Daily archive

December 31, 2017

ফিলিস্তিনি গল্প— পোস্টারে সেঁটে থাকা সেই মেয়েটি

অথোর- টপিক- লিটারেচার/লিড স্টোরি

মূল— দিমা শাইবানি। ভাষান্তর— মনযূরুল হক


ক্ল্যারিফিকেশন— এ গল্পটি একজন আরব নারীর জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত। এই মহিয়সী নারীর নাম ‘হানা শাইবানি’। ফিলিস্তিন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ প্রথম ইরাকি যোদ্ধা।

হানা শাইবানি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ২৭ আগস্ট। ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাথ পার্টির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে পার্টির মহিলা সদস্যাদের নেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালের দিকে দুর্নীতির ঘটনার প্রতিবাদে তিনি বাথ পার্টি ত্যাগ করেন এবং ইয়াসির আরাফাতসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৭ মার্চ ১৯৭০ সালে তিনি আন্দোলনরত অবস্থায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।


সবাই বলে আমি নাকি আজন্মই খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। আমার নিজের কাছেও তা-ই মনে হয়। গল্প শুনতে সব সময়ই বিশেষ ভালো লাগে আমার। ভালো লাগে শোনাতেও। কিন্তু ভূত-প্রেতের অহেতুক কিসসায় আমার বিরক্তি ভীষণ। শিশুরা কেউ যদি আমার কাছে গল্প শুনতে আসে, তাহলে আমি তাদের সেই সব কাহিনী গল্পের মতো করে সাজিয়ে বলি, যা তাদের মন-মগজকে শুধরে সুস্থ চিন্তার পথ তৈরি করে দেয়।

বহু মনমাতানো গল্পকথা মুখস্ত ছিলো আমার। হয়তো ছেলেবেলায় শুনেছি, অথবা শিশুতোষ বইগুলোতে পড়েছি। কিন্তু এক্ষণে বয়সকালের সব সূত্রাদি ছিঁড়েফুঁড়ে উপর্যুপরি নাবছিলাম একটি স্বপ্ন জাগানিয়া সুরের সন্ধানে। কাউকে শোনাতে নয়, নিজেই স্মরণ করতে চাইছিলাম যে, কী ঘটেছিলো তখন।

আমার চিরদিনের অভ্যাস, ছোট ছোট বিষয় থেকে গল্পের সূত্র খুঁজে বের করা। যেমন, বাড়িতে ভিক্ষুক এসেছে। আমি ভাবতাম, কেনো সে ভিক্ষা করছে। হয়তো তাকেই সেটা জিজ্ঞেস করতাম। অথবা তার পিছু লেগে থাকতাম, তার জীবনের গল্পটা উদ্ধার করার জন্যে। কিংবা হয়তো দেখা যেতো, রাস্তায় একটা চশমা পড়ে আছে। সেই চশমাটা কার হতে পারে, কী করে ফেলে গেলো, এ নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিলো না আমার। সংবাদপত্রের বিজ্ঞপ্তি, বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা উপহার বাক্য, বাড়ির পাশের মরে যাওয়া যাইতুন গাছটার রোপনকর্তা, অথবা পুরোনো সুটকেসে নেকড়ার মতো ময়লা হয়ে থাকা এক খ- কাপড়রই হতে পারতো আমার গল্পের উৎস সন্ধানের বিষয়। বাড়ির মানুষ, পড়শি, স্বজন, পথের অপরিচিত যেই হোক কারো কাছে কোনো গল্প বা ঘটনা জানতে চাইতে আমার কোনো সংকোচ ছিলো না কখনোই। ফলে অল্প বয়সেই নানান গল্পের একটা ভা-ার জমা হয়ে গেছে আমার স্মৃতিতে।

গল্পের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণেই কখনো কখনো একটা গল্পের সঙ্গে আরেকটা গল্পের সূত্র জোড়া লেগে গিয়ে মাঝমধ্যে এমন কিম্ভূত পরিস্থিতিরও উদয় হতো যে, আমি রীতিমতো লজ্জায় পড়ে যেতাম। অনক সময় রাশি রাশি গল্পের স্তূপের তলে চাপা পড়ে থাকা কোনো একটা গল্প মগজ নাড়া দিয়ে যেতো। কিন্তু মাথা থেকে মুখে আনতে গিয়েই লাগতো গোলমাল। অর্থাৎ মাথায় আছে, কিন্তু মনে আসছে না। অথবা মনেও আসছে কিন্তু ধরে রাখতে পারছি না বেশিক্ষণ।

