Author

মনযূরুল হক

মনযূরুল হক has 25 articles published.

সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত অসাধারণ একজন প্রেসিডেন্ট— ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ

অথোর- টপিক- /সুলতান স্টোরি

ঘটনাটা ২০০৮ সালের। ইরানের প্রেসিডেন্টের ছেলের বিয়ে। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ঠিক বিয়ের দিন দেখা গেলো অতিথিদের তেমন কোনো সাড়া নেই। তাহলে কি কট্টরপন্থী আখ্যা পাওয়া প্রেসিডেন্টকে বয়কট করতে শুরু করেছে সর্বশ্রেণির মানুষ? এনবিসি নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক বিয়ের বর মাহদিকেই ধরে বসলেন। জানতে পারলেন বিয়েতে মাত্র ৪৫ জন অতিথিকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। তার মধ্যে ২৫ জন নারী এবং ২০ জন পুরুষ। খোদ প্রেসিডেন্টের কাছেই সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন— এটা কি নিরাপত্তাজনিত কারণে? প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত হাসিমুখে বিনয়ের সাথে বললেন— এর চাইতে বেশি মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। দেখা গেছে— বিয়ের অনুষ্ঠানে শুধু কমলা, আপেল, কলা ও ছোট এক টুকরো কেক দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়েছে। এই প্রেসিডেন্টই হলেন ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। পৃথিবীতে এমন অনেক ক্ষমতাধর নির্বাচিত হন বিভিন্ন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে । যথা নিয়মে তারা চলে যান এবং মানুষ তাদের ভুলে যায়, স্মৃতি হাতড়েও খুঁজে পায় না। এর ব্যতিক্রম যারা রয়েছেন আহমাদিনেজাদ তাদের অন্যতম। তিনি তার জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই এমন সব নজির উপহার দিয়েছেন, যা কেবল ইসলামের সোনালী যুগের স্বর্ণমানবদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় ।

তিনি ক্ষমতা বা অবস্থানের থেকে কাজটিকেই সবচে’ বেশি গুরুত্ব দিতেন। ধরুন, তিনি একটি তেহরান শহরের মেয়র। তার কাজ কী— তার থেকেও বেশি বিবেচনা করছেন সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম কাজটি কী। তাই তিনি সকাল বেলা নিজ হাতে তেহরানের রাস্তা ঝাড়ু দিতেন ।

আশির দশকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়ও মাহমুদ ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী। ১৯৭০ সালের শেষের দিকে ‘সারকর্ড’ শহরের মেয়রের উপদেষ্টা হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন বলা হয়, ১৯৭৯ সালে আমেরিকান দূতাবাস আক্রমণ করে ৫৩ জন কূটনীতিককে বন্দী করা হাজারো আহমেদিনেজাদ ছিলেন একজন। ১৯৮০ সালে তিনি আর্মিতে যোগদান করেন। পরে তিনি তুর্কী বর্ডারের কাছে ‘মাকু’ শহরের মেয়র পদে নিযুক্ত হন। ১৯৯০-এর শেষের দিকে ডক্টরেট করা অবস্থায় নতুন প্রদেশ তিনি ‘আরদাবিল’ শহরের গভর্নর পদে নিযুক্ত হন। কিন্তু খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তাকে অপসারণ করা হয়, তাই তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে আসেন। ধীরে ধীরে তিনি হার্ডলাইন রেভুলেশনারি গার্ডের বিশেষ বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব লাভ করেন। এবং এরপরই তিনি রাজনীতিতে তুমুলভাবে আত্মপ্রকাশ করেন।

২০০৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হন তেহরানের। এ-সময় শহরের মিউনিসিপ্যালিটি অফিসগুলোতে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা এলিভেটর স্থাপন, শহরের ট্রাফিক সিস্টেমে পরিবর্তন, গরিবদের জন্য ফ্রি স্যুপের ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে ধর্মীয় মুল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া, তেহরানের ঝাড়ুদারদের সাথে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া এবং সর্বপরি তার অতি সহজ সরল জীবন যাপনের কারণে তিনি আলোচনায় আসেন এবং আস্তে আস্তে ইরানিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

যাইহোক, ২০০৫ সালে আহমাদিনেজাদ ৬২% ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। নির্বাচনী প্রচারণায় তার স্লোগান ছিল— এটা সম্ভব এবং আমরা এটা করতে পারি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি মন্তব্য করেন— ইরানের উন্নতির জন্য যুক্তরাস্ট্রের সাহায্যের কোনও প্রয়োজন নেই। তার এই কথা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত হন। কিপ রিডিং…

ফিলিস্তিনি গল্প— পোস্টারে সেঁটে থাকা সেই মেয়েটি

অথোর- টপিক- লিটারেচার/লিড স্টোরি

মূল— দিমা শাইবানি। ভাষান্তর— মনযূরুল হক


ক্ল্যারিফিকেশন— এ গল্পটি একজন আরব নারীর জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত। এই মহিয়সী নারীর নাম ‘হানা শাইবানি’। ফিলিস্তিন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ প্রথম ইরাকি যোদ্ধা।

হানা শাইবানি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ২৭ আগস্ট। ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাথ পার্টির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে পার্টির মহিলা সদস্যাদের নেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালের দিকে দুর্নীতির ঘটনার প্রতিবাদে তিনি বাথ পার্টি ত্যাগ করেন এবং ইয়াসির আরাফাতসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৭ মার্চ ১৯৭০ সালে তিনি আন্দোলনরত অবস্থায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।


সবাই বলে আমি নাকি আজন্মই খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। আমার নিজের কাছেও তা-ই মনে হয়। গল্প শুনতে সব সময়ই বিশেষ ভালো লাগে আমার। ভালো লাগে শোনাতেও। কিন্তু ভূত-প্রেতের অহেতুক কিসসায় আমার বিরক্তি ভীষণ। শিশুরা কেউ যদি আমার কাছে গল্প শুনতে আসে, তাহলে আমি তাদের সেই সব কাহিনী গল্পের মতো করে সাজিয়ে বলি, যা তাদের মন-মগজকে শুধরে সুস্থ চিন্তার পথ তৈরি করে দেয়।

বহু মনমাতানো গল্পকথা মুখস্ত ছিলো আমার। হয়তো ছেলেবেলায় শুনেছি, অথবা শিশুতোষ বইগুলোতে পড়েছি। কিন্তু এক্ষণে বয়সকালের সব সূত্রাদি ছিঁড়েফুঁড়ে উপর্যুপরি নাবছিলাম একটি স্বপ্ন জাগানিয়া সুরের সন্ধানে। কাউকে শোনাতে নয়, নিজেই স্মরণ করতে চাইছিলাম যে, কী ঘটেছিলো তখন।

