ফিলিস্তিনি গল্প— পোস্টারে সেঁটে থাকা সেই মেয়েটি

অথর- টপিক- লিটারেচার/লিড স্টোরি

মূল— দিমা শাইবানি। ভাষান্তর— মনযূরুল হক


ক্ল্যারিফিকেশন— এ গল্পটি একজন আরব নারীর জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত। এই মহিয়সী নারীর নাম ‘হানা শাইবানি’। ফিলিস্তিন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ প্রথম ইরাকি যোদ্ধা।

হানা শাইবানি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ২৭ আগস্ট। ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাথ পার্টির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে পার্টির মহিলা সদস্যাদের নেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালের দিকে দুর্নীতির ঘটনার প্রতিবাদে তিনি বাথ পার্টি ত্যাগ করেন এবং ইয়াসির আরাফাতসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৭ মার্চ ১৯৭০ সালে তিনি আন্দোলনরত অবস্থায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।


সবাই বলে আমি নাকি আজন্মই খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। আমার নিজের কাছেও তা-ই মনে হয়। গল্প শুনতে সব সময়ই বিশেষ ভালো লাগে আমার। ভালো লাগে শোনাতেও। কিন্তু ভূত-প্রেতের অহেতুক কিসসায় আমার বিরক্তি ভীষণ। শিশুরা কেউ যদি আমার কাছে গল্প শুনতে আসে, তাহলে আমি তাদের সেই সব কাহিনী গল্পের মতো করে সাজিয়ে বলি, যা তাদের মন-মগজকে শুধরে সুস্থ চিন্তার পথ তৈরি করে দেয়।

বহু মনমাতানো গল্পকথা মুখস্ত ছিলো আমার। হয়তো ছেলেবেলায় শুনেছি, অথবা শিশুতোষ বইগুলোতে পড়েছি। কিন্তু এক্ষণে বয়সকালের সব সূত্রাদি ছিঁড়েফুঁড়ে উপর্যুপরি নাবছিলাম একটি স্বপ্ন জাগানিয়া সুরের সন্ধানে। কাউকে শোনাতে নয়, নিজেই স্মরণ করতে চাইছিলাম যে, কী ঘটেছিলো তখন।

আমার চিরদিনের অভ্যাস, ছোট ছোট বিষয় থেকে গল্পের সূত্র খুঁজে বের করা। যেমন, বাড়িতে ভিক্ষুক এসেছে। আমি ভাবতাম, কেনো সে ভিক্ষা করছে। হয়তো তাকেই সেটা জিজ্ঞেস করতাম। অথবা তার পিছু লেগে থাকতাম, তার জীবনের গল্পটা উদ্ধার করার জন্যে। কিংবা হয়তো দেখা যেতো, রাস্তায় একটা চশমা পড়ে আছে। সেই চশমাটা কার হতে পারে, কী করে ফেলে গেলো, এ নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিলো না আমার। সংবাদপত্রের বিজ্ঞপ্তি, বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা উপহার বাক্য, বাড়ির পাশের মরে যাওয়া যাইতুন গাছটার রোপনকর্তা, অথবা পুরোনো সুটকেসে নেকড়ার মতো ময়লা হয়ে থাকা এক খ- কাপড়রই হতে পারতো আমার গল্পের উৎস সন্ধানের বিষয়। বাড়ির মানুষ, পড়শি, স্বজন, পথের অপরিচিত যেই হোক কারো কাছে কোনো গল্প বা ঘটনা জানতে চাইতে আমার কোনো সংকোচ ছিলো না কখনোই। ফলে অল্প বয়সেই নানান গল্পের একটা ভা-ার জমা হয়ে গেছে আমার স্মৃতিতে।

গল্পের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণেই কখনো কখনো একটা গল্পের সঙ্গে আরেকটা গল্পের সূত্র জোড়া লেগে গিয়ে মাঝমধ্যে এমন কিম্ভূত পরিস্থিতিরও উদয় হতো যে, আমি রীতিমতো লজ্জায় পড়ে যেতাম। অনক সময় রাশি রাশি গল্পের স্তূপের তলে চাপা পড়ে থাকা কোনো একটা গল্প মগজ নাড়া দিয়ে যেতো। কিন্তু মাথা থেকে মুখে আনতে গিয়েই লাগতো গোলমাল। অর্থাৎ মাথায় আছে, কিন্তু মনে আসছে না। অথবা মনেও আসছে কিন্তু ধরে রাখতে পারছি না বেশিক্ষণ।

