করে সে-আসনে উপনির্বাচনে নিবাচিত হয়ে পার্লামেন্টে আসতে হয়েছে।

আমরা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে, যে-কবিতাটি এরদোগান পাঠ করেছেন, তার রচয়িতা তিনি ছিলেন না। তবে তিনি সেনাবহিনীকে ‘দোয়া’ করার অসিলায় তুর্কি জাতীয়তাবাদী কবি জিয়া গোকাল্পের কবিতাটি পাঠ করেছিলেন দক্ষিণ তুরস্কের জনসভায়। সেদিন ছিলো ১৯৯৭ সালের ১২ ডিসেম্বর। Mosques are our barracks. domes our helmets, minarets our bayonets, believers our soldiers—এই হলো কবিতা। যার তর্জমা করলে দাঁড়ায়— মিনার আমাদের বেয়োনেট, গম্বুজ হেলমেট, মসজিদ আমাদের ব্যারাক, মুমিনরা আমাদের সৈন্য। কবিতার শেষে আবার ‘আল্লাহু আকবার’ শব্দগুচ্ছও আছে। সুতরাং খুবই মুসলমানি কবিতা। এই মুসলমানি ছুৎমার্গ থেকে পবিত্র করার জন্য তুরস্কের সেক্যুলার সরকার তাকে প্রায় অর্ধযুগ কারাপ্রকোষ্ঠো আটকে রাখে ।

মনে রাখা দরকার, শুধু মুসলমান নয়, যদিও সে-দেশের আকছার মুসলমান, তবে ধর্মই তুরস্কের ক্ষমতাসীন মানুষের সবচে’ বড় ভীতি ছিল। নাকি এখনও আছে? কেননা, এরদোগানের দল একেপিকে তুরস্কের সেক্যুলার দল বলেই সে-দেশে গণ্য করা হয়। এবং এরদোগানকে তুরস্কের জাতির পিতা (আতুতুর্ক) মোস্তফা কামাল পাশার উত্তসূরিও ভাবা হয়; যিনি ছিলেন আধুনিক তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি। ১৯২২ সালে অটোম্যান সম্রাজ্যের পতন করে ১৯২৩ সালে সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। সেক্যুলারিজমকে সে-দেশে কামালিজমও বলা হয়। আতুতুর্ক ঘোষণা দিয়েছিলেন— ধর্ম বলতে কিছুই নেই, ধর্ম হলো মানুষকে শাসন করার একটা পদ্ধতি মাত্র। কোনো জাতির উন্নতির জন্য ধর্মমুক্ত হওয়া ছাড়া কোন পথ নেই । তাই আজ থেকে আমার রাষ্ট্রকে ধর্ম মুক্ত হিসাবে ঘোষণা করলাম।১৯৩৮ সালে কামাল পাশার মৃত্যুর পর সত্তর বছর পর্যন্ত এই ধারা বলবৎ ছিলো বৈকি। এই সময়ে দশজন রাষ্ট্রপতি তার নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। কিন্তু কামালের বোধকরি জানা ছিল না, ধর্মীয় অনুভূতি হলো আত্মার উপলব্ধি। সত্তর বছরে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এবং প্যান ইসলামিজমের প্রবক্তা নাজমুদ্দিন আরবাকানের সরকারকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার পরও সেক্যুলারিজমের ‘নয়া পাঠ’ নিয়ে হাজির হতে পেরেছেন এরদোগান। তিনি ঘোষণা করেন—ধর্ম পালনে তিনি কাউকে বাধ্য যেমন করবেন না, তেমনি ধর্মপালনে কেউ যেন বাধা না দিতে পারে সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। এই ঘোষণার পরে এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা দিলেন— একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান। রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন।

