Tag archive

ইবরাহিম নাসরুল্লাহ

ফিলিস্তিনি গল্প— শোধ


মূল— ইবরাহিম নাসরুল্লাহ। ভাষান্তর— মিরাজ রহমান


বড় বেশি রকম পীড়াপীড়ি করছে নিয়াজ। রামাল্লায় আজ তাকে যেতেই হবে। কারোরই নিষেধ শুনছে না সে। বাবা নিষেধ করছে, মাতা বাধা দিচ্ছে কিন্তু কারো কোনো কথাই আজ শুনছে না নিয়াজ। মানছে না কারো কোনো নিষেধই। পরিস্থিতি মোটেও অনুকূলে নয়, মিলিটারি চেকপয়েন্ট, হয়রানি, কষ্টকর যাত্রা কিংবা হঠাৎ গুম হয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। তবুও  নিয়াজ  বললো, রামাল্লায় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। দ্রুত সেটার সমাধান প্রয়োজন। যেভাবেই হোক আজকের মধ্যে রামাল্লায় আমাকে পোঁছতেই হবে। আর রাস্তার এসব কষ্ট, হয়রানি এবং এইসব অপমান— এতো আর নতুন কিছু নয়। হয়রানিকর এসব অস্বাভাবিকতাকে আমাদের জন্য স্বাভাবিক করে দিয়েছে ইসরায়েলিরা। অস্বাভাবিককতাকে মেনে নিয়ে জীবন তো আর থেমে থাকতে পারে না। কী আর করবো আমার? মৃত্যু না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলতে হবে আমাদের, সম্মুখ পানে। জীবন যাপনের দিকে। আরো অনেক সামনে আমাদের গন্তব্য। এভাবে ঘরে বসে থাকলে তো আর সমাধান কিছু হবে না। কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সামনে এগিয়ে চলতে হবে এবং সমস্যার সামাধান করতে হবে। আর এভাবেই এগিয়ে চলে একটি জীবন। ধীরে ধীরে এবং ধাপে ধাপে।

সবার কথা অমান্য কপর রামাল্লায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে এসে বসলো নিয়াজ। রামাল্লায় আজ তাকে যেতেই হবে। বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে আজ সে রামাল্লায় পৌঁছাতে না পারলে। তাই সেখানে যেতে তাকে হবেই— সোজা পথে হোক কিংবা বাঁকা পথে। গাড়িতে চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে অথবা হামাগুড়ি দিয়ে— যে কোনো উপায় অবলম্বনে হোক যেতে আজ তাকে হবেই হবে। গাড়িতে আরো অনেক যাত্রী রয়েছে তার মতো। কেউ রামাল্লায়, কেউ বা অন্য কোথার যাত্রী। গাড়ি চলছে বিভিন্নভাবে, নানা উপায়ে— কখনো পিচঢালা পথ বেয়ে, কখনো বা পাথুরে রাস্তায়। এলোমেলো ভাবে এগুচ্ছে নিয়াজদের গাড়ি।

লোকজন সবাই বিকল্প পথ খুঁজছে। চেকপয়েন্টের হয়রানি, হুমকি-ধমকি, নিদারুন শান্তি এবং মানসিক দুর্দশা এড়াতে চোরাপথে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে সবাই। বর্তমান কালের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা পিঁপড়ার দলের মতো অনেকটা। যখন পিঁপড়াদের ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে যায়, নষ্ট করে ফেলা হয় তাদের আবাসস্থল, তখন তারা বিকল্প আবাসন তালাশ করে। নতুন পথ আবিস্কার করে। দিনের পর দিন নতুনভাবে কাজ করে তারা। মাটির কণা-গুঁড়ি বয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে বহুদূরে। ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করে চলাচলের জন্য। পাথুরে জমিনে কিংবা আরো ভয়াবহ কোনো জমিনই আটকাতে পারে না আবাসনহারা এই সব পিপিলিকার দলকে। হয়তো আবার এক মিনিট পড়েই ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অন্য কারো ভুলে ভেঙ্গে যাবে তাদের এই নতুন আয়োজনও। তাই বলে কি থেমে থাকে পিঁপড়ারা। না, থেমে থাকে না তাদের জীবন, চলাচল। আবার শুরু হয় কাজ। আবার নির্মিত হয় বিকল্পধারা। নতুন আবাসন। নতুন ঘর-বাড়ি। নতুন রাস্তা-মোড়। ফিলিস্তিনি মানুষগুলোর অবস্থা এখন বলতে গেলে অনেকটাই পিঁপড়ার জীবন। নিত্য নতুন বিকল্প খুঁজতে হয় তাদেরকে। জীবন যাপনের বিকল্প, চলাচলের বিকল্প এবং আরো কত কি!

ধুলোয় ভরা পথ দিয়ে সামনের এগুতে থাকে মানুষগুলো। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যে কোনো কিছুতে চড়তে রাজি তারা— হাঁটবে সোজা পথ ধরে কিংবা চড়বে পাথুরে ভূমিতে। গাদাগাদি করে বসবে একই গাড়িতে অথবা উঠবে কোনো মাটির প্রাচীরের বেয়ে— মোট কথা বিকল্প পথের অসহ্য ভোগান্তি সহ্য করাটাই এখন ফিলিস্তিনিদের নতুন এক বিকল্প জীবন। হঠাৎ হয়ত বা একটি ভুলডোজার এসে ভেঙ্গে দিবে তাদের বিকল্প পথচলা। কালো কালো পি-গুলো দ্বারা বন্ধ করে দেয় হবে রাস্তা। তারপর শুরু হবে আবার পথ খোঁজা। নতুন বিকল্প পথ আবিস্কার করা এবং সামনে এগিয়ে চলা। নতুন নতুন বিকল্প পথ আর পথচলার অনেক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে এই মাটিতে। কতো ইতিহাস রচিত হচ্ছে এবং আরো কত ইতিহাসের জন্ম ঘটবে— কোনো সীমারেখা নেই তার। এককথায়, অসীম দৃঢ়তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি— বর্তমান ফিলিস্তিন। কিপ রিডিং…