আজো মনে হচ্ছে, তেমন কিছু একটা ঘটেছে। আমি মনে করতে চাইছি। অথচ মনে আসছে না। আবার একটু একটু করে মনে আসছে। কিন্তু মুখে আসছে না। বাসার সামনের দেয়ালে নানুর লাগানো পোস্টারটা দেখে পুরোনো একটা গল্প চাগিয়ে উঠতে চাইছে। বারংবার চোখের পাতায় ভেসে উঠছে তেমনই একটা মলিন পোস্টার। দেয়ালে সাঁটা বিবর্ণ একটা ছবি। তাতে কিছু হরফ, লাল কালিতে লেখা কতগুলো অক্ষর জ¦ল জ¦ল করছে যেনো।

আমি মনে হয় নানুর সাথে কোনো শপিং মলে গিয়েছিলাম সেদিন। কী কী কিনেছিলাম মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে যে, আমাদের কারো হাতে কোনো শপিং ব্যাগ ছিলো না। হয়তো কিছুই কিনি নি। নানুর সাথে ঘুরতে বেড়ানোই উদ্দেশ্য ছিলো শুধু। মনে পড়ছে, নানু আমার হাত ধরে আছেন, আর আমরা এক পা এক পা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছি। শপিংমলের বাইরে এসে আমি নানুর হাতটা ছেড়ে দিলাম। কারণ আমি সেখানের দেয়ালে একটা মেয়ের পোস্টার দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা কিশোরী মেয়ের ছবি আঁকা পোস্টার। সম্ভবত আমার বয়েসিই হবে মেয়েটা।

আশ্চর্য হয়েই পোস্টারটার সামনে দাঁড়ালাম আমি। একটা কিশোরী মেয়ে কী করে এমন একটা পোস্টারে জায়গা করে নিলো ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি। ঈর্ষায় জ্বলে গেলো ভেতরটা। আরো একটু কাছাকাছি হয়ে পোস্টারের লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করলাম আমি। তাতে লেখা ছিলো— “মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্তমূল্য আর কিছুই হতে পারে না।”

অবাক হয়ে গেলাম আমি। আমার মতো একটা মেয়ে কী করে এতো কঠিন কথা বলতে পারে! অনেকগুলো পোস্টার দেয়ালটা জুড়ে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনে ঠাসা দেয়ালটা। তবে সবচে’ সুন্দর ছিলো সম্ভবত এই পোস্টারটাই। একটা নয়, পর পর একসাথে চার-পাঁচটা পোস্টার ছিলো এই একই ছবি আর লেখা দিয়ে তৈরি। কেউ দেখে ফেললে বকবে, সে ভয়ের কথা না ভেবেই একটা পোস্টার টেনে নামিয়ে আনলাম আমি। এবং দুহাতে মুড়ে জামার হাতার ভেতরে লম্বালম্বি ঢুকিয়ে রাখলাম, যেনো হঠাৎ করেই কেউ বুঝতে না পারে যে, আমার কাছে কিছু একটা আছে।

হ্যাঁ, এখন আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে ঘটনাটা। রাতে পড়ার রুমে বসে আমি চুপি চুপি পোস্টারটা বের করে আবার টেবিলে রাখলাম। অথচ সেটা কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। তবু আমার মনে হলো, এটা দেখলে অন্যরা হয়তো অযাচিত ভেবে আমাকে বোকা বলতে পারে। হয়তো আমার ভাইয়েরা হাসাহাসি করবে আর আমার বোকামি সবাইকে বলে বেড়াবে। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলাম পোস্টারের রঙ, ছবি আর লেখাগুলো। হতে পারে তখন কিছু বাদ পড়ে গেছে যা আমার পড়া হয় নি। চারকোণা একটা পোস্টার। চারপাশে সাদা-কালো ডোরাকাটা আল্পনা আঁকা ফ্রেম। ছবিটা পোস্টারের গায়ে কোণাকুণিভাবে লাগানো। মনে হচ্ছে মেয়েটা একটু কাত হয়ে আছে। আর ছবির একেবারে নীচে বড় বড় করে লাল হরফে লেখা— ‘মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্ত মূল্য আর কিছুই হতে পারে না।—হানা শাইবানি।’ এর নীচেই ব্র্যাকেটে লেখা, ‘ফিলিস্তিনে শহিদ প্রথম ইরাকি যোদ্ধা।’

‘শাইবানি’! আমার পরিবারেরই কারো গৌরব এটা! বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু আরো আশ্চর্য লাগলো যে, একে তো আমি চিনি না। কেউ তো কখনো বলে নি তার কথা আমাকে। আমাদের পরিবারেরই একটা মেয়ে, যে এতো বড় স্টার হয়ে গেছে, যাকে নিয়ে পোস্টার সাঁটা হচ্ছে দেয়ালে দেয়ালে, তাকে চিনবো না কেনো আমি?