আমার চিরদিনের অভ্যাস, ছোট ছোট বিষয় থেকে গল্পের সূত্র খুঁজে বের করা। যেমন, বাড়িতে ভিক্ষুক এসেছে। আমি ভাবতাম, কেনো সে ভিক্ষা করছে। হয়তো তাকেই সেটা জিজ্ঞেস করতাম। অথবা তার পিছু লেগে থাকতাম, তার জীবনের গল্পটা উদ্ধার করার জন্যে। কিংবা হয়তো দেখা যেতো, রাস্তায় একটা চশমা পড়ে আছে। সেই চশমাটা কার হতে পারে, কী করে ফেলে গেলো, এ নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিলো না আমার। সংবাদপত্রের বিজ্ঞপ্তি, বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা উপহার বাক্য, বাড়ির পাশের মরে যাওয়া যাইতুন গাছটার রোপনকর্তা, অথবা পুরোনো সুটকেসে নেকড়ার মতো ময়লা হয়ে থাকা এক খ- কাপড়রই হতে পারতো আমার গল্পের উৎস সন্ধানের বিষয়। বাড়ির মানুষ, পড়শি, স্বজন, পথের অপরিচিত যেই হোক কারো কাছে কোনো গল্প বা ঘটনা জানতে চাইতে আমার কোনো সংকোচ ছিলো না কখনোই। ফলে অল্প বয়সেই নানান গল্পের একটা ভা-ার জমা হয়ে গেছে আমার স্মৃতিতে।

গল্পের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণেই কখনো কখনো একটা গল্পের সঙ্গে আরেকটা গল্পের সূত্র জোড়া লেগে গিয়ে মাঝমধ্যে এমন কিম্ভূত পরিস্থিতিরও উদয় হতো যে, আমি রীতিমতো লজ্জায় পড়ে যেতাম। অনক সময় রাশি রাশি গল্পের স্তূপের তলে চাপা পড়ে থাকা কোনো একটা গল্প মগজ নাড়া দিয়ে যেতো। কিন্তু মাথা থেকে মুখে আনতে গিয়েই লাগতো গোলমাল। অর্থাৎ মাথায় আছে, কিন্তু মনে আসছে না। অথবা মনেও আসছে কিন্তু ধরে রাখতে পারছি না বেশিক্ষণ।

আজো মনে হচ্ছে, তেমন কিছু একটা ঘটেছে। আমি মনে করতে চাইছি। অথচ মনে আসছে না। আবার একটু একটু করে মনে আসছে। কিন্তু মুখে আসছে না। বাসার সামনের দেয়ালে নানুর লাগানো পোস্টারটা দেখে পুরোনো একটা গল্প চাগিয়ে উঠতে চাইছে। বারংবার চোখের পাতায় ভেসে উঠছে তেমনই একটা মলিন পোস্টার। দেয়ালে সাঁটা বিবর্ণ একটা ছবি। তাতে কিছু হরফ, লাল কালিতে লেখা কতগুলো অক্ষর জ¦ল জ¦ল করছে যেনো।

আমি মনে হয় নানুর সাথে কোনো শপিং মলে গিয়েছিলাম সেদিন। কী কী কিনেছিলাম মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে যে, আমাদের কারো হাতে কোনো শপিং ব্যাগ ছিলো না। হয়তো কিছুই কিনি নি। নানুর সাথে ঘুরতে বেড়ানোই উদ্দেশ্য ছিলো শুধু। মনে পড়ছে, নানু আমার হাত ধরে আছেন, আর আমরা এক পা এক পা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছি। শপিংমলের বাইরে এসে আমি নানুর হাতটা ছেড়ে দিলাম। কারণ আমি সেখানের দেয়ালে একটা মেয়ের পোস্টার দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা কিশোরী মেয়ের ছবি আঁকা পোস্টার। সম্ভবত আমার বয়েসিই হবে মেয়েটা।

আশ্চর্য হয়েই পোস্টারটার সামনে দাঁড়ালাম আমি। একটা কিশোরী মেয়ে কী করে এমন একটা পোস্টারে জায়গা করে নিলো ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি। ঈর্ষায় জ্বলে গেলো ভেতরটা। আরো একটু কাছাকাছি হয়ে পোস্টারের লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করলাম আমি। তাতে লেখা ছিলো— “মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্তমূল্য আর কিছুই হতে পারে না।”

অবাক হয়ে গেলাম আমি। আমার মতো একটা মেয়ে কী করে এতো কঠিন কথা বলতে পারে! অনেকগুলো পোস্টার দেয়ালটা জুড়ে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনে ঠাসা দেয়ালটা। তবে সবচে’ সুন্দর ছিলো সম্ভবত এই পোস্টারটাই। একটা নয়, পর পর একসাথে চার-পাঁচটা পোস্টার ছিলো এই একই ছবি আর লেখা দিয়ে তৈরি। কেউ দেখে ফেললে বকবে, সে ভয়ের কথা না ভেবেই একটা পোস্টার টেনে নামিয়ে আনলাম আমি। এবং দুহাতে মুড়ে জামার হাতার ভেতরে লম্বালম্বি ঢুকিয়ে রাখলাম, যেনো হঠাৎ করেই কেউ বুঝতে না পারে যে, আমার কাছে কিছু একটা আছে।

হ্যাঁ, এখন আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে ঘটনাটা। রাতে পড়ার রুমে বসে আমি চুপি চুপি পোস্টারটা বের করে আবার টেবিলে রাখলাম। অথচ সেটা কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। তবু আমার মনে হলো, এটা দেখলে অন্যরা হয়তো অযাচিত ভেবে আমাকে বোকা বলতে পারে। হয়তো আমার ভাইয়েরা হাসাহাসি করবে আর আমার বোকামি সবাইকে বলে বেড়াবে। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলাম পোস্টারের রঙ, ছবি আর লেখাগুলো। হতে পারে তখন কিছু বাদ পড়ে গেছে যা আমার পড়া হয় নি। চারকোণা একটা পোস্টার। চারপাশে সাদা-কালো ডোরাকাটা আল্পনা আঁকা ফ্রেম। ছবিটা পোস্টারের গায়ে কোণাকুণিভাবে লাগানো। মনে হচ্ছে মেয়েটা একটু কাত হয়ে আছে। আর ছবির একেবারে নীচে বড় বড় করে লাল হরফে লেখা— ‘মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্ত মূল্য আর কিছুই হতে পারে না। কিপ রিডিং…

এরদোগান— অ্যা গ্রেট সুলতান

অথোর- টপিক- /লিড স্টোরি/হাইলাইটস

দ্য গ্রেট সুলতান— ০১


কবি এবং ফেরিওয়ালা—এ-দুটির মধ্যে সাজুয্য খুঁজে পাওয়া এবং খুঁজতে যাওয়া অসম্ভব এবং সে-ক্ষেত্রে ব্যক্তি যখন হবেন একজন রাজনীতিক, তখন আপনি বিস্মিত হবেন। হতে চাইবেন। ভেবেও বসবেন, আসলে তিনি কবি নন। তিনি রাজনীতিকই বটেন। হয়তো রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে কিংবা কাউকে ডিকটেশান দিয়ে লিখিয়ে দুয়েকবার কাব্য করেছেন। আমরা আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, অন্তত এরদোগানের বিষয়ে আপনার ভাবনা অমূলক।