আজো মনে হচ্ছে, তেমন কিছু একটা ঘটেছে। আমি মনে করতে চাইছি। অথচ মনে আসছে না। আবার একটু একটু করে মনে আসছে। কিন্তু মুখে আসছে না। বাসার সামনের দেয়ালে নানুর লাগানো পোস্টারটা দেখে পুরোনো একটা গল্প চাগিয়ে উঠতে চাইছে। বারংবার চোখের পাতায় ভেসে উঠছে তেমনই একটা মলিন পোস্টার। দেয়ালে সাঁটা বিবর্ণ একটা ছবি। তাতে কিছু হরফ, লাল কালিতে লেখা কতগুলো অক্ষর জ¦ল জ¦ল করছে যেনো।

আমি মনে হয় নানুর সাথে কোনো শপিং মলে গিয়েছিলাম সেদিন। কী কী কিনেছিলাম মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে যে, আমাদের কারো হাতে কোনো শপিং ব্যাগ ছিলো না। হয়তো কিছুই কিনি নি। নানুর সাথে ঘুরতে বেড়ানোই উদ্দেশ্য ছিলো শুধু। মনে পড়ছে, নানু আমার হাত ধরে আছেন, আর আমরা এক পা এক পা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছি। শপিংমলের বাইরে এসে আমি নানুর হাতটা ছেড়ে দিলাম। কারণ আমি সেখানের দেয়ালে একটা মেয়ের পোস্টার দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা কিশোরী মেয়ের ছবি আঁকা পোস্টার। সম্ভবত আমার বয়েসিই হবে মেয়েটা।

আশ্চর্য হয়েই পোস্টারটার সামনে দাঁড়ালাম আমি। একটা কিশোরী মেয়ে কী করে এমন একটা পোস্টারে জায়গা করে নিলো ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি। ঈর্ষায় জ্বলে গেলো ভেতরটা। আরো একটু কাছাকাছি হয়ে পোস্টারের লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করলাম আমি। তাতে লেখা ছিলো— “মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্তমূল্য আর কিছুই হতে পারে না।”

অবাক হয়ে গেলাম আমি। আমার মতো একটা মেয়ে কী করে এতো কঠিন কথা বলতে পারে! অনেকগুলো পোস্টার দেয়ালটা জুড়ে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনে ঠাসা দেয়ালটা। তবে সবচে’ সুন্দর ছিলো সম্ভবত এই পোস্টারটাই। একটা নয়, পর পর একসাথে চার-পাঁচটা পোস্টার ছিলো এই একই ছবি আর লেখা দিয়ে তৈরি। কেউ দেখে ফেললে বকবে, সে ভয়ের কথা না ভেবেই একটা পোস্টার টেনে নামিয়ে আনলাম আমি। এবং দুহাতে মুড়ে জামার হাতার ভেতরে লম্বালম্বি ঢুকিয়ে রাখলাম, যেনো হঠাৎ করেই কেউ বুঝতে না পারে যে, আমার কাছে কিছু একটা আছে।

হ্যাঁ, এখন আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে ঘটনাটা। রাতে পড়ার রুমে বসে আমি চুপি চুপি পোস্টারটা বের করে আবার টেবিলে রাখলাম। অথচ সেটা কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। তবু আমার মনে হলো, এটা দেখলে অন্যরা হয়তো অযাচিত ভেবে আমাকে বোকা বলতে পারে। হয়তো আমার ভাইয়েরা হাসাহাসি করবে আর আমার বোকামি সবাইকে বলে বেড়াবে। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলাম পোস্টারের রঙ, ছবি আর লেখাগুলো। হতে পারে তখন কিছু বাদ পড়ে গেছে যা আমার পড়া হয় নি। চারকোণা একটা পোস্টার। চারপাশে সাদা-কালো ডোরাকাটা আল্পনা আঁকা ফ্রেম। ছবিটা পোস্টারের গায়ে কোণাকুণিভাবে লাগানো। মনে হচ্ছে মেয়েটা একটু কাত হয়ে আছে। আর ছবির একেবারে নীচে বড় বড় করে লাল হরফে লেখা— ‘মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্ত মূল্য আর কিছুই হতে পারে না। কিপ রিডিং…

গো টু টপ