তখনই দৌড়ে গেলাম বাবার কাছে।

—বাবা, হানা শাইবানি কে বলো নি তো আমাকে?

কিন্তু বাবা তখন টিভিতে খবর দেখার এতোটাই মগ্ন যে, আমার প্রশ্ন আর কৌতুহলটা তাকে স্পর্শই করলো না।

সে রাতে কাউকে আর কিছু না জিজ্ঞেস করে ভাবতে ভাবতে পোস্টারটা বুকে উপর রেখেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে নানুর নামাজ ও তাসবীহ পাঠ শেষ হলে জায়নামাজেই তার সামনে বসে পড়লাম।

—নানু, তোমাকে আমি একটা জিনিস দেখাবো, তুমি যদি পারো তাহলে বলবে মানুষটা কে। আমার মন বলছে, আমাদের পরিবাবের কেউ যদি চিনে থাকে তাহলে একমাত্র তুমিই ভালোভাবে তাকে চিনতে পারবে।

নানু রাজি হলেন। আমি তাকে জামার ভেতরে লুকিয়ে রাখা পোস্টারটা দেখালাম।

নানু বললেন— হানা শাইবানি।

—হ্যাঁ, কিন্তু হানা কে নানু? তুমি তো কখনো আমাকে বলো নি। অভিমান নানুর কণ্ঠে।

—হানাকে তো তোরা কেউ মনে রাখিস নি, তাই বলি নি।

—আমি তো কখনো তার কথা শুনি নি।

—তুই হানাকে দেখিস নি কখনো।

—কেনো? সে কি আমাদের বাড়িতে থাকতো না? নাকি পালিয়ে গিয়েছিলো?

নানু কোনো উত্তর দিলেন না। কেমন যেনো বিষণ্ন মনে হলো নানুকে। জায়নামাজ গুছিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়ে তার পারিবারিক অ্যালবাম দেখালেন।

ছোটবেলার সেই স্মৃতি আজো আমাকে কেমন যেনো বিভোর করে দেয়। বাসায় পড়ে থাকা সেই পুরোনো অ্যালবামে পারিবারিক ছবিগুলোর মাঝে যেনো পঞ্চাশের দশকের ইরাককে খুঁজে পেলাম আমি। আমার কোনো একজন নানুর বিয়েতে তোলা ছবিগুলো, যেখানে মুক্তোর নেকলেস পরা প্রাণোচ্ছল ছোট ছোট মেয়েরা আর আরবের জাতীয় ঐতিহ্যের কোর্তা পরা ছেলেদের হাসির মাঝে আমি এক নির্ভীক ইরাককে দেখতে পাচ্ছিলাম।

কিন্তু একটা বিশেষ ছবি আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিলো। সেটি ছিলো একটি ছোট কিশোরীর ফটোগ্রাফ, অন্তর্ভেদী তার চোখের দৃষ্টি। অবিকল পোস্টারের সেই ছবিটির একটা মিনি সংস্করণ। নানু বললেন— এই তোমার খালা, হানা শাইবানি।

তারপর যতই আমি হানা শাইবানি সম্বন্ধে জানতে থাকি, ততই বিস্ময়ে অভিভূত হতে থাকি।

হানা ছিলেন পঞ্চাশের দশকে বেড়ে ওঠা একজন উজ্জীবিত ইরাকি তরুণী। পুরুষশাসিত রাজনীতির জগতে প্রবেশ করে একজন নারীর ফিলিস্তিন বিপ্লবের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হবার প্রতীক ছিলেন তিনি। তার জীবনটাই ছিলো প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়া একজন সাহসী নারীর গল্প, একটা তরতাজা ইতিহাস ছিলেন তিনি। অথচ তার মৃত্যুর কারণটি আজও অজানা রয়ে গেছে।

