Tag archive

জেরুসালেম

জেরুজালেম নাকি জেরুসালেম, আল-কুদস তাহলে কি?


সাংবাদিকতা শব্দের ইংলিশ হলো- Journalism এখানে ইংরেজি ‘এস’ থাকলেও উচ্চারণ কিন্তু হচ্ছে- জার্নালিজম। এখানে যেভাবে ‘এস’ বর্ণের উচ্চারণ ‘জ’ দিয়ে হচ্ছে, ঠিক তেমনই জেরুসালেমের ‘এস’ বর্ণটিকে কেউ ‘জ’ এবং কেউ ‘স’ উচ্চারণ করছেন। এতেই মূলত পবিত্র শহরটির নাম কখনও সালেম এবং কখনও জালেম হচ্ছে।


বর্তমানে ফিলিস্তিনের একটি শহরকে ট্রাম্প ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা দিয়েছেন। যা নিয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় হয়েছে এবং হচ্ছে। জাতিসংঘে ভোটে হেরে গেলেও হুমকি দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার চেষ্টা করছেন মিস্টার ট্রাম্প।

কেউ বলেন জেরুজালেম আবার কেউ বলছেন জেরুসালেম। ফিলিস্তিনের উল্লেখিত শহরটির শুদ্ধ নাম আসলে কি? তা নিয়েই আজ আমার আলোচনা। বিস্তারিত ইতিহাসে আজ যবো না, শুধু নামের বিশ্লেষণ থাকবে এ লেখায়।

ফিলিস্তিনের উল্লেখিত শহরটির মূল নাম হচ্ছে- আল কুদস অর্থাৎ পবিত্র। বিভিন্ন কারণেই উক্ত স্থানটি মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের কাছে শহরটি পবিত্র। এজন্যই মূলত যে নামেই ডাকা হচ্ছে বা নাম যেটাই হোক নামের অর্থ কিন্তু স্ব স্ব জাতির মতে পবিত্র। বাস্তবে নামের অর্থ থাক না থাক সেটা বড় ব্যাপার না।

আল কুদস আরবী শব্দ। ফিলিস্তিন যেহেতু আরব দেশ তাই তাদের ভাষা অনুসারে উক্ত শহরটির নামকরণ করা হয়েছে ‘আল কুদস’।

এরপর ইহুদিরা ছলেবলে যখন মাথা গোঁজার ঠাই হিসেবে ফিলিস্তিনিদের কাছে ভূখন্ড নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করল তখন থেকে আস্তে আস্তে ইহুদিরা ফিলিস্তিন দখলের ছক আঁকতে শুরু করেছে। সে ছক বাস্তবায়নের জন্য নানান বর্বরতা চালাচ্ছে প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিদের উপর। নাম পরিবর্তনও সেই চক্রান্তের অংশ।

ইসরাইল যখন ‘আল কুদস’ দখল করেছে তখন থেকে তাঁরা এর অফিসিয়াল নাম দিয়েছে ‘ইউরসালাইম আল কুদস’। এ শব্দের অর্থও পবিত্র। আল কুদ্স নাম সে সময় বাদ দিলে ইসরাইলের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যেত, এজন্য ধূর্ত ইহুদিরা নিজেদের শব্দের সাথে মূল আরবী শব্দ ‘আল কুদ্স’ও সংযুক্ত রেখেছে।

ইউরসালাইম আসলে কোন ভাষার শব্দ? ইসরাইলের ভাষা যেহেতু হিব্রু তাই অনেকের মতে ইউরসালাইম শব্দটি হিব্রু ভাষার শব্দ। কারো মতে শব্দটি মেসোপটোমিয়া শব্দ ‘ইউরসালাইমা’ থেকে নেয়া হয়েছে। যেখান থেকেই নেয়া হোক ইউরসালাইম শব্দটির অর্থও ইহুদিদের মতে পবিত্র। কিপ রিডিং…

জেরুসালেম তাহলে কার?