এরদোগান শুধু কবি নন, তিনি কবিতার জন্য জেলে খেটেছেন এমন এক সময়ে, যখন তিনি দেশের ক্ষমতাধর একজন। এমনকি তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির তখন জয়জয়কার। ২০০২ সালের নভেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিজয়ী হয়েও এরদোগান প্রধানমন্ত্রী হতে পারছেন না। কারণ, ইস্তাম্বুলের মেয়র থাকা অবস্থায় একটা কবিতা পাঠের অপরাধে তিনি শাস্তি ভোগ করছিলেন। শাস্তির মেয়াদ তখনও পূর্ণ হয় নি।

যদিও ২০০৩ সালের ১৪ মার্চ অবশেষে নানা আইনি জটিলতা পেরিয়ে তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ-জন্য প্রথমে তার দলের সিনিয়র সদস্য এবং পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ গুলকে তার আসন থেকে পদত্যাগ করে সে-আসনে উপনির্বাচনে নিবাচিত হয়ে পার্লামেন্টে আসতে হয়েছে।

আমরা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে, যে-কবিতাটি এরদোগান পাঠ করেছেন, তার রচয়িতা তিনি ছিলেন না। তবে তিনি সেনাবহিনীকে ‘দোয়া’ করার অসিলায় তুর্কি জাতীয়তাবাদী কবি জিয়া গোকাল্পের কবিতাটি পাঠ করেছিলেন দক্ষিণ তুরস্কের জনসভায়। সেদিন ছিলো ১৯৯৭ সালের ১২ ডিসেম্বর। Mosques are our barracks. domes our helmets, minarets our bayonets, believers our soldiers—এই হলো কবিতা। যার তর্জমা করলে দাঁড়ায়— মিনার আমাদের বেয়োনেট, গম্বুজ হেলমেট, মসজিদ আমাদের ব্যারাক, মুমিনরা আমাদের সৈন্য। কবিতার শেষে আবার ‘আল্লাহু আকবার’ শব্দগুচ্ছও আছে। সুতরাং খুবই মুসলমানি কবিতা। এই মুসলমানি ছুৎমার্গ থেকে পবিত্র করার জন্য তুরস্কের সেক্যুলার সরকার তাকে প্রায় অর্ধযুগ কারাপ্রকোষ্ঠো আটকে রাখে ।

মনে রাখা দরকার, শুধু মুসলমান নয়, যদিও সে-দেশের আকছার মুসলমান, তবে ধর্মই তুরস্কের ক্ষমতাসীন মানুষের সবচে’ বড় ভীতি ছিল। নাকি এখনও আছে? কেননা, এরদোগানের দল একেপিকে তুরস্কের সেক্যুলার দল বলেই সে-দেশে গণ্য করা হয়। এবং এরদোগানকে তুরস্কের জাতির পিতা (আতুতুর্ক) মোস্তফা কামাল পাশার উত্তসূরিও ভাবা হয়; যিনি ছিলেন আধুনিক তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি। ১৯২২ সালে অটোম্যান সম্রাজ্যের পতন করে ১৯২৩ সালে সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। সেক্যুলারিজমকে সে-দেশে কামালিজমও বলা হয়। আতুতুর্ক ঘোষণা দিয়েছিলেন— ধর্ম বলতে কিছুই নেই, ধর্ম হলো মানুষকে শাসন করার একটা পদ্ধতি মাত্র। কোনো জাতির উন্নতির জন্য ধর্মমুক্ত হওয়া ছাড়া কোন পথ নেই । তাই আজ থেকে আমার রাষ্ট্রকে ধর্ম মুক্ত হিসাবে ঘোষণা করলাম। কিপ রিডিং…

অসত্য তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াকু মিকদাদ

অথোর- টপিক- /লিড স্টোরি

মুসলিম হিরোজ— ০১


এই যুবকের পুরো নাম মিকদাদ ভার্সি। ভুল আর অসত্য তথ্যের বিরুদ্ধে অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গত বছর (২০১৬) একটি পত্রিকা যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল। ওই খবর চ্যালেঞ্জ করেন মিকদাদ ভার্সি। তার প্রতিবাদে পত্রিকাটি তাদের সংবাদ সংশোধন করতে বাধ্য হয় । তারপর থেকেই মিকদাদ কোমার বেঁধে মাঠে নেমেছেন।

এমনিতে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমগুলো প্রায় প্রতিদিনই ইসলাম কিংবা মুসলিমদের নিয়ে কোনো না কোনো সংবাদ প্রকাশ করে। এসব খবরের কত ভাগ সত্য আর কত ভাগ মিথ্যা, সে বিষয়ে সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব না হলেও বলা যায়— এসব সংবাদের অধিকাংশই ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য নেতিবাচক। সুযোগ পেলেই ‘ইসলাম’ কিংবা ‘মুসলিম’ শব্দগুলো টেনে আনার অভিযোগ আছে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে।

এটাই মিকদাদকে একটি নতুন লড়াই শুরু করার প্রেরণা যুগিয়েছে ।

মিকদাদ প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ দুটির ওপর বিশেষভাবে নজর রাখেন। অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট খবরের সত্যতা না পেলে তিনি প্রতিবাদ করেন এবং সেটি প্রত্যাহার বা সংশোধন করতে বাধ্য করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় গত কয়েক মাসে ২০টি সংবাদের সংশোধনী ছেপেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। তাঁর করা আরও ২০টি অভিযোগ বর্তমানে ‘ইন্ডিপেনডেন্ট প্রেস স্ট্যান্ডার্ড অরগানাইজেশন’-এ সুরাহার অপেক্ষায়। মুসলিমদের জড়িয়ে ভুল বা অসত্য সংবাদ দেখলেই অভিযোগ ঠুকে দেন মিকদাদ।

ভুল ও অসত্যের বিরুদ্ধে মিকদাদের এ কার্যক্রম নিয়ে গত ২২ জানুয়ারি সংবাদ প্রচার করে বিবিসি। দ্য গার্ডিয়ানসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। বিবিসির শিরোনাম ছিলো— ‘কোনো ভুল কোরো না’। আর দ্য গার্ডিয়ান শিরোনাম করে— ‘সংবাদমাধ্যমগুলো মুসলিমদের নিয়ে অসত্য খবর ছেপেই যাচ্ছে’। এ পর্যন্ত ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিকদাদের অন্তত ২০ টিরও অধিক প্রতিবাদী লেখা ছেপেছে :

—Stop using other marginalized groups as an excuse to attack Muslim

—The British media shares the blame for Anjem Choudary’s influence

—Muslims like me are asked the same questions after any terrorist attack. For the record, here are our answer

—Isis battle is only propaganda while PM befriends Saudi extremists কিপ রিডিং…

জেরুসালেম তাহলে কার?

