ইমাম আবু হানিফা— বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞানচর্চার পুরোধা

অথর- টপিক- সুলতান স্টোরি/

গ্রেট ফকিহ অব ইসলাম— ০১ 


বিশিষ্ট তাবিয়ী বিদগ্ধ আলিম ও ইজতিহাদ জগতের মেহেরবান রাহনুমা ছিলেন হজরত ইমাম আবু হানিফা। জ্ঞান রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম গৌরব। তিনিই সর্ব প্রথম পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বুদ্ধিভিত্তিক গবেষণা কর্মের দুয়ার উম্মোচন করেন এবং মানুষের জীবন ও জগতের সকল পরিবর্তনশীলতার মাঝেও নববী আদর্শের নিখুত অনুসারী হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক সফলতা অর্জনের পথ প্রদর্শন করেন। আজ মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞানচর্চার যত দিকপাল আমরা দেখি সবাই তাঁর কাছে ঋণী। সবাই এই ইমাম আবু হানিফার পথ ধরেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ইসলামের বিশুদ্ধ গবেষণা ও ইজতিহাদের পথিকৃত, তিনি এই মহাজগতের পুরোধা, তিনি ইমাম আজম। পৃথিবীতে সক্রেটিস প্লেটো আইনস্টাইন প্রমুখ বিজ্ঞজন বিশ্বমানবতাকে জ্ঞান ও দর্শনের দীক্ষা দান করেছেন। তাঁরা মানুষের জীবন ও জগত সুডৌল করার পথ ও পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাঁদের সে সব দর্শন ও দিকনির্দেশনা ছিল একপেশে, একদিকদর্শী ও অপূর্ণ।

তাদের দর্শনে জাগতিক সফলতার বহুবিদ উপকরন বিদ্যমান কিন্তু মানুষের অন্তর, মানুষের মননজগত, মানুষের মওত ও আখিরাতকে অভিষ্পিত পাওয়ার ব্যাপারে সেখানে কোন নির্দেশনা নেই। এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা অনন্য। এক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি সাদা কালো নির্বিশেষে বিশ্ব মানবতার বিশ্বাস ও আকায়েদ, জ্ঞান ও চেতনা, নৈতিকতাবোধ, আচার আচরণ, দৈনন্দিন জীবন চলার নিখুত পথ ও পাথেয়, ইবাদত বন্দেগী, ওযীফা ওযায়েফ থেকে শুরু করে জীবনের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ ও সফলতার সহজসাধ্য নির্দেশনা পেশ করেন; তার সেই নির্দেশনা সকল পরিবর্তনশীলতার চাকার সাথে সর্বদা খাপ খাইয়ে চলার উপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ।


লিখেছেন ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ


কী সুন্দর! এ পথ ও পদ্ধতি তিনি নিজ মেধা থেকে নয়; পবিত্র কুরআন, মহানবীর সুন্নাহ ও সাহাবা চরিতের ভিত্তিমূলে উদ্ভাবন করেন। সুন্নাহর সুকঠিন নিক্তির অবলম্বনে একই সাথে মানুষকে উপহার দিয়েছেন জীবন ও জগত সাজানোর এবং দুনিয়া ও আখিরাত কল্যাণকর বানানোর যুগপৎ ভাবে পরিচালনার আলোকবর্তিকা। কী এক মহারাজপথ। আর উম্মতের সালাফ খালাফ নির্বিশেষে সবাই একবাক্যে তাঁর বিশ্ময়কর প্রতিভার স্বীকৃতি দেন এবং নিজেরাও সহযোদ্ধা হয়ে সম্মুখ পথ আরো সুগম করার অভিযানে অবতীর্ণ হন।