আমি আমার পরিবারের সদস্যদের এবং বন্ধু-বান্ধবদের সবার স্মৃতিতে আমার খালা স¤পর্কে যা কিছু টুকরো কথা বা তথ্য ছিলো, সব একটু একটু জোড়া দেবার চেষ্টা করে যাই। যদিও এ ধরনের আলাদা আলাদা স্মৃতিগুলোকে জমা করা আমার জন্য কখনো কখনো খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

আমার শতবর্ষী নানু এখনো আমার খালার জন্মসালটা ঠিক বলতে পারেন, ২৭ আগস্ট ১৯৪২। বড় দু’ভাই এবং ছোট দু’ভাইয়ের মাঝে তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র মেয়ে। নানা ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিক। খালার ওপর তার প্রভাব ছিলো অসামান্য। খালাকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে তুলতে তার যথেষ্ট অবদানও ছিলো। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্বাধীনতা, আরব-সমাজ চেতনা আর ঐক্যের শ্লোগান তুলে ইরাকে বাথ পার্টি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করলে হানাও সেই জাগরণ এড়াতে পারেন নি। রাজনৈতিক তৎপরতা ও প্রমাণ করার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকা সত্বেও মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি বাথ পার্টির সদস্যপদ গ্রহণের সুযোগ পেয়ে যান। ভার্সিটিতে পড়াকালেই তিনি দিনের বেলা পার্টির কাজ করতেন, আর সান্ধ্যকালীন ক্লাসে যোগ দিতেন। মাত্র দু’বছরের মাথায় মাত্র ষোল বছর বয়সে খালা ইরাকের রাজতন্ত্র উৎখাতে পার্টির মহিলা সদস্যদের নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে চমকে দেন। রাজনীতির জন্য তখন থেকে তিনি বাসার বিলাসিতা ছেড়ে হোস্টেলে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। অথচ তখনও তার বয়স টিন-এজ পার হয় নি। কিন্তু ইতোমধ্যে যা তিনি অর্জন করেছেন, সে সময়ের বেশির ভাগ নারী তা কল্পনাও করতে পারতো না। সব দিক থেকেই তিনি ছিলেন নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা।

খালা সম্পর্কে এইটুকু তথ্য আমি অনায়াসে যোগাড় করতে সক্ষম হই। কিন্তু তার পরের গল্প কী ছিলো সেটাও আমাকে জানতে হবে। আমি আমার মায়ের কাছে ছুটে যাই, তিনি যেনো খালার কোনো বীরত্বের ঘটনা আমাকে বলেন। আমার মা অনেক কষ্টেসৃষ্টে তার বোনের একটি মাত্র ঘটনা স্মরণ করতে সমর্থ হলেন। অথচ এই রকম একটা ঘটনা আমাদের পরিবারে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার কথা।

মা বললেন— হানা প্রায়ই বিভিন্ন মিছিলে শামিল হয়ে যেতো। পরিস্থিতি সে সময় ছিলো খুবই উত্তপ্ত। বিরোধীদের মিছিলে পুলিশের গুলি আর মৃতুর ঝুঁকি ছিলো যখন তখন। কিন্তুহানা মিছিলে যাবেই তাতে যা-ই হোক। একবার পরিস্থিতি পূর্বের চাইতে অনেক বেশি অশান্ত হয়ে উঠলো। বিপদ আঁচ করে হানা তার পিস্তল, যা ও নিরাপত্তার খাতিরে সঙ্গে রাখতো, স্কার্টের নীচে লুকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। বাবা বারবার তাকে মিনতি করছিলেন না যাওয়ার জন্য। বাবা বলছিলেন, যদিও একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে মিছিলে যাওয়া দরকার এটা তিনি বোঝেন, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মেয়ের জন্য প্রগাঢ় ভালোবাসা তাকে বাধ্য করছে মেয়েকে মিছিলে যেতে বারণ করতে।

—হানার জবাব কি ছিলো, মা? আমি জানতে চাইলাম।

—হানা বললো, ‘বাবা, দেশপ্রেমিক তুমিও, কোনো ডাক আসলে কখনো তুমি তা উপেক্ষা করতে পারো নি। একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার স্নেহাশীষ ছাড়া নয় বরং তা নিয়েই আমাকে যেতে দাও, বাবা।’ বাবা তাকে আর বাধা দিতে পারেন নি।