অথোর- টপিক- অপিনিয়ন/লিড স্টোরি/হাইলাইটস

কোনো ধর্মমত বিবেচনায় না এনে যদি প্রশ্ন করা হয়— এই মসজিদটি কার? আপনার বাড়ির পাশে কিংবা আপনার ঘরের কাছেই যে মসজিদটি আছে, যেখানে আপনার বাবা কিংবা দাদার দানকৃত ভূমি রয়েছে, সেটা কি আপনার উত্তরাধিকার? কিংবা ওই মন্দিরটি? সেটাও কি একইভাবে আপনার বন্ধু তন্ময় কিংবা সঞ্জয় তাদের মিরাস সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারে? আপনার শহরে অবস্থিত গির্জাটি নিয়েও কিন্তু আমরা একই প্রশ্ন করতে পারি। হতে পারে এমন প্রশ্নের মুখে আপনাকে কখনও পড়তে হয় নি, কেননা, এভাবে কেউ প্রশ্ন করে না। চমকানো সুন্দর মসজিদ (একইভাবে মন্দির বা গির্জা) হলে হয়তো সর্বোচ্চ জিজ্ঞেস করা হতে পারে— এটা কে করেছে? আপনার জানা থাকলে অবলীলায় বলে দিলেন— শরফুদ্দিন সান্টু ইত্যাদি। তারপরও যদি কেউ আপনাকে এমন বেমক্কা প্রশ্ন করেই বসে, আপনি তাকে হয়তো নাস্তিক ভাববেন, কিংবা ঈমানের জোর বেশি থাকলে বলবেন— কার আবার? আল্লাহর। ভিন্ন ধর্মের হলে বলবেন— মুসলমানদের।

যদিও মসজিদ কারও ব্যক্তিগত সম্পদ হয় না। মসজিদ আল্লাহর ঘর, বাইতুল্লাহর অংশ। যেখানে মসজিদ একবার নির্মিত হয়ে যায়, কেয়ামত দিবস অবধি সেটা আল্লাহর মালিকানায় চলে যায়। তাই যদি কোনো মসজিদে সাধারণের প্রবেশাধিকার না থাকে, তাহলে সেখানটায় জুমাবারের সালাত আদায় হবে না— এ-ই ইসলামের বিশ্বাস। কেননা, মালিক যেহেতু আল্লাহ, সুতরাং আল্লাহর বান্দা হিসেবে সেখানের কর্তৃত্ব সবার সমান, একক কারও হতে পারে না।

সন্দেহ নেই, উপসনালয়ের ব্যাপারে একই ধরনের বিশ্বাস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকেই লালন করে পৃথিবীর তাবৎ ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাদের নিজেদেরই হাতে গড়া এবাদতগাহ নির্মাণের পর আর তাদের নিজেদের থাকে না, সেখানে শুধু তাদের এবাদতেরই অধিকার থাকে, অন্য কিছু নয়। এবাদতের স্থানটুকু ঈশ্বরের নামে প্রদত্ত পবিত্র ভূমি।



ভিয়া ডলোরোসা, যে-পথে নবী ঈসাকে (আ.) নিজের ক্রস বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। ছবি  : সংগৃহীত


একই কথা প্রজোয্য জেরুসালেমের ব্যাপারেও। অন্তত তা-ই হওয়া উচিত। সম্ভবত সব মানুষ সেটা জানেও এবং মানেও। কিন্তু জেরুসালেমের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, অন্য যে-কোনো স্থানের বেলায় যে-ধর্ম যেখানটাকে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে স্বীকৃতি দেয়, সেখানটা শুধু সেই ধর্মের লোকদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে, অন্য ধর্মের লোকেরা অল্প-বিস্তর মতানৈক্য না-থাকলেও শান্তি বজায় রাখার নিমিত্ত সেটা মেনেও নেয়। ছোট ‘পবিত্র ভূমি’ যেমন মসজিদ, মন্দির প্যাগোডা, গির্জা, টেম্পল ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাতে গোণা সামান্য কয়েকটি উদাহরণ বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই আপন আপন ধর্মের লোকেরা আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। একান্ত তীর্থভূমি নিয়েও খুব একটা বিরোধ বাঁধে না। হিন্দুদের কাশি, বৌদ্ধদের শোয়েডগ প্যাগোডা এবং মুসলমানদের মক্কা-মদিনা নিয়ে কোনো উৎপাত নেই। কিন্তু জেরুসালেমের বিপত্তি এখানেই যে, এই একই ‘পবিত্র ভূমি’ যখন বিশ্বের ধর্মের এবং তিনটিই আসমানি ধর্ম— ইহুদি, খ্রিষ্ট ও ইসলাম। এ-কারণেই জেরুসালেম অনন্য। এখানেই সাধারণ যে-কোনো তীর্থভূমি বা পবিত্র ভূমির সঙ্গে জেরুসালেমের তফাত।

অবশ্য এটা ঠিক যে, আমরা কখনও কখনও কয়েকটি ধর্মের উপাসনালায় পাশাপাশি অবস্থান করতেও দেখি। মসজিদের পাশেই গির্জা। গির্জার ঘন্টার ধ্বনি ও মসজিদের আজান ধ্বনি সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মসজিদ কিংবা গির্জাবাসীরা একে অপরের উপাসনালয় দখল করতে যায় না। কিন্তু জেরুসালেমে কী এমন রয়েছে যে, এখানে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীরা কেবল নিজেদের উপাসনালয়ে এবাদত করেই সন্তুষ্ট নয়, বরং এই ভূমিটাই তাদের দখলে রাখতে হবে? অথচ তিন ধর্মই প্রভু হিসেবে আল্লাহকে মান্য করে এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, পবিত্র ভূমির মালিকানা কোনো মানুষের নয়—আল্লাহর। তাহলে দ্বন্দ্বটা কিসের? ঈশ্বরের মালিকানা নিয়ে?

এমনও নয় যে, এই দ্বন্দ্ব দুয়েকবার ঘটেই শেষ হয়েছে। বরং জেরুসালেমের দীর্ঘ ইতিহাসে, শহরটি কমপক্ষে দুইবার ধ্বংস হয়েছে, ২৩ বার অবরোধ হয়েছে, ৫২ বার আক্রমণ হয়েছে এবং ৪৪ বার দখল এবং পুনর্দখল হয়েছে।[1]ধর্মের লড়াইয়ের সাথে সাথে এখানে অধর্মের কাজও যে কম হয়েছে, তা নয়। আজও শহরে কোনো প্রত্নতত্ত্ব সন্ধান করতে গেলেই দেখা যায়, কোনো মসজিদের নীচে ইহুদি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ অথবা কোনো গির্জার নীচে দেখা গেলো মসজিদের চিহ্ন। যদি অধর্মই না হবে, তাহলে রোমান খ্রিষ্টানদের হাতে এই শহর ধ্বংস হবে কেনো? খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভূমি কী করে খ্রিষ্টানদের হাতেই রক্তাক্ত পারে?