আজ ভাবতে ভাল লাগে যে, ইউরোপের অনেক নামকরা দার্শনিকরা মুসলিমদের এই ইমামের প্রতিভা ও জ্ঞানের পরিধি, ব্যাপ্তি, গভীরতা ও সুক্ষানুভূতি দেখে তাঁকে দর্শন জগতের ইনসানে কামিল আখ্যা দিয়ে সম্মান করে। এখানে বলে রাখি, ইসলামে ইজতিহাদের দুয়ার কখনো বন্ধ করা হয়নি। ইজতিহাদের দুয়ার আগেও খোলা ছিল, এখনো খোলা আছে, ভবিষ্যতেও খোলা থাকবে। তবে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে কোন বিকৃতি সাধনের দুয়ার বন্ধ। অর্থাৎ ইজতিহাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ইসলাম বিকৃতির অপচেষ্টা করা, কিংবা কেউ নিজের নিজস্ব কোন ধ্যান ধারনাকে ভুল পথে ইসলামের লেবেল সাঁটিয়ে উম্মতের কাছে ইসলাম বলে বিক্রি করার সুযোগ চিরকালের জন্য বন্ধ। তাই সেই তাবিয়ী যুগ থেকে আইন চলে আসছে যে, যিনি মুজতাহিদ হবেন তিনি অবশ্যই বিশুদ্ধ আকীদা ও চিন্তাধারার অধিকারী, কুরআন সুন্নাহর বিষয়ে প্রাজ্ঞ, সুউচ্চ মানের পণ্ডিত, উম্মতের কাছে স্বীকৃত, বিশাল আমানতদার, সর্ব বিষয়ে সচেতন ও সজাগ, শেষরাতের সেহেরগাহী সম্পন্ন, শ্রেষ্ঠ পরহেজগার, সগীরা ও কবীরা গুনাহ থেকে নিজকে হিফাযতের জন্য কঠোর মুজাহাদাকারী ব্যক্তিত্ব হবেন।

দুঃখের বিষয় আসমানী নেজাম থেকে এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, ইজতিহাদের সেই যামানা শেষ হওয়ার পর ইমাম চতুষ্ঠয়ের সেই মেধা ও আখলাক পরবর্তী কালে অপর কোন ব্যক্তিত্বের মধ্যে ফিরে পাওয়া যায়নি যেমনি ভাবে ইমাম বুখারীর ইন্তিকালের পর মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে গোটা জগতের কোথাও বুখারীর মত যোগ্য অপর কোন মেধা আর দুনিয়ায় ফিরে আসেনি। আমরা জানি, জীবন ও জগৎ তথা গোটা সৃষ্টিই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের উম্মুক্ত বহিপ্রকাশ। এ সৃষ্টির কোন কিছুই স্থবির নয়; চলমান গতিশীল সদা সম্মুখের দিকে দ্রুত ধাবমান।

সৃষ্ট জগতের এই গতিশীল স্পন্দনের সাথে মানুষের জীবনও গতিময়, সদা সম্মুখ অগ্রসরমান, কেউ থেমে নেই, থেমে থাকবেও না। আবার মহান আল্লাহর নির্দেশ হল; পরিবর্তিত কোন পরিস্থিতিতেই সুন্নাহর আইন উপেক্ষা করা যাবে না। হার হালতে মানুষ নিজকে সুন্নাহর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাখতে হবে। তাই এত সব পরিবর্তনশীলতা ও অগ্রসরমানতার পাশাপাশি উম্মতের মাঝে যদি ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর সহযোদ্ধাদের হামেশা চৌকান্না উপস্থিতি না থাকতো তাহলে পরিবর্তনশীলতার ঘূর্ণাবর্তে দুনিয়ার কত জায়গায় কত মানুষ যে সিরাতে মুস্তাকীম ও সুন্নাহর পথ থেকে হারিয়ে যেত তার কোন ইয়াত্তা ছিল না।

ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ- পীর সাহেব খানকায়ে শায়খ যাকারিয়াহ (রহ.)। এছাড়া বর্তমানে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উপ-পরিচালক এবং তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন জামে মসজিদের খতিব ও জামিয়ার শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমানা ছাপিয়ে বিশ্বদরবারে যে কয়জন বাঙালি আলেমেদ্বীনের নাম উচ্চকিত হয়েছে ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ তাদের অন্যতম একজন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ তিনি। একাধারে তিনি একজন সুবক্তা, লেখক-সাহিত্যিক, খতিব, শাইখুল হাদিস এবং বাংলাদেশের অন্যতম একজন আধ্যাত্মিক রাহবার। তিনিই বাংলাদেশের কওমি মাদরাসায় পড়ুয়া প্রথম আলেম যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। দ্য সুলতানে লিখছেন অতিথি লেখক হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