তাহলে এরদোগান কি সেক্যুলার নাকি সেক্যুলার না? তিনি কিন্তু ১৯৭২ সালে এই সেক্যুলার বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমে নেতৃত্বে আসেন। তখন তিনি ‘মারমারা’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়েন। মেধাবী ছাত্র হিসেবেও খ্যাতি ছিলো তার। ১৯৫৪ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারিকে তার জন্মসাল মেনে নিলে বয়সও তখন মাত্র ১৮। ইস্তাম্বুলেরই মানুষ তিনি, জন্মও এখানে । তবে শৈশব কেটেছে কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে। তের বছর বয়সে আবার ফিরে আসেন ইস্তাম্বুল। দরিদ্র পরিবারে তুর্কি কোস্টগার্ডের চাকুরে বাবাই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। ছেলেবেলা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই বটে, কিন্তু পরিবারের কথা বলতে গিয়ে নস্টালজিক হতেন না, তা হলফ করে বলা যায় না। সামবেশে কিংবা সংবাদ মাধ্যমের সামনে বহুবার তিনি নিজের গল্প শুনিয়েছেন— বাবাকে সাহায্য করার জন্য আমার সামনে তখন তরমুজ বিক্রি করা ছাড়া কোনও পথ ছিলো না। এ-দিয়ে আমার প্রাথমিক শিক্ষার খরচও জোগাতাম ।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনে তিনি ‘ইমাম খতীব’ নামক মাদরাসাকেই বেছে নিয়েছিলেন। এ-বয়সেই বইপড়া তার অস্তিত্বে পাগলামির মতো জেঁকে বসে। বই কেনার জন্য বাড়তি রোজাগার করতে তিনি কখনও তুরস্কের রাস্তায় লেবু বিক্রিও করেছেন। তুরস্কের একটি পত্রিকা তার ‘রচনা ও পাঠ’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন— ‘আমার মা (আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন) আমাদের বড় করে তুলেছেন আনাতোলিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে শুনিয়ে। মরহুম পিতার কাছে শুনেছি আনাতোলিয়ার অসংখ্য সুন্দর গল্প ও রূপকথা । মনে আছে, ছোটবেলায় আমি তিলের খাজা বিক্রি করতাম। বিক্রিশেষে যা আয় হতো তা নিয়ে ছুটে যেতাম বাইয়ের দোকানে। ছোটবেলায় আমি এতো ভালো গল্প ও কবিতা পড়েছি যে, তার একটিকে ‘প্রিয়’ হিসেবে বেছে নিতে বললে আমি পারব না। তারপরও বরেণ্য চিন্তাবিদ নেসিপ ফাজিল কিসাকুরেক এবং তার ‘সাকারিয়া’ কবিতাকে আমি শীর্ষে রাখবো ।’

মেহমেত আকিফ এরোজির ‘সাফাহতে’ বইটির কথাও তিনি অন্য এক আলোচনায় বলেছেন। বলেছেন— ‘আমাদের জাতীয় সঙ্গীত যেমন এ-জাতির পরিচয় জ্ঞাপকরূপে কাজ করে, ‘সাফাহাত’ বইটিও তেমন । এতে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের চেতনাই অনুরণিত হয়। নিঃসন্দেহে পবিত্র কুরআন থেকে শুরু করে সব ধর্মগ্রন্থের চিরায়ত গুরুত্ব রয়েছে। এর বাইরে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব মূল্যবান সাহিত্যকর্মও রয়েছে। মাওলানা রুমী ও ইউনূস এমরের আমাদের এখানে, আনাতোলিয়ায় বসে লিখেছেন। কিন্তু তাদের সৃষ্টি সব সীমান্ত অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।’

তারপর ইউসুফ হাস হাচিপ, আহমেত ইয়েসেবি, ফুজুলি, নেদিম, হাবি বেকতাস, কেমাল তাহির, ইয়াহিয়া কেমার, কেমিল মেরিক, ও গুজ আতাই, নুরেত্তিন তপকু, ওরহান পামুক এবং এ রকম আরো অনেক মহৎ সাহিত্যিকদের নাম ধরে গৌরব প্রকাশ করেন এরদোগান। প্রতিদিন ডায়রিতে আপন অভিজ্ঞতা লিখে রাখেন সযত্নে, যখনই একটুখানি সময় পান। হয়তো ভবিষ্যতে এটাকে স্মৃতিকথায় রূপ দেবন— এই আশায় ।