বহু জটিলতা আর বহু প্রশ্ন জড়িয়ে আছে জেরুসালেম কার এই প্রশ্নে সাথে। আমরা ইতিহাস ও বর্তমান জেরুসালেমের পবিত্র নিদর্শনগুলো খুঁজতে খুঁজতে সে-সব প্রশ্ন খতিয়ে দেখার প্রয়াস পাবো।

এক. আজ যেখানে জেরুসালেম নামে বিখ্যাত নগরী উপস্থিত, ইতিহাসের প্রারম্ভে, প্রায় ৫০০০ বছর আগে, সেখানে ছিলো একটি ছোট্ট গ্রাম। উঁচুনিচু মরুভূমির অভ্যন্তরে একটি সবুজ উপত্যকার মধ্যে খেজুর ও জলপাই গাছে ঢাকা গ্রামটিতে ঠিক কী ছিলো যা মোজেস, আব্রাহাম, যিশুখ্রিষ্ট (নবী মুসা, ইব্রাহিম ও ঈসা আ.) থেকে মুহাম্মাদ (স.) পর্যন্ত সবাইকে আকর্ষণ করে এসেছে? এখানকার মাটিতে কী আছে যা তিন-তিনটে বিরাট ধর্মের জন্ম দিয়েছে?

শহরের গা ঘেঁষে উঁচু টিলা—মাউন্ট অব অলিভ, জলপাই পাহাড়। মুসলিমরা বলে যাইতুন, কোরআনে এই ফলের কসম খেয়েছেন আল্লাহ। জেরুসালেমসহ এ-অঞ্চলের মানুষের অত্যন্ত্র প্রিয় ও প্রধান খাদ্যেরও একটি অলিভ। এই মাউন্ট অব থেকে সারা জেরুসালেম দেখা যায়। দেখা যায় পাথরে গাঁথা ৫০০০ বছরের পুরোনো শহর (Old City) ও তার মধ্যমণি সোনার পাতে মোড়া ডোম অব রক (Dome of the Rock)। ২০০০ বছর আগে নবী ঈসা (আ.) যখন জেরুসালেম দেখেছেন সেই, কেমন ছিলো শহরটা তখন? হয়তো পুরোনো শহরের আশেপাশে তখন ছিলো শুধু কাঁটাঝোপ। আজকের মতো রাস্তাঘাট, অট্টালিকার চিহ্নও ছিলো না। তখনও কি তিনি জানতেন নিয়তি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ওই জেরুসালেমের মধ্যে দিয়েই ভারি ক্রশ পিঠে চাপিয়ে তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।



৬-নং স্টপ-এ ভেরোনিকা তৃষ্ণার্ত নবী ঈসাকে আ. জল দিতে চেয়েছিলেন। ছবি : সংগৃহীত


কিপ রিডিং…

নবীজিকে (সা.) আমরা কেনো ভালোবাসবো?

অথোর- টপিক- বিলিভারস/হাইলাইটস

আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন— তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ থেকে প্রিয়তর না হবো। [বোখারি, হাদিস ১৫; মুসলিম, হাদিস ৪৪]

আবু হোরাইরা রা. বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন— সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা ও সন্তান থেকে বেশি প্রিয় না হবো। [বোখারি, হাদিস ১৪; নাসায়ি, হাদিস ৫০৩৫]

এই হাদিস দুটি এত স্পষ্ট যে, এর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন— কাজি আয়াজের বক্তব্যে রয়েছে, এটা হলো ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত। [ফাতহুল বারী, খ- ১, পৃষ্ঠা ৫৯] সুতরাং ইসলামের বিধানমতে নবীজিকে ভালোবাসা ফরজ, নবীজির আনুগত্য করা ফরজ। কথা হলো, ভালোবাসা ফরজ— এ-বিষয়টি ইসলামের গতিপ্রকৃতি যার জানা নেই, তার কাছে অদ্ভুত মনে হবে। সন্দেহ নেই, ভালোবাসা হলো একটি মানবীয় আবেগ। আর আবেগ-অনুভূতি কখনো আদেশ-নিষেধের ছাউনিতে দাখিল হয় না। বলতে গেলে কারও ব্যক্তিক ইচ্ছার পরিধিতেও আসে না। এমনকি নবীজি আপন অন্তরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন— হে আল্লাহ, এটা আমার অংশ, যার মালিক তুমি। সুতরাং যার মালিক তুমি, আমি নই, তার ব্যাপারে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না। [দেখুন— লেখকের কৃত ‘যাওয়াইদুস সুনান আলাস সহিহাইন, হাদিস ৪৫০৪] আয়েশা রা. বলেন— এখানে ‘এটা আমার অংশ’ দ্বারা উদ্দেশ্য ‘কলব’।

ভালোবাসার অনুভূতি তো মানুষের ক্ষমতার আওতাধীন কোনো বিষয় নয় যে, তার ওপর সে কর্তৃত্ব খাটাবে; বরং তা মানুষের হৃদয়ে ধীরে ধীরে আসে ইচ্ছার ক্ষেত্রের বাইরে থেকে। একই সাথে শরীয়তও এটা চায় না যে, অন্তরে এটা আদেশের মাধ্যমে আসুক। কেননা, মানুষ অনেক সময়ই আদেশ পালন করে তাকে বাধ্য করা হয় বলে এবং এই দীনের নীতিমালায় বাধ্যবাধকতা বাতিল হিসেবে গণ্য— দীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। [সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৬]

কিন্তু ভালোবাসা হলো, এমন একটা সম্পর্ক, যা মুসলমান এবং নবীর মধ্যে এবং মুসলমান ও তার ধর্মের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করে। তা এমন নিদর্শন, যা এই পদ্ধতিতে সৃষ্টফল ব্যতীত মানুষের সম্পর্ক তা বুঝতে পারে না। [লেখকের কৃত ‘আন আযওয়াই আলা দিরাসাতিস সীরাহ’, পৃষ্ঠা ১৬-১৮]

কিভাবে ভালোবাসা হবে

প্রশ্ন আসে— তা হলে এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা কীভাবে করবো?

কাজি আয়ায রহ. বলেন— ভালোবাসার প্রকৃতি হলো, মানুষ তার অনুকূল বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার অনুকূল বিষয়টা তার জন্যে হয়—

এক. হয়তো প্রাপ্তির মাধ্যমে উপভোগ করার জন্যে। যেমন— সুন্দর চেহারা, চমৎকার কণ্ঠ, সুস্বাদু খাবার ও পানীয় এবং এ-ধরনের বিষয়াবলিকে ভালোবাসা; যার প্রতি সকল সুস্থ-স্বভাব ধাবিত হয়। কেননা, এগুলো তার অনুকূল বিষয়।

দুই. অথবা, তার বিবেকবোধ ও আন্তরিক অনুভূতি অভ্যন্তরীণ অবস্থা উপলব্ধি করে তৃপ্তি পাওয়ার জন্যে। যেমন— সজ্জন, ওলামা, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের ভালোবাসা, যাদের সুন্দর জীবন-কাহিনি ও চমৎকার কৃতকর্মের বিবরণ কিংবদন্তী হয়ে আছে। কেননা, মানুষের স্বভাব এ-জাতীয় লোকদের সম্মোহনে আকৃষ্ট হয়।