কোনো ধর্মমত বিবেচনায় না এনে যদি প্রশ্ন করা হয়— এই মসজিদটি কার? আপনার বাড়ির পাশে কিংবা আপনার ঘরের কাছেই যে মসজিদটি আছে, যেখানে আপনার বাবা কিংবা দাদার দানকৃত ভূমি রয়েছে, সেটা কি আপনার উত্তরাধিকার? কিংবা ওই মন্দিরটি? সেটাও কি একইভাবে আপনার বন্ধু তন্ময় কিংবা সঞ্জয় তাদের মিরাস সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারে? আপনার শহরে অবস্থিত গির্জাটি নিয়েও কিন্তু আমরা একই প্রশ্ন করতে পারি। হতে পারে এমন প্রশ্নের মুখে আপনাকে কখনও পড়তে হয় নি, কেননা, এভাবে কেউ প্রশ্ন করে না। চমকানো সুন্দর মসজিদ (একইভাবে মন্দির বা গির্জা) হলে হয়তো সর্বোচ্চ জিজ্ঞেস করা হতে পারে— এটা কে করেছে? আপনার জানা থাকলে অবলীলায় বলে দিলেন— শরফুদ্দিন সান্টু ইত্যাদি। তারপরও যদি কেউ আপনাকে এমন বেমক্কা প্রশ্ন করেই বসে, আপনি তাকে হয়তো নাস্তিক ভাববেন, কিংবা ঈমানের জোর বেশি থাকলে বলবেন— কার আবার? আল্লাহর। ভিন্ন ধর্মের হলে বলবেন— মুসলমানদের।

যদিও মসজিদ কারও ব্যক্তিগত সম্পদ হয় না। মসজিদ আল্লাহর ঘর, বাইতুল্লাহর অংশ। যেখানে মসজিদ একবার নির্মিত হয়ে যায়, কেয়ামত দিবস অবধি সেটা আল্লাহর মালিকানায় চলে যায়। তাই যদি কোনো মসজিদে সাধারণের প্রবেশাধিকার না থাকে, তাহলে সেখানটায় জুমাবারের সালাত আদায় হবে না— এ-ই ইসলামের বিশ্বাস। কেননা, মালিক যেহেতু আল্লাহ, সুতরাং আল্লাহর বান্দা হিসেবে সেখানের কর্তৃত্ব সবার সমান, একক কারও হতে পারে না।

সন্দেহ নেই, উপসনালয়ের ব্যাপারে একই ধরনের বিশ্বাস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকেই লালন করে পৃথিবীর তাবৎ ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাদের নিজেদেরই হাতে গড়া এবাদতগাহ নির্মাণের পর আর তাদের নিজেদের থাকে না, সেখানে শুধু তাদের এবাদতেরই অধিকার থাকে, অন্য কিছু নয়। এবাদতের স্থানটুকু ঈশ্বরের নামে প্রদত্ত পবিত্র ভূমি।



ভিয়া ডলোরোসা, যে-পথে নবী ঈসাকে (আ.) নিজের ক্রস বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। ছবি  : সংগৃহীত


একই কথা প্রজোয্য জেরুসালেমের ব্যাপারেও। অন্তত তা-ই হওয়া উচিত। সম্ভবত সব মানুষ সেটা জানেও এবং মানেও। কিন্তু জেরুসালেমের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, অন্য যে-কোনো স্থানের বেলায় যে-ধর্ম যেখানটাকে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে স্বীকৃতি দেয়, সেখানটা শুধু সেই ধর্মের লোকদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে, অন্য ধর্মের লোকেরা অল্প-বিস্তর মতানৈক্য না-থাকলেও শান্তি বজায় রাখার নিমিত্ত সেটা মেনেও নেয়। ছোট ‘পবিত্র ভূমি’ যেমন মসজিদ, মন্দির প্যাগোডা, গির্জা, টেম্পল ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাতে গোণা সামান্য কয়েকটি উদাহরণ বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই আপন আপন ধর্মের লোকেরা আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। একান্ত তীর্থভূমি নিয়েও খুব একটা বিরোধ বাঁধে না। হিন্দুদের কাশি, বৌদ্ধদের শোয়েডগ প্যাগোডা এবং মুসলমানদের মক্কা-মদিনা নিয়ে কোনো উৎপাত নেই। কিন্তু জেরুসালেমের বিপত্তি এখানেই যে, এই একই ‘পবিত্র ভূমি’ যখন বিশ্বের ধর্মের এবং তিনটিই আসমানি ধর্ম— ইহুদি, খ্রিষ্ট ও ইসলাম। এ-কারণেই জেরুসালেম অনন্য। এখানেই সাধারণ যে-কোনো তীর্থভূমি বা পবিত্র ভূমির সঙ্গে জেরুসালেমের তফাত।