মা আমাকে জানাতে পারেন নি, কখন, কত বছর আগে এই ঘটনাটা ঘটেছিলো। পরে আমি খুঁজে পেয়েছি যে, এটা ছিলো ১৯৫৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আব্দুল করিম কাসিমের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ডাকা কোনো এক মিছিলের ঘটনা। দুঃখ হলো, আজ নানা থাকলে খালা সম্পর্কে কত কিছুই না জানা যেতো। অবশ্য মা বলেছেন যে, খালা কয়েকবার বিদেশের বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগ দিতেন। বৈরুতে অনুষ্ঠিত আরব ন্যাশনাল বাথ পার্টির কনফারেন্সে ইরাকের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করার ছবি আমাদের অ্যালবামে ছিলো।

আমার আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। খালাকে আরো জানতে আমি বিভিন্ন পত্রিকা অফিসেও খোঁজ নিতে থাকি। সেখানে খালা সম্পর্কে লেখা বেশ কয়েকটি আর্টিকেলও খুঁজে পাই। তাতে জানতে পারি, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও হানা বিভিন্ন কারখানায় ও কৃষিফার্মে কাজ করতে বেশি পছন্দ করতেন, যাতে করে সাধারণ মানুষের খুব কাছে আসা যায় এবং তাদের চিন্তাভাবনার গতিধারা বোঝা যায়। এ দুর্বল মানুষগুলোর ওপর তার প্রভাবও ছিলো দারুণ। চাকরি করে মাসান্তে যেটুকু রোজগার হতো, তার বড় একটা অংশ তিনি বাগদাদের দরিদ্র অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজনের কাছে পাঠাতেন। পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে দুর্বল ভাবা হয় সব জায়গাতেই। হানার কর্মক্ষেত্রও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। তবুও তিনি তার আত্মবিশ্বাস আর চেষ্টায় সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের জন্য আলাদা একটি সম্মানের আসন সৃষ্টি করে নিতে সফল হয়েছিলেন। তার সহকর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা করতেন, কেননা, যে কোনো অন্যায় রুখে দাঁড়াবার সাহস আর হার না মানা প্রাণ ছিলো হানার।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, খালা যে আসলে কী চাকরি করতেন, সেটা আমি কারো থেকেই কোনোমতে উদ্ধার করতে পারি নি। বিভিন্নজন অনুমান করে যে সব কথা আমাকে বলেছেন, তাতে বৈপরিত্য এতো বেশি যে, তা আমি গ্রহণ করতে রাজি হই নি।

আমাদের পরিবারের বড়রা প্রায় সবাই জানে, একসময় খালা কী এক কারণে বাথ পার্টি ছেড়ে দেন এবং হঠাৎ করেই বাসায় ফিলিস্তিনে যাবার কথা বলতে থাকেন।

এটা ছিলো সেই সময়ের কথা যখন আরব বিশ্বে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। এ সময়ই গঠিত হয় পিএলও; জর্দান ও লেবাননকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি সশস্ত্র সংগ্রামী সংগঠন, যাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিলো ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করা। আরব জাতীয়তাবাদের একজন আন্তরিক সমর্থক হিসেবে হানা এ আন্দোলনটিকে নিজের আদর্শের অনেক কাছের বলে মনে করেন এবং এতে যোগ দেবার তাগিদ অনুভব করতে থাকেন প্রচ-। সময় নষ্ট না করে হানা লেবানন ও জর্দান ভ্রমণ করেন, পিএলও পরিচালিত বেশ কিছু সেমিনার ও কনফারেন্সে যোগদান করেন। আমাদের অ্যালবামের ছবিতে তাকে পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাতসহ অন্যান্য নেতাদের সাথেও সাক্ষাত করার ছবিও দেখেছি আমি।

কিন্তু জানি না, কী কারণে খালা পিএলও-র ওপর আস্থা রাখতে পারেন নি। তিনি এমন একটি সংগঠন খুঁজতে থাকনে, যা অন্য দলগুলোর তুলনায় আরো শক্তভাবে মুসলিম আদর্শকে অনুসরণ করে। বাগদাদে ফিরে তিনি তার ভাইদের জানান, ডিএফএলপি-তে যোগ দেবার জন্য এবার জর্দানে যাবেন তিনি। ফিলিস্তিনের যুদ্ধে জড়িতে হবার একবুক স্বপ্ন নিয়ে খালা জর্দান পৌঁছে তার ইরাকি পরিচয় লুকিয়ে ফেলেন। তারপর ফিলিস্তিনি মানুষদের সাথে তাদেরই একজন হিসেবে বসবাস শুরু করেন। এমনকি তিনি নিজের নাম পাল্টে ছদ্মনাম রাখেন ‘আমিলা’। কথাও বলতে শুরু করেন ফিলিস্তিনি উচ্চারণে। খালার বিশ্বাস ছিলো, ফিলিস্তিনি মানুষগুলো কেবল তখনই তাকে আপন করে নেবে, যখন তারা জানবে তিনি তাদেরই একজন। এভাবেই তিনি আরও ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারবেন তাদের।