তিন. অথবা, তার ভালোবাসাটা কেবলই হবে তাকে কারও অনুগ্রহ ও দান-দক্ষিণা থাকার কারণে। কেননা, অন্তরের স্বভাব হলো, সে তাকেই ভালোবাসবে, যে তার প্রতি অনুগ্রহ করবে।

উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত যখন স্থির হলো, তখন আপনি দেখুন, এই বিষয়গুলি নবী স.-এর ক্ষেত্রেও বিদ্যমান রয়েছে কি না। দেখবেন, ভালোবাসার যে যে তিনটি কারণ রয়েছে তার সবগুলো বৈশিষ্ট্যেরই অধিকারী নবীজি স.।

—দেখুন, বাহ্যিক আকৃতি ও সৌন্দর্যে তিনি অনন্য।

—সচ্চরিত্র ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ ।

—তা ছাড়া দেখুন, উম্মাহের প্রতি তার করুণা ও অনুগ্রহের অবদান, দেখুন তার রহম ও দয়া, উম্মাহকে হেদায়াতের পথ দেখানো, তাদের প্রতি তার সীমাহীন মমতা, জাহান্নাম থেকে তাদের পরিত্রাণের বিষয়টি। যার ফলে কোরআনে বিভিন্ন উদ্ধৃতি এসেছে যে, নিশ্চয় তিনি মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল ও দয়াবান, বিশ^বাসীর জন্যে রহমত, তিনি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এবং তিনি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী তারই নির্দেশে, আর তিনি দীপ্যমান সূর্যালোক।

মুমিনদের প্রতি তার যে অনুগ্রহ, তারচে’ বড় ও মহান অনুগ্রহ কী আছে? যেহেতু, তিনিই হলেন উম্মাহের হেদায়াতের উসিলা, অজ্ঞতা থেকে মুক্তিদাতা, সাফল্যের আহ্বায়ক, প্রতিপালকের সমীপে পৌঁছার মাধ্যম, তাদের সুপারিশকারী ও মুখপাত্র, তাদের সাক্ষী এবং তাদের চিরায়ত আবাস ও চিরস্থায়ী নেয়ামতের ব্যবস্থাপক।

যখন কোনো বাদশাকে তার উত্তম চরিত্রের কারণে, কিংবা কোনো শাসককে তার প্রভাব সৃষ্টিকারী পরিচালনা পদ্ধতির কারণে, অথবা কোনো উপদেশদাতাকে তার জ্ঞান গভীরতা ও উত্তম স্বভাবের কারণে স্বাভাবিকভাবে ভালোবাসা হয়, তাহলে তো নবীজি ভালোবাসা পাবার সর্বোচ্চ অধিকারী এবং হৃদ্যতার সর্বাধিক যোগ্য। কেননা, এই সকল সদগুণ ও স্বভাব-প্রকৃতির চূড়ান্ত স্তর ও পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে বিরাজমান ছিলো, তাতে সন্দেহের লেশমাত্র কারও নেই। [কাজি আয়ায কৃত ‘আশ-শিফা’, খ- ২, পৃষ্ঠা ৫৭৯-৮১] কিপ রিডিং…

কবি সাইদ সারমাদ : এখনো বেঁচে আছেন!

অথোর- টপিক- লিড স্টোরি/

উপমহাদেশে এক মহাবিস্ময় ছিলেন সারমাদ। কবিতা লিখেছেন, তবে কবিদের মতো ছিলেন না মোটেই। বিবস্ত্র হয়ে ঘুরে বেড়াতেন, অথচ ধর্মের আলখেল্লা জড়ানো সূফিরা তাকে নমস্কার জানাতে কুণ্ঠিত হতো না।


বেঁচে থাকার প্রশ্নটা এলো– কারণ সারমাদকে মারার চেষ্টাটাই হয়েছে সবচে’ বেশি। রাজার কালহাত পড়েছে কবির মাথায়। তারপরও কি বেঁচে থাকা যায় ? সারমাদকে মারতে কোন আয়োজন বাদ রেখেছেন আওরঙ্গজেব ? রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী (ইতিহাস তো সেটাই বলে) ভাইকে হত্যা করেছেন তিনি; কেননা, সে সারমাদের ভীষণ ন্যাওটা ছিলো। নেংটা বাবা তো সারমাদ আগেই ছিলেন, এর ওপর এবার কলঙ্ক রটলো যে, সারমাদ আসলে মুসলিম নয়। তাতে কি ! মুসলিম হতে বয়েই গেছে সারমাদের ! কিন্তু সারমাদ যেহেতু কবি, তাই কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি তার অভিব্যক্তি জানালেন অকপটে–

ও রাজা, শোনো, নেংটা আমি বটে, কিন্তু অসাধু নই তোমার মতো

মসজিদেও যেতে পারি চাইলে কিন্তু তোমার মতো মুসলিম হয়ে নয়

উপমহাদেশে এক মহাবিস্ময় ছিলেন সারমাদ। কবিতা লিখেছেন, তবে কবিদের মতো ছিলেন না মোটেই। বিবস্ত্র হয়ে ঘুরে বেড়াতেন, অথচ ধর্মের আলখেল্লা জড়ানো সূফিরা তাকে নমস্কার জানাতে কুণ্ঠিত হতো না। তিনি হিন্দুদের কাছেও গর্বের ধন বলে বিবেচিত হতেন। অথচ তার পরিচয়ের সূত্র খুঁজতে গেলে বেড়িয়ে আসে, তিনি ছিলেন মূলত আর্মেনিয়ান ইহুদি। ১৬৬১ সালে যখন বাদশা আওরঙ্গজেব তাকে মৃত্যুদ- দিলেন, তারপর  থেকে অন্তত ৩৫০ বছর সারমাদকে এমনভাবে ‘নীলকুঠির চুনের গুদামে’ পুরে রাখা হয় যে, কর্পোরেট লেখকেরা কষ্ট করে তার দেহখানি আর তুলে আনার হিম্মতও পাচ্ছিলেন না। সন্দেহ নেই, আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম কিংবা বেদীন সব ঐতিহাসিকেরা কমবেশি আওরঙ্গজেবের ভক্ত আছেন। তারও সঙ্গত কারণ আছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই অর্থেই আওরঙ্গজেব ভারতবর্ষকে একটা বিত্ত-বৈভবের স্থানে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। সতেরো শতাব্দিতে পুরো দুনিয়ার মোট জিডিপির চার ভাগের এক ভাগ (৩৭০ বিলিয়নের মধ্যে ৯১ বিলিয়ন) আয় ছিলো তখন ভারতের। বাদশাও এই সুযোগটি যথার্থই ব্যবহার করেছেন। নিজের পিতাকে বন্দি রাখা, ভাইদের হত্যা করা এবং সবশেষে সারমাদের মতো মহাপুরুষকে মৃত্যুদ- দেয়ার পাপ তিনি ঢাকতে চেয়েছেন নিজের সব উন্নতির নেমক ছড়িয়ে। তাই আওরঙ্গজেবে মূর্চ্ছিত ঐতিহাসিকেরা যথেচ্ছা গুণগান গেয়ে সারমাদকে সযত্নে ছেঁটে ফেলে দিয়েছেন তাদের ইতিহাস থেকে। কিপ রিডিং…

