আনিসুল হক— একজন আলোকিত নগরপিতা

অথর- টপিক- /লিড স্টোরি/সুলতান স্টোরি

জীবনের সাফল্যের নেপথ্যে তার মায়ের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, জীবনে সাফল্য অর্জনের পথে প্রত্যেকটা মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটা কি জানো? সেটা হচ্ছে মায়ের দোয়া।


এই তো মাত্র কয়টা দিন আগের কথা। হঠাৎ-ই খবর এলো তিনি আর নেই। তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে মহান রবের ডাকে সাড়া দিনে চলে গেছেন। তিনি আর কখনো আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। আমাদের এই ঢাকাকে একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে সারাক্ষণই তিনি কত চেষ্টাই না করেছেন। আমাদের এই শহরের যেকোন সংকটে রাত নেই, দিন নেই ছুটে গিয়েছেন। এতো ছোটাছুটি করতেন। কিন্তু  এই ছোটাছুটি বাবদ তিনি কখনও সরকারি অর্থ ব্যয় করতেন না। এমনকি নিজের প্রাপ্ত বেতনও দিয়ে দিতেন কর্মচারীদের।

বলছি সদ্যপ্রয়াত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের কথা। তিনি শুধু মেয়রই ছিলেন না, ছিলেন নগরের অভিভাবক, নগরপিতা। একজন মেয়র হয়েও তিনি যেন ছিলেন সকলের স্বজন, একান্ত প্রিয়জন। পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, স্বপ্নের পথ ধরে এগিয়েও চলছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ-ই যেন সবকিছু থমকে গেলো! তিনি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন।

একজন আনিসুল হক : তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং টেলিভিশন উপস্থাপক। তিনি বিজিএমই-এর সভাপতি ছিলেন, পরে এফবিসিসিআইর সভাপতি হন। পরবর্তীতে সার্ক চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার শৈশবের বেশ কিছু সময় কাটে তার নানাবাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। সেখানেই তার প্রথমিক লেখাপড়। এর পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন এবং সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।

একজন মায়ের দোয়া এবং আনিসুল হক : আনিসুল হকে জীবনের সাফল্যের নেপথ্যে তার মায়ের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, জীবনে সাফল্য অর্জনের পথে প্রত্যেকটা মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটা কি জানো? সেটা হচ্ছে মায়ের দোয়া। সেই মা আমার মা, সেই মা তোমার মা, সেই মা সবার মা; সব মায়ের এক চেহারা। আমার মায়ের গল্পটা বলি। আমার মা খুব একটা শিক্ষিত ছিলেন না। আমার কিছু হলেই আমি মায়ের কাছে গিয়ে বলতাম, “আমার গায়ের ওপর একটা পা রাখো তো, আর আমাকে একটা ফুঁ দাও!” আমার জীবন এখনও ফুঁ’য়ের ওপর চলছে। আমি যখন মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি, একটা পরীক্ষার আগে আমার খুব জ্বর, একশো চার ডিগ্রী হবে। সকালবেলা উঠে আমি বললাম, মা, আমি তো পরীক্ষা দিতে পারবো না। মা বললেন, এটা কি হয় নাকি রে বাবা, পরীক্ষা না দিলে তুমি এক বছর পিছিয়ে যাবে না? আমি বললাম, আমার তো কোন উপায় নেই, আমি চোখে কিছু দেখছি না। উনি অনেক দোয়াটোয়া পড়ে আমাকে ফুঁ দিলেন, আমার হাত ধরে বললেন, চলো যাই। তিন ঘন্টার পরীক্ষা দুই ঘন্টা লিখে বেরিয়ে এলাম, বাইরে চিন্তত মুখে মা বসে আছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সবকিছু ঠিকঠাক লিখেছো? আমি বললাম, না মা, চৌত্রিশের উত্তর করে এসেছি। মা বললেন, পাশ কতোতে? আমি বললাম, তেত্রিশ। তোমার ফুঁ’তে আর কাজ হবে না মা। উনি বললেন, কাজ না হোক, এবার নামাজ পড়ে একটা ফুঁ দেই। মা সেখানে নামাজ পড়লেন দুই রাকাত, তারপর ফুঁ দিলেন সারা গায়ে। হয়তো এটা একটা কাকতালীয় ব্যপার হতেই পারে, কিন্ত পরীক্ষায় আমি চৌত্রিশে চৌত্রিশই পেয়েছিলাম!