তবে তিনি ভুলে যান না যে, তিনি একজন রাজনীতিক। একটি কবিতা পড়ার ‘অপরাধে’ তাকে জেল খাটতে হয়েছে। অথচ কবিতাটি সরকারি স্কুলের বইতে পাঠ্য ছিল। আর রাজনীতির গুণেই তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট । তাই বাকস্বাধীনতার অর্থও প্রয়োজন খুব ভালোভাবে বোঝেন। বহুবার বহুস্থানে তিনি কবি এ টি আয়হানের একটি পঙক্তি বলে বেড়িয়েছেন— ‘আমরা হয়েছি বড় নিষেধের বেড়াজাল ভেঙে-ভেঙে।’ ২০১৪ সালের অগাস্টে সিএনএনের সাংবাদিক যখন তাকে বলেন—  প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। আপনি প্রচারকাজে ব্যস্ত…। তিনি তাকে জবাব দেন— হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি রাজনীতিতে জন্মেছি। রাজনীতিতে ক্লান্ত হই না। আপনি কি সাংবাদিকতায় ক্লান্ত ? আমাদের জীবনে সবসময়ই রাজনীতি থাকবে। আর এই মুহূর্তে, সত্যিই বলছি, আমি রাজনীতিতে ফলপ্রসূ অবস্থায় রয়েছি। ক্যালেন্ডারের একটি পাতা বাকি থাকা পর্যন্ত আমি আমার দেশ ও মাতৃভূমিকে সেবা করে যাবো।

বড় আশ্চর্য মানুষ এই এরদোগান। একহারা লম্বা বলিষ্ঠ গঠনের এই মানুষটাকে কাছে দেখলে মনে হয়, কঠিন পাষাণের মতো। মুখের আদলে মমতার লেশমাত্র নেই। তবে তিনি যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে তখন তার আন্তরিকতাকে একটুও বাহুল্য মনে হয় না। মনে হয়, মহামানব। মনে হয়, সব সময় তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। মনে হয়, এখনই তিনি বলবেন—‘আমি খুব ব্যস্ত, পরে কখনও দেখা হবে’ এবং বলেই গটগট করে বেরিয়ে যাবেন। তবে তাকে সবচে’ বেশি সচেতন ও চালাক মনে হয়, তিনি যখন পশ্চিমাদের সঙ্গে কথা বলেন। পুতিন হোক কিংবা অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, সবাইকেই তার দৈহিক গঠনের কারণে একটু খাটোই মনে হয়।

সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক কালের খেয়ায় লিখেছিলেন— মনে-প্রাণে তিনি ছিলেন একজন কবি। উদার, বন্ধুপ্রাণ। ফলে সব কবির যেসব হটকারিতা থাকে, তাঁরও সেসব ছিলো। কিছু মাত্র কম ছিলো না। আর আমারও ধৈর্য ছিল না। মনে হয়, একই কথা এরদোগানের বেলায় খাটে। সমালোচকরা বলছেন, অনেক আগেই তিনি গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে এসেছেন। ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে ১১৫০ রুমবিশিষ্ট বিলাসবহুল প্রেসিডেন্ট প্যালেস বানানো তার কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতালিপ্সার দৃষ্টান্ত। তুর্কিদের একাংশ এরদোগানকে ‘বুয়ুক উস্তা’ বা ‘বড় মাস্টার’ বলে থাকেন। তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন সুলতান হিসেবে। কেউ কেউ বলে থাকেন, ‘এরদোগান দ্য লাস্ট ডিক্টেটর।

আবার মুসলিম বিশ্বে এরদোগানই একমাত্র নেতা যিনি সর্বপ্রথম তুরস্কের জাতীয় সংসদে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজকে ভাষণ দেয়ার সুযোগ করে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। এরদোগানকে ক্ষমতায় পেয়ে ইসরায়েল ২০০৪ সালে তাকে Jewish World congress এর পক্ষ থেকে Profile of courage পুরস্কার প্রদান করে। ২০০৫ সালে তিনি বিশাল বাণিজ্য প্রতিনিধিদল নিয়ে দু’দিনব্যাপী ইসরায়েল সফর করেন। আবার ২০০৬ সালের ২২ ডিসেম্বর তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় এরদোগানের সঙ্গে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট সাক্ষাৎ করেন। এর পাঁচ দিন পর ইসরায়েল গাজায় আগ্রাসন চালায়। আবার ২০১৪ সালে এসে তিনি ইসরায়েলের আগ্রাসনকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেও বিবৃতি দিয়েছেন।