তৃষ্ণা ও ইবনে সিনা

অথোর- টপিক- /হাইলাইটস

ইবনে সিনা কি সত্যিই বাল্যকালে ডাক্তার হতে চেয়েছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ইতিহাস তার জীবন সম্পর্কে যেসব তথ্য উগড়ে দেয়, তা থেকে মনে হয় না যে, চিকিৎসা শাস্ত্র তাকে কোনোরূপ সম্মোহিত করেছিলো, অন্তত তৃষ্ণার্ত হৃদয় যতদিন বেঁচে ছিলো, তত দিন নয়। তবে হয়তো খ্যাতিই তাকে এ বিষয়ে সিংহভাগ সময়ে উদ্বুদ্ধ করেছে।


নিরীক্ষা অনেক তথ্য উস্কে দেয়। হতে পারে হোসাইনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্বন্ধ আছে, ধর্মেরও আছে। ধর্মের সঙ্গে কি বিজ্ঞানের সংঘর্ষ আছে ? থাকাটা সম্ভব ? — এ এক আজগুবি প্রশ্ন। তবু জেগে ওঠে। গবেষণা কি অধর্মকে গুরুত্ব দেয়? প্রবৃত্তি যে মানুষকে কত সাত-সতেরর কূলে নিয়ে যায়, বোঝা দায়। কৃষ্ণাঙ্গ বারাক হোসাইন যেমন এ সময় ক্ষমতার জোরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, যদিও সেই শব্দটাকে লুকিয়ে ফেলতে হয়েছে। মধ্যযুগে সেরকম আরেক হোসাইন বিশ্বকে তোলপাড় করে দিয়েছিলেন। অনেকগুলো সাজুয্যের ফলেই বিষয়টা আলোচনায় আনা হলো। কৃষ্ণাঙ্গ কেন তার নামের মধ্যাংশ থেকে হোসাইন শব্দটাকে ছেটে ফেললেন ? ক্ষমতার জন্য, নাকি ধর্মের ছোঁয়া থেকে বাঁচতে ? আর মধ্যযুগের সেই আলোড়ন তোলা ব্যক্তিত্বইবা কেন হোসাইন নামে পরিচিত হলেন না, ধর্ম আর ক্ষমতা কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে ছিলো— তারপরও? তবুও তো আজো, হাজার বছর পরেও কিংবদন্তির প্রতীক হয়ে প্যারিস ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগের ধার্মিক হোসাইন, হোসাইনের ভাস্কর্য-মূর্তি, অথবা হোসাইনের অবদান আর কীর্তি। যারা তাকে ডাকে ‘এভি সিনা’ (Avicenna) নামে। আমরা বলি ইবনে সিনা। ইতিহাসও তাকিয়ে দেখেছে— আঁধার পথে কৃষ্ণাঙ্গ কতদূর যেতে পারে।

হতে পারে আরব্য রীতিতে তার পুরো নাম আবু আলী হোসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা। সে বিবেচনায় হোসাইনের প্রপিতামহ হলেন সিনা। পারস্যেও এভাবে পূর্বপুরুষের সঙ্গে সংযোগ রাখার নজির আছে বটে। তাই হয়তো তিনি সে যুগে ইবনে সিনা হিসেবে প্রসিদ্ধি পেতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেছিলেন। যদিও ইতিহাস এ বিষয়ে মুখ ফুটে কথা কয় নি। কিপ রিডিং…

ইয়াসির আরাফাত : দেশহীন ইতিহাসের নায়ক

অথোর- টপিক- /হাইলাইটস

বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা মানে আমাদের মুক্তি ও স্বাধীনতা; আমি আপনাদের আনন্দ আমাদের আনন্দ বলেই অনুভব করি— একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বড় সমর্থক ইয়াসির আরাফাত ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এই বক্তব্য দিয়েছিলেন স্বাধীনতা দিবসের মার্চপাস্টে অভিবাদন গ্রহণকালে। তার আগের দিন ২৫ মার্চ স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশে আসেন তিনি । আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আমন্ত্রণে আরেক কিংবদন্তী নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে। ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ। পরদিন ২৭ মার্চ তিনি উদ্বোধন করেন স্বাধীনতা স্মারক ‘শিখা চিরন্তন’ ও মুক্তিযুদ্ধ স্তম্ভ। আজীবন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু এই মহান নেতা একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেন বটে, বহুবার যাত্রা বিরতিও করেছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, কিন্তু এবারের পরে মৃত্যুপর্যন্ত আর এদেশে আসার সুযোগ হয় নি তার। ১৯৭৮ সালে চিন সফরের সময় তিনি বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করলে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন।[1]


পত্র-পত্রিকা বলে— আরাফাতের জন্ম মিশরের কায়রোতে। কিন্তু আরাফাতের আমৃত্যু দাবি ছিলো— তিনি জন্মেছেন জেরুজালেমে জলপাই বনের ছায়াঘেরা তার মাতৃভূমিতে।


সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের সেই অনুষ্ঠানে সেদিন কয়েক লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছিলো। তারা কি আরাফাতকে দেখতে আর তার কথা শুনতে এসেছিলেন? কেমন ছিলেন তিনি? ইতালির বিখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি আরাফাতের অফিসে সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরে এসে সেই বিবরণ দিয়েছেন সমালোচকের ভঙ্গীতে— একেবারে কাঁটায় কাঁটায় যখন তিনি এলেন, মুহূর্তের জন্যে আমি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে বললাম— না, এ তিনি হতেই পারেন না। তাকে বেশ তরুণ মনে হচ্ছিলো; অতি সাধারণ। অন্তত: প্রথম দৃষ্টিতে তার মধ্যে এমন কিছু দেখলাম না, যাতে তাকে কতৃত্বের অধিকারী মনে হয়। তার গোঁফ লক্ষ্যণীয়; পুরু এবং সকল আরবের গোঁফের মতোই। কাঁধে ঝুলানো রাইফেল, যা তিনি কখনো খুলে রাখেন না। নিশ্চয় তার খুব প্রিয়। কিছুটা হাস্যকর। উচ্চতায় তিনি বেশ খাটো। আমার মনে হয় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। হাত, পা ছোট ছোট, বিশেষ করে মাংসল পা, গুরু নিতম্ব, স্ফীত উদরসহ দেহের ভার রক্ষার পক্ষে বেশ ছোট।

এসব কিছুর উপরে একটা ছোট মাথা। মুখটা যেন ফ্রেমে বাঁধা এবং মুখ দেখেই কেউ বুঝতে পারবে— এই তিনি। ইয়াসির আরাফাত। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত গেরিলা। বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। অন্ধকারে হাজার মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়ার মতো মুখ। একজন অভিনেতার মুখ। শুধু তার শত্রু মোশে দায়ানের এক চোখের আবরণীর মতো তার কালোচশমার কারণেই যে তিনি সবার থেকে ব্যতিক্রম, তা নয়; বরং ব্যতিক্রম তার মুখোশের জন্য। এজন্য তাকে মনে হয় শিকারী পাখি বা ক্রুদ্ধ মোষের মতো।