এখনও কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে আমি মায়ের কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। মেয়র নির্বাচন করার প্রস্তাব যখন আমাকে দেয়া হলো, আমি খুবই বিপদে পড়ে গেলাম। এত কঠিণ একটা কাজ আমাকে দিয়ে হবে কিনা, এসব নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার বাবার বয়স পঁচানব্বই, বাবাকে গিয়ে বললাম, বাবা, কি করবো? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চান যে আমি মেয়র হই। বাবা বললেন, “তোমার মায়ের কাছে যাও। মায়ের কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়াও, নিজেই বুঝতে পারবে কোনটা করা উচিত।” এটা একটা শক্তি, অন্যরকম একটা শক্তি। মানুষকে সাহসী করে তোলে।

কর্মজীবনের সূচনা যেভাবে : ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ‘আনন্দমেলা’ ও ‘অন্তরালে’ নামের দুইটি ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠান তার উপস্থাপনায় বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পূর্বে বিটিভিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুখোমুখি একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনও করেছিলেন।

শুরু হলো ব্যবসায়ীক জীবন : বাংলাদেশের রপ্তানিকারক উল্লেখযোগ্য একটি শিল্প খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প খাত। আশির দশকেই আনিসুল হক বাংলাদেশের এই তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি “মোহাম্মদী গ্রুপ” নামে ১৯৮৬ সালে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রুপটির তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন, কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা আছে। ২০০৭ অনুসারে, বস্ত্র ও পোশাক খাতে গ্রুপটি প্রায় ৭০০০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করে। ২০০৫ থেকে ২০০৬ সাল এই সময়ে বিজিএমই-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আনিসুল হক এবং ২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ।নাটকেও অভিনয় করেছিলেন তিনি : টেলিভিশন মাধ্যমের সঙ্গে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (উত্তর)-এর সদ্য প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের যে গভীর সম্পর্ক ছিল সে কথা সবারই জানা। ব্যতিক্রম ধারার বেশ কিছু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। তবে তার আরেকটি পরিচয় সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানেন না। আর তা হচ্ছে তিনি একটি নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। খ্যাতিমান নির্মাতা নওয়াজিশ আলী খান নির্মিত এ নাটকটির নাম ‘সালামত দাতাং’। বিটিভিতে প্রচার হওয়া এ নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আনিসুল হক।

এক খন্ড রাজনৈতিক জীবন : আনিসুল হক বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। তিনি ২০১৫ সালের ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। এবং বিজয়ী হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মেয়র পদে বহাল ছিলেন।একটি পরিবারের একজন অভিভাবক : আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে নাভিদুল হক বোস্টনের বেন্টলি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবস্থাপনায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন বর্তমানে মোহাম্মদি গ্রুপের পরিচালক ও দেশ এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে কাজ করছেন।

চিরসত্য মৃত্যুর কোলে : গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ “সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস” শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়। কিন্তু রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হয়। এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ১০.২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২ ডিসেম্বর ২০১৭ আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজার পর তাকে বনানী কবরস্থানে ছোট ছেলে শারাফ ও মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

আগাগোড়া মাদরাসায় পড়ুয়া একজন মানুষ আমি। লেখালেখি এবং সাংবাদিকতার উচ্চ আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখি। সকাল, দুপুর এবং রাত গড়িয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসি লেখালেখিতেই। অন্যতম শখ ইংরেজিতে ভালো কিছু করা। এর প্রস্তুতিস্বরুপ ইংরেজি পড়াতে ব্যয় করছি আমার উল্লেখযোগ্য একটি সময়। দ্য সুলতানের সাথে লিখছি অতিথি লেখক হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