আমি আবার নানুর কাছে যাই, তিনি কেনো ফিলিস্তিনে চলে গেছেন, তার আরো কিছু কারণ জানতে। নানু বেশি কিছু মনে করতে পারলেন না। কেবল এটুকু বললেন যে, খালা তখন থাকতেন একটি উদ্বাস্তু ক্যাম্পে। সেখানে থেকে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন ডিএফএলপি-র নিজস্ব নিউজলেটারে। অসহায় নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করবার চেষ্টা করতেন।

নানু বললেন— যেখানে, যেকাজই করতে যেতো হানা, আমাকে বলে যেতো। হঠাৎ করেই একদিন হানা বাড়িতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দেয়। বারবার বলতে থাকে, আমাকে মাফ করো মা, তোমাকে না জানিয়েই আমি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছি। আমার ওপর থেকে তুমি তোমার সেবা করার হকটুকু ক্ষমা করে দাও। আমি যখন সম্মতি দিলাম, তখন আবার সে ফিলিস্তিনে ফিরে গেলো। এরপর আর আসে নি। না না, এসেছে…এসেছে কাফনে…

খালার কথা বলতে বলতে বাকরুদ্ধ হয়ে যান নানু।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে খালা তার আদর্শে অবিচল থেকে যান। সে বছরই শহিদ হয়ে যান তিনি। আমি তার বন্ধুদের কাছে শুনেছি, এক বিকেলে খালা রেডিওতে শুনছিলেন দু’জন বীরযোদ্ধার আত্মত্যাগের স্মরণে প্রচারিত একটা অনুষ্ঠান। তার মনে এক নতুন চিন্তা জেগে ওঠে, শাহাদাত। তিনি শহিদ হবার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেন। রেডিওর শোকাহত উচ্চারণের মাঝে তিনি সহকর্মীদের বলেন, তিনি শহিদ হবার স্বপ্ন দেখছেন এবং এ কল্পনাও করছেন, তিনি যদি কফিনে চড়ে বাগদাদে ফিরে যান, তাহলে তার মা কিভাবে তাকে গ্রহণ করবেন!

স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে হানাকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। হঠাৎ করেই তার মৃত্যুর খবর উড়ে আসে বাড়িতে। কেবল কারণটা অজানা।

আজ পর্যন্ত হানার মৃত্যু সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। অনেকেই বলেছেন, জর্দানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ইরবিদে তিনি শহিদ হন। কেউ কেউ বলেছেন, ডিএফএলপি-র একটি নিয়মিত মহড়া চলাকালে একটি আত্মঘাতি হামলায় কয়েকজন সহকর্মীর সাথে শহিদ হন তিনি। আবার অনেকে বলেন, ট্রেনিং চলাকালে অসাবধানতায় তার নিজের অস্ত্রটিই হাত ফসকে পড়ে যায় এবং মাটিতে ধাক্কা খেয়ে তা থেকে গুলি বেরিয়ে গিয়ে তাকে বিদ্ধ করে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকেও তার মৃত্যুর জন্যে দায়ি করা হয় একটি বুলেটকেই, যা সরাসরি তার হৃৎপিন্ডের মাঝখানটি বিদীর্ণ করে দিয়েছে।

তার শাহাদাতে আমাদের পুরো পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পুরোনো পত্রিকা ঘেঁটে দেখেছি, এতোদিন খালার বিরুদ্ধে লেগে থাকা ইরাকি সরকারও ক্রেডিট নিতে তাকে শহিদ ঘোষণা করেছে। তিনিই প্রথম ইরাকি যোদ্ধা, যিনি একজন নারী হয়েও ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।