তার গাল নেই, কপাল নেই। সবু কিছু লাল, পুরু ঠোঁটের সাথে একটা বিরাট মুখম-লে একাকার হয়ে গেছে। একটা উগ্র নাক এবং কালো কাচে আবৃত চোখ দুটো কাউকে সম্মোহিত করবে। এই চোখে তিনি আমাকে দেখছেন, কিছুটা অবচেতনভাবে। নরম ও আদুরে গলায় ইংরেজিতে উচ্চারণ করলেন— ‘গুড ইভনিং। দু’মিনিটের মধ্যে আপনার সাথে বসবো।’ তার কণ্ঠ কিছুটা রমণীয়।

.. কেউ যদি তার পরিচয় না জানে, তাহলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাববে শুধু দেহরক্ষীর কারণে। আমার সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট ছিলো রাত দশটায়।.. নির্ধারিত কক্ষে কয়েকটা চেয়ার, একটা টেবিল। ইয়াসির আরাফাত তার স্বয়ংক্রিয় রাইফেলটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন প্রদর্শনীমূলক ভঙ্গীমায়। সাদা দাঁতে হাসি ছড়িয়ে বসলেন।..[2]

এই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের মার্চে জর্দানের রাজধানী আম্মানে। কিপ রিডিং…

পতাকার সাতকাহন

অথোর- টপিক- ফিচার/লিড স্টোরি

২৩ মার্চ জাতীয় পতাকা দিবস। বিশেষ এই দিবস উপলক্ষে আমাদের বিশেষ আয়োজন- পতাকার সাতকাহন। লিখেছেন মনযূরুল হক


শুরুতেই একটা গল্প বলি। একটি দেশের গল্প। অনেক অ-নে-ক দিন আগের কথা। প্রায় সত্তর বছর! চমৎকার একটা দেশ। সুন্দর একটি পতাকা আছে তার। সেই পতাকার জমিন সাজাতে আকাশ থেকে ছিনিয়ে আনা হল একফালি চাঁদ। তারপর…কেটে গেলো বহুদিন। কিন্তু কোথায় যেনো একটু অপূর্ণতার আড়ালে মলিন হয়ে থাকে চাঁদের পৃথিবী। কিছুতেই যেনো তাল মিলছে না। দেশের শিল্পী-আঁকিয়েরা ভেবে বললেন, একটা তারকার অভাবেই চাঁদকে বেমানান লাগে। রাজা শুনলেন এবং বুঝলেন। হুকুম দিলেন চাঁদের কোলে একটি শুভ্র তারকা বসিয়ে পতাকার জমিন যথার্থ সুন্দর করা হোক। হ্যাঁ, তাই হয়েছে। আর এর ফলেই সেদেশের পতাকা হয়েছে, সুন্দর। ভয়াবহ সুন্দর।

এই সুন্দর পতাকার অধিকারীরা একবার এক কা- করে বসল। কেউ জানে না, সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন। এমন সময় নিজেদেরই পূর্বদিকের একটি ভূখণ্ডের ওপর বড়ই নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। সুন্দরের ভেলকিতে চেতনাহীন মানুষ জেগে উঠতে উঠতেই নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে তাদেরকে অভিনব কৌশলে। সঙ্গে সমান তালে চলতে থাকে মানবীদের অঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইজ্জতের লুণ্ঠন। কেন? এর উত্তর পেতে সময় লেগেছে দীর্ঘ নয়টি মাস। হয়তো তারা ভেবেছিলো, তারা পশ্চিমের আর তাদের পতাকা সুন্দর বলে সবকিছুকেই সুন্দর মেনে নেবে সবাই। তাদের শোষণ, তাদের অধিকার হরণ, তাদের ভাষা, তাদের জাতীয়তা- সব।

এই অনধিকার বলপ্রয়োগ, এই অমানবিক সৌন্দর্যবোধের বিরুদ্ধে বেঁকে বসেছিলো তাদেরই অপর অংশ, পূর্বভূখণ্ড; চাঁদ-তারা খচিত সুন্দর পতাকায় যাদেরও অংশ ছিলো। তাই নিদারুণ মাশুল গুণতে হয় ‘অসুন্দর’ বলে দমিয়ে রাখা এই ভূখ-ের মানুষকে।

তারপর, কী হয়! তা বোধ হয় আর না বললেও চলে। অবিকল্পিত যুদ্ধ। সেই নয় মাস। যদিও সে দীর্ঘ সময়ে কেবল অন্ধকার ছেয়ে থাকা রাতই এসেছিলো। আর রাতগুলোতে অনেকবার চাঁদও উঠেছে আকাশে। তারাও ছড়িয়েছে জোছনা। তবু নয়মাস পর দেখা গেলো সে দেশের গল্পের যবনিকা হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে অন্য এক দেশের গল্পকথা।

কেননা, রাতের দীর্ঘপথ পেরিয়ে সূর্যের উদয় হয়েছে ততদিনে। প্রভাতের রক্তরাঙা সূর্য। সেই নতুন দেশের জন্যও একটি পতাকার প্রয়োজন ছিলো। তবে না, সেই দেশের পতাকাটি আকাশ থেকে কেড়ে আনা তারায় সাজানো হয় নি। বাঁকা চাঁদ বসিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানোর চেষ্টাও করা হয়নি। সেই দেশের পতাকা তৈরি হল সবুজ ঘাসের মধ্যে রক্তলাল একটি বড় বৃত্ত দিয়ে। এই বৃত্তটা কেন? এটা হলো নয়মাস ধরে ক্ষরিত রক্তের রঙ এবং পূবাকাশের সূর্য। কেন পূবাকাশের সূর্য? কারণ, পশ্চিম দেশের লোকেরা যদি পশ্চিমাকাশের প্রথম উদিত হওয়া ক্ষীণ চাঁদ কেড়ে নিয়ে ওদের পতাকায় বসিয়ে দিতে পারে, তবে তারা কেন পূব দেশের মানুষ হয়ে ভোরের উদীয়মান পূবাকাশের সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে পারবে না? হ্যাঁ, পেরেছে তারা। তারা মানে কিন্তু আমরা। আমরা মানে কিন্তু বাংলাদেশিরা। মানে যারা পশ্চিম পাকিস্তানের চাঁদ-তারার বিরুদ্ধে লড়াই করে লাল-সবুজের পতাকার স্বত্ব পেয়েছি, তারা। তাইতো আজ আমাদের পতাকা আরো সুন্দর। আরো মর্মস্পর্শী। চাঁদের চেয়ে অনেক বেশি আলোময়। পতাকার যেহেতু এত হেতু, তাহলে আজ পতাকা নিয়েই কথা হোক।
কিপ রিডিং…

গো টু টপ