একদিকে তিনি মুসলিম বিশ্বের বিরাট জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলামপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত আবার পশ্চিমাদের কাছে মডারেট নেতা হিসেবে বড়ই ‘কাছের ব্যক্তি’। তার বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগও অসংখ্য— বিরোধীদের প্রতি দমননীতি, কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা, মিডিয়ার স্বাধীনতা হরণ, পার্লামেন্টারি পদ্ধতি থেকে প্রেসিডেনশিয়েল পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া, একটি সেকুলার রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে ইসলামাইজেশনের পথে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি অভিযোগ ঘুরে-ফিরে বার বার বিভিন্ন মিডিয়ায় আলোচিত হয়ে আসছে ।

যে-যাই বলুক, তোর দেশের মানুষ যে তাকে ভালোবাসে, সন্দেহ নেই। না হলে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক একবছর আগে একটা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হলো। প্রতিষ্ঠার পরের বছর নির্বাচনে গিয়েই বাজিমাত। বিজয়ী হয়ে এককভাবে সরকার গঠন করল তারা। তারপর একে একে চারটি নির্বাচন গেলো। কোনো নির্বাচনেই কেউ তাদেরকে বিরোধীদলের সারিতে পাঠাতে পারে নি। ২০০১ সালে হিসেব ধরলে দল প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরের মধ্যে ১৫ বছরই তারা ক্ষমতায়। তা-ও সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে । ভাবা যায়?

একই সাথে দুদিক সামলানো কিভাবে সম্ভব হলো? এর প্রথম কারণ হলো, তিনি ধীরে ধীরে হিজাবের প্রতি নিষেধাজ্ঞা সুকৌশলে তুলে দিতে পেরেছেন। ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুদান ও সুযোগ সুবিধা বাড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টগুলোকে এতিম অবস্থা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাকাল্টিতে পরিণত করেছেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে উন্নত সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। একই সাথে একে পার্টিকে একটি সেক্যুলার দল বলে আখ্যা দিয়েছেন। তুরস্কের স্বাধীনতা রক্ষায় কামাল পাশার অবদানকে তারা স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তুর্কি জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন। বলেছেন— সেকুলারিজম প্রত্যাখ্যান করে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণার কোন অঙ্গীকার তার নেই।

এর কারণেই গত ১৫ জুলাইয়ের রাতে সেনাবাহিনীর একটি অংশের এই অপচেষ্টাকে শক্তভাবে রুখে দিয়েছে দেশটির সরকার ও জনতা। ৯৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ক্যু সফল করতে পারেনি সেনাবাহিনী। সন্দেহ নেই, এতোদিনের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী সেনাবাহিনীল স্বেচ্ছাচারিতার কারণেও মানুষ ক্ষুদ্ধ ছিল। এরদোগান নিজের প্রতি জনগণের ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে সেই সুযোগ ব্যবহার করেছেন ষোলআনা। সে-হিসেবে তাকে ‘নব্য-অটোমান সুলতান’ যারা বলেন, তাদের কথাটাই ঠিক ধরা যায়। কেননা, অটোমানদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে যেমন বাড়াবাড়ি ছিল না, তেমনি ধর্মবিরোধিতাকেও তারা প্রশ্রয় দিতেন না ।

এরদোগান তুরস্কের ১৮তম প্রেসিডেন্ট। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি পেশাদার ফুটবলার চিলেন এবং একটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে চাকরিও করেন। ১৯৮৫ সালে রাফাহ পার্টির ইস্তাম্বুল প্রদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ইস্তাম্বুল প্রদেশ থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ তুরস্কের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র এবং গ্রেটার মেট্রো ইস্তাম্বুল মেট্রোপলিটন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

তার পুরো নাম— রজব তাইয়েব এরদোগান। তবে উচ্চারণ বিভ্রাটের কারণে এবং তুর্কি উচ্চারণের ভিন্নতায় তাকে কোথাও রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান, রেসেপ বা রেসিপ তায়্যিপ এরদোগান, রেজেপ/রেচেপ তাইপে এরদোহান এবং রজব তৈয়ব এরদোগান বলা হয়। তুর্কি উচ্চারণ— ɾeˈd͡ʒep tajˈjip ˈæɾdo.an।

আমরা প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সুন্দর জীবন কামনা করি।

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

গো টু টপ