বাবা আমাকে বলেছেন— শাহাদাতের আগের দিন সহকর্মীদের বলে যাওয়া খালার সেই স্বপ্নটি পূরণ হয়েছে, ফিলিস্তিনি পতাকায় জড়ানো কফিনে চড়েই বাড়িতে ফিরেছে হানা। হাজারো মানুষের শ্রদ্ধায় সিক্ত খালার কফিনটি যখন দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, প্রথানুযায়ী নারীরা কফিনের উপর চকোলেট ও মিষ্টি ছড়িয়ে দিচ্ছিলো।

এটি ছিলো চল্লিশ বছর আগেকার একটি ঘটনা, যখন আমার জন্মও হয় নি। কিন্তু একজন আরব মেয়ে হিসেবে আমার কাছে হানা শাইবানি আজো চিরজীবন্ত এক প্রেরণার উৎস। যে আদর্শে তিনি বিশ্বাস করতেন, তা থেকে কোনো কিছুই তাকে বিচ্যুত করতে পারে নি এবং আদর্শের বাস্তবায়নে তিনি কখনো কারো চেয়ে পিছনে থাকতে চান নি। তিনি সেই মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করতেন, যা চিন্তা ও কর্মের দিক থেকে এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। যেখানে তার সব ভাবনা জুড়ে ছিলো কেবল মানুষের স্বাধীনতা। ফিলিস্তিনের মুক্তি। সেদিন হয়তো অনেকে তাকে শহিদ বলে গর্ব করেছেন, বীরাঙ্গনা নারী বলে সম্মান জানিয়েছেন, ইরাকের একটি অহঙ্কার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পরে আর মানুষ তাকে মনে রাখে নি। যেমন আমি নিজেও আমার পরিবার থেকে কখনো তার কথা জানতে পারি নি। কেবল আমার নানু ছিলেন বলেই হয়তো এ যুগে আমি তার পরিচয় জানতে পেরেছি ।

বহু বছর আগে দেয়ালে সাঁটানো আমার খালার যে ছবিটি আমি দেখেছিলাম, তা আমি আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় সাজিয়ে রেখেছি। সেই পোস্টারটিও আজো রেখে দিয়েছি আমি সযতনে। রেখে দিয়েছি অ্যালবামে সুরক্ষিত করে রাখা খালার সবকটি স্মৃতি। আজো চোখে ভাসে সে পোস্টার, যে পোস্টারটি খালার মৃত্যুর পর তার কিশোরবেলার ছবি দিয়ে ইরাকের দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হয়েছিলো। সেই জ্বলে জ্বলে লাল হরফে লেখা— ‘মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্ত মূল্য আর কিছু হতে পারে না।’ —হানা শাইবানি (ফিলিস্তিনে শহিদ প্রথম ইরাকি মেয়ে)

কাল হানার মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো। আমাদের কেউ তাকে স্মরণ রাখে নি। কেবল নানু রেখেছিলেন। প্রতিবছর নানু এভাবেই তার পোস্টার ছাপিয়ে দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আমি ভাবছি— আমার গল্প জানার কৌতুহল না থাকলে কি আমি পোস্টারে সেঁটে থাকা আমার বিপ্লবী খালাকে খুঁজে পেতাম!


দিমা শাইবানি— হানা শাইবানির বোনের মেয়ে। খালা সম্পর্কে তার এই স্মৃতিগল্পটি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আল জাজিরায় প্রকাশিত হয়, যখন ইসরায়েলের মুহুর্মুহ হামলায় ফিলিস্তিন আবারো রক্তাক্ত হচ্ছিলো। ‘পোস্টারে সেঁটে থাকা সেই মেয়েটি’ দিমা শাইবানির সেই আখ্যানেরই অনুবাদ।


গল্পটি ‘মাকতাবাতুল ইসলাম’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘আশিক মিন ফিলিস্তিন’ নামক গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।


 

আমি মনযূরুল হক। সার্টিফিকেটে নাম মো. মনযূরুল হক মোর্শেদ। পেশা ও নেশা লেখালেখি। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করছি দ্য সুলতান.কমের হেড অব কনটেন্ট হিসেবে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম না- ৭টি। ২০১৫ সালে সামওয়্যারইনব্লগে সেরা লেখা নির্বাচিত হয়ে পুরুস্কৃত হয়েছি। এই তো, এখন সর্বাঙ্গে জড়িত আছি দ্য সুলতান.কমের সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

ফিলিস্তিনি গল্প— শোধ

মূল— ইবরাহিম নাসরুল্লাহ। ভাষান্তর— মিরাজ রহমান বড় বেশি রকম পীড়াপীড়ি করছে নিয়াজ।
গো টু টপ