নবিওয়ালা দাওয়াত পৌঁছাতে ‘প্রযুক্তির আওয়াজ’ গ্রহণ করতে অসুবিধা কোথায়?

অথর- টপিক- অপিনিয়ন

মাইক যেমন একটি প্রযুক্তি, ইন্টারনেটও তেমনি একটি প্রযুক্তি। মাইকের তুলনায় অনেক বেশি গতিময়, সহজ এবং ক্রিয়াশীল ইন্টারনেট। দূর থেকে দূরান্তে, দৃষ্টিসীমার ওপারে বাণী পৌছানোর ক্ষমতাও রাখে এই ইন্টারনেট। ইন্টারনেট-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইজতেমার বাণী বিশ্বদরবারে পৌছে দেওয়া সম্ভব মুর্হূতেই। নবীওয়ালা দাওয়াত পৌঁছাতে ‘মাইকের আওয়াজ’ যেখানে গ্রহণ করা হচ্ছে, ‘প্রযুক্তির আওয়াজ’ গ্রহণ করতে সেখানে অসুবিধা কোথায়? লিখেছেন মিরাজ রহমান


ইন্টারনেট— গত শতাব্দীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম আবিস্কার। ইন্টারনেটের কল্যাণে গোটা পৃথিবী এখন একই সুতোয় গাঁথা। হাজার মাইল দূরের মানুষের সাথে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনায়েসেই যোগাযোগ করা যায়। কথা বলা যায়, শেয়ার করা যায় অনুভূতি; এমনটি দেখাও যায়। বিশ্বব্যাপি তথ্য আদান-প্রদান; ব্যক্তিগত, সামাজিক, ব্যবসায়িক, ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় যে কোনো প্রকার যোগাযোগকে সহজ ও গতিময় করতে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। আর এই ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রাথমিক স্তর হলো ওয়েবসাইট। যাকে সহজ বাংলায় ইন্টারনেটভিত্তিক ঠিকানা বলা যায়। একেকটি ডোমেইনের আন্ডারে হাজার হাজার পেইজের ওয়েবসাইট নির্মাণ করা সম্ভব। আর ডোমেইন হলো ওয়েব ঠিকানা হিসেবে ব্যবহৃত একটি নাম। প্রত্যেকটি বাড়ির যেমন একটি হাউজিং-হোল্ডিং নম্বর থাকে, ডোমেইন হলো যে রকম একটি নাম-নম্বর। ২০১১ সালের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইন্টারনেটে মোট রেজিস্ট্রি করা ডোমেইনের সংখ্যা ৫৫ কোটি। (সূত্র : staticbrain.com) যার একেকটি ডোমেইনের আন্ডারে রয়েছে হাজার হাজার পৃষ্ঠার, লক্ষ-কোটি বিষয়ভিত্তিক অসংখ্য-অগণিত তথ্য সমৃদ্ধ ওয়েব সাইট এবং এসব ওয়েব সাইটের রয়েছে মিলিয়ন-বিলিয়ন দর্শক। ২০১২ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে শুধুমাত্র এশিয়াতে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০৭৭ মিলিয়ন বা প্রায় ১০৮ কোটি। একই সময় বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিলো প্রায় আশি লাখ। (সূত্র : internetworldstats.com)

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যার বৃদ্ধিগতি কেবল উর্ধ্বমমুখীই নয়, যে কোনো প্রকার গাণিতিক হিসেবকেও হার মানায় এই বৃদ্ধিগতি। বর্তমান বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের চেহারা হচ্ছে— প্রত্যেকজন মোবাইল ব্যবহারকারীই একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। মোট কথা গোটা বিশ্বব্যাপি মিলিয়ন-বিলিয়ন মানুষের কাছে কোনো তথ্য-বার্তা খুব অল্প সময়ে পৌছে দেওয়ার জন্য ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। অন্যান্য বিষয় ও তথ্যের  মতো ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের বিষয়টি খুবই উর্বর ও যুগোপযুগী। হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত সব নবি-রাসুলদের দাওয়াতি জীবন পর্যালোচনা করলে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে আসে, সেটা হলো— প্রত্যেকজন নবি-রাসুলই ছিলেন তৎকালীন যুগোপযুগী বিদ্যা ও তথ্য-প্রযুক্তিতে পারদর্শী । প্রত্যেক নবি-রাসুলই দীনের দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করেছেন তৎকালীন যুগশ্রেষ্ঠ মাধ্যম বা প্রযুক্তিকে। বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির স্বর্ণযুগ। ইন্টারনেট-মিডিয়ার যুগ। প্রযুক্তির উৎকর্ষময় এই যুগে ইসলামের প্রচার-প্রসারের কাজে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টারনেটের গতিময়তাকে কাজে লাগাতে হবে ইসলামের দাওয়াতি কাজে। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ বলেছেন, ‘ইন্টারনেটের মোকাবিলা করতে হবে ইন্টারনেটের সাহায্যে। কম্পিউটারের মোকাবিলায় কম্পিউটার এবং কলমের মোকাবিলায় কলমের সাহায্যে গ্রহণ করতে হবে। উটের পিঠে চড়ে ‘ল্যান্ডক্রুজারে’র সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া কখনোই সম্ভব না।’