ফিলিস্তিনি গল্প— ছয় ওয়াক্ত নামাজ


মূল— ইবরাহিম নাসরুল্লাহ । ভাষান্তর— মিরাজ রহমান


সময় তখন দুপুর ২টা বেজে ৩০ কিংবা ৩৫ মিনিট হবে। অজু করার জন্য পানি খুঁজছে আলিফ। বাথরুমে জমিয়ে রাখা পানিও প্রায় শেষ। একটু আগেও একবার অজু করেছিলো সে যোহরের নামাজ আদায় করার জন্য। এখন সে আবার অজু করবে। আবার অজু করার একটি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এখন। কিন্তু কি সে প্রয়োজন!

আলিফের ছোট বোন শাহেদা জিজ্ঞেস করলো। এই মাত্র না তুমি নামাজ আদায় করে ফিরলে ভাইয়া? আবার অজু করবে কেন তুমি এখন? বার বার অজু করার মতো অত পানি কী এখন আছে আমাদের?

ছোট্ট বোনের অবুঝ মনের প্রশ্ন। যৌক্তিক আবদার। শুধু গাজা এলাকা নয়- সব ফিলিস্তিনিরাই এখন সর্ব সঙ্কটে দিন কাটান। নেই পর্যাপ্ত পানি, নেই কোনো জীবনের আস্থা। অজুর পর অজু করার মতো অবস্থা এখন আর ফিলিস্তিনে নেই। আজকের ফিরিস্তিন। গতকালও যে এলাকাটি নবিদের পদভারে আলোড়িত ছিলো।

আলিফ ভাবলো ওর এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আবার আসল কথাটি বলতেও চাইলো না সে।

আলিফ— আছে আপু মনি। এখন একটি আমল আছে আমার। অজু ছুটে গেছে তো তাই আবার অজু করে আমলটি করতে হবে। পানি কম বলে তো আর বিনা অজুতে আমল করা যাবে না শাহেদা!

শহেদা— আচ্ছা তাহলে যাও। অজু করো এবং আমল করো।

আপন মনে চলে গেল আলিফ। অজু করলো এবং সারি বদ্ধভাবে দাঁড়ানো মানুষদের নিয়ে একটি আমল পূর্ণ করলো।

আলিফ। ফিলিস্তিনের গাজা মহল্লার ২২ বছর বয়সি এক কিশোর। অদম্য তরুণ। সারা অঙ্গ জুড়ে নুর আর নুর। আলো আর আলো। চেহারার আলোর সাথে মিশে একাকার হয়ে আছে পোশাক আশাকের শুভ্র আলো। ব্যবহারের আলো। মানসিকতার শুভ্রতা। ফেরেশতার মতো দেখতে অনেকটা। গাজার ছোট্ট এক ফলের দোকানি আবু আনসারের সন্তান আলিফ। গাজায় প্রতিষ্ঠিত একটি মাদরাসা থেকে হাফেজি শেষ করার পর উচ্চ মাধ্যমিক জামাতের ছাত্র এখন সে। দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা, ফুপা-ফুপি, খালা-খালু আর ছোট্ট একটি বোন— সব মিলে বেশ বড় একটি পরিবারের একজন ছোট্ট সদস্য আলিফ। ছোট্ট সদস্য হলেও আলিফের সমাদরে মুখরিত গোটা পরিবার। কারণ হলো বংশ পরমপরায় আলফিই একমাত্র সদস্য যে পবিত্র কোরআন হিফজ করেছে। আলিম হচ্ছে। দাদার ইচ্ছা ছিলো তার সন্তানকে আলিম বানাবেন কিন্তু সে স্বপ্ন তার পূরণ হয়নি। আলিফকে নিয়ে তাই তার স্বপ্ন অনেক বড়।


তোমার জানার খুব ইচ্ছা ছিলো নামাজের সময় ছাড়া অসময়ে কী আমল করি আমি! শুধু আমি নই হে বোন আমার! আমরা সব ফিলিস্তিনিরাই এখন প্রতিদিন ছয় ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার পাঁচ ওয়াক্ত সাথে জানাজার এক ওয়াক্ত নামাজ আমরা এখন প্রতিদিনই আদায় করি। আর আজও আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর ষষ্ঠ ওয়াক্তে তোমার জানাজার নামাজ আদায় করছি।


ভাইয়া! তুমি আজো অসময়ে অজু করছো? এখন আবার কোন ওয়াক্তের নামাজ আদায় করবে তুমি? একটু আগেই না তুমি মাগরিবের নামাজ পড়ে এলে?

আলিফকে মাগরিবের নামাজের পর আবার অজু করতে দেখে এক শ্বাসে প্রশ্নগুলো ছুঁড়লো শাহেদা। বড় ভাই আলিফকে খুব পছন্দ করে শাহেদা। সারাক্ষণ শুধু ভাইয়া ভাইয়া জিকির তার। এখন ভাইয়া কি করছে, একটু পরে আলিফ কি করবে? শাহেদার সব জানা থাকা চাই-ই চাই। ভাইয়ার সব কাজ নিয়ে শাহেদার তাই একটু বেশি কৌতুহল।

কি হলো ভাইয়া কিছু বলছো না কেন? আবার অজু করবে কেন তুমি? কি আমল আছে এখন তোমার?

কিপ রিডিং…

গো টু টপ