অবশ্য এটা ঠিক যে, আমরা কখনও কখনও কয়েকটি ধর্মের উপাসনালায় পাশাপাশি অবস্থান করতেও দেখি। মসজিদের পাশেই গির্জা। গির্জার ঘন্টার ধ্বনি ও মসজিদের আজান ধ্বনি সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মসজিদ কিংবা গির্জাবাসীরা একে অপরের উপাসনালয় দখল করতে যায় না। কিন্তু জেরুসালেমে কী এমন রয়েছে যে, এখানে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীরা কেবল নিজেদের উপাসনালয়ে এবাদত করেই সন্তুষ্ট নয়, বরং এই ভূমিটাই তাদের দখলে রাখতে হবে? অথচ তিন ধর্মই প্রভু হিসেবে আল্লাহকে মান্য করে এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, পবিত্র ভূমির মালিকানা কোনো মানুষের নয়—আল্লাহর। তাহলে দ্বন্দ্বটা কিসের? ঈশ্বরের মালিকানা নিয়ে?

এমনও নয় যে, এই দ্বন্দ্ব দুয়েকবার ঘটেই শেষ হয়েছে। বরং জেরুসালেমের দীর্ঘ ইতিহাসে, শহরটি কমপক্ষে দুইবার ধ্বংস হয়েছে, ২৩ বার অবরোধ হয়েছে, ৫২ বার আক্রমণ হয়েছে এবং ৪৪ বার দখল এবং পুনর্দখল হয়েছে।[1]ধর্মের লড়াইয়ের সাথে সাথে এখানে অধর্মের কাজও যে কম হয়েছে, তা নয়। আজও শহরে কোনো প্রত্নতত্ত্ব সন্ধান করতে গেলেই দেখা যায়, কোনো মসজিদের নীচে ইহুদি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ অথবা কোনো গির্জার নীচে দেখা গেলো মসজিদের চিহ্ন। যদি অধর্মই না হবে, তাহলে রোমান খ্রিষ্টানদের হাতে এই শহর ধ্বংস হবে কেনো? খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভূমি কী করে খ্রিষ্টানদের হাতেই রক্তাক্ত পারে?

বহু জটিলতা আর বহু প্রশ্ন জড়িয়ে আছে জেরুসালেম কার এই প্রশ্নে সাথে। আমরা ইতিহাস ও বর্তমান জেরুসালেমের পবিত্র নিদর্শনগুলো খুঁজতে খুঁজতে সে-সব প্রশ্ন খতিয়ে দেখার প্রয়াস পাবো।

এক. আজ যেখানে জেরুসালেম নামে বিখ্যাত নগরী উপস্থিত, ইতিহাসের প্রারম্ভে, প্রায় ৫০০০ বছর আগে, সেখানে ছিলো একটি ছোট্ট গ্রাম। উঁচুনিচু মরুভূমির অভ্যন্তরে একটি সবুজ উপত্যকার মধ্যে খেজুর ও জলপাই গাছে ঢাকা গ্রামটিতে ঠিক কী ছিলো যা মোজেস, আব্রাহাম, যিশুখ্রিষ্ট (নবী মুসা, ইব্রাহিম ও ঈসা আ.) থেকে মুহাম্মাদ (স.) পর্যন্ত সবাইকে আকর্ষণ করে এসেছে? এখানকার মাটিতে কী আছে যা তিন-তিনটে বিরাট ধর্মের জন্ম দিয়েছে?

শহরের গা ঘেঁষে উঁচু টিলা—মাউন্ট অব অলিভ, জলপাই পাহাড়। মুসলিমরা বলে যাইতুন, কোরআনে এই ফলের কসম খেয়েছেন আল্লাহ। জেরুসালেমসহ এ-অঞ্চলের মানুষের অত্যন্ত্র প্রিয় ও প্রধান খাদ্যেরও একটি অলিভ। এই মাউন্ট অব থেকে সারা জেরুসালেম দেখা যায়। দেখা যায় পাথরে গাঁথা ৫০০০