দাওয়াত অর্থ আল্লাহর দীনের দিকে মানুষকে আহ্বান করা। আর তাবলিগ হচ্ছে, আল্লাহ-রাসুলের বাণী মানুষের কাছে পৌছে দেওয়া। নবি-রাসূলদের মূল দায়িত্ব ছিল দাওয়াত ও তাবলিগ। নবুয়তের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নবিওয়ালা এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ওপর। প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর একটি বাক্যও যদি আমাদের কারো জানা থাকে, তা অন্যদের কাছে পৌছে দিতে। রাসুল (সা.)-এর এই নির্দেশ পালন করা সব মুসলমানের জন্য জরুরী। বর্তমান তাবলিগ জামাত এ কাজটিই করছে। তাবলিগ জামাতের দাওয়াতি কার্যক্রমের সাফল্যম-িত বিশাল একটি গণজমায়েত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৪৯ তম বিশ্ব ইজতেমা। বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জমায়েত হন এখানে। নিজের অর্থ-সময়-শক্তি ব্যয় করেন ইসলামের স্বার্থে। কেবল বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বের মুসলিম তথা ইসলামের জন্য এ এক অমূল্য সাফল্য। ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাসে নববি আদর্শ খচিত আখিরাতমুখি এক মিশন এই তাবলিগ ও বিশ্ব ইজতেমা। হাজার হাজার অমুসলিম, লক্ষ লক্ষ আল্লাহভোলা মুসলিমকে দীন ইসলামের সঠিক দিশা প্রদানে সক্ষম হয়েছে নবিওয়ালা এই ফিকির। লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ, ইসলাম প্রিয় মুসলিম আসেন ইজতেমায় কিন্তু অনেকে এমনও থাকেন শত ইচ্ছা থাকার পরও শরিক হতে পারেন না ইজতেমায়। দূর-দূরান্তের দেশে অবস্থান করার কারণে ইজতেমায় আসতে পারেন না অনেক মুসলিম ভাইই। তাদের কি হবে? তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে ইজতেমায় শরিক না হতে পেরে বাংলাদেশেসহ সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম বঞ্চিত হন দাওয়াতি প্রবাহ থেকে। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে তাবলিগ জামাতের দাওয়াতি কাজে, ইজতেমার ময়দানের বাণী বিশ্ববাসীর কাছে পৌছে দেওয়ার কাজে কেন ব্যবহার হচ্ছে না ইন্টারনেট? কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না যুগোপযুগী প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ? আজ যদি তাবলিগ জামাতের নিজস্ব কোনো ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ইজতেমার বয়ান ও আখেরি মোনাজাত প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো কতোই না ভালো হতো। বিদেশে অবস্থানকারীরা এবং ইজতেমাতে শরিক হতে না পরা মুসলিম ভাইয়েরাও শুনতে পারতেন ইজতেমার বয়ান, শরিক হতে পারতেন আখেরি মোনাজাতে। কেন হচ্ছেন না তাঁরা প্রযুক্তিমুখি? ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রমের ব্যাপক প্রচার-প্রসারের স্বার্থে কেন গ্রহণ করছেন না তাঁরা প্রযুক্তিকে?

মাইকের আওয়াজ এসে যতদুর পৌছায় ঠিক ততদূরই সীমাবদ্ধ থাকে ‘ইজতেমার আওয়াজ’। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন মাইকের আওয়াজ শুনতে। স্থান সংকুলনের ঝামেলায় ঘটে নানা দূঘটনা। কিন্তু এই মাইকের আওয়াজ যেখানে পৌছাবে না, ইজতেমার বার্তা কি পৌঁছাবে না সেখানটায়? কেন ‘আরো উচ্চ আওয়াজ’ গ্রহণ করা হচ্ছে না, দূর থেকে আরো দূর-দূরান্তে ইজতেমার বাণী পৌছানোর যুগোপযুগী গতিময় কোনো ‘আওয়াজ’ কেন গ্রহণ করছেন না মুরব্বিরা?  ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো যুগচাহিদার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা। যুগের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দাওয়াতের প্রকৃতি ও আঙ্গিকে পরিবর্তন আসে। পবিত্র কোরআনে দাওয়াতের মূলনীতি বর্ণনা করে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বিতর্ক কর’। [সুরা নাহল-১২৫] মাইক যেমন একটি প্রযুক্তি, ইন্টারনেটও তেমনি একটি প্রযুক্তি। মাইকের তুলনায় অনেক বেশি গতিময়, সহজ এবং ক্রিয়াশীল ইন্টারনেট। দূর থেকে দূরান্তে, দৃষ্টিসীমার ওপারে বাণী পৌছানোর ক্ষমতাও রাখে এই ইন্টারনেট। ইন্টারনেট-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইজতেমার বাণী বিশ্বদরবারে পৌছে দেওয়া সম্ভব মুর্হূতেই। নবীওয়ালা দাওয়াত পৌঁছাতে ‘মাইকের আওয়াজ’ যেখানে গ্রহণ করা হচ্ছে, ‘প্রযুক্তির আওয়াজ’ গ্রহণ করতে সেখানে অসুবিধা কোথায়? ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে দুই পর্বে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার সিন্ধান্ত যেমন জরুরী ছিলো, ইজতেমায় তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্য সুলতান- এটি দ্য সুলতান.কমের একটি অফিসিয়াল আইডি। যাদের নামে কোনো আইডি দ্য সুলতানে নেই, তাদের নাম লেখার মাঝে ব্যবহার করে আমরা সাধারণত এই আইডির মাধ্যমে তাদের লেখাগুলো দ্য সুলতান.কমে প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

লেটেস্ট ফরম

গো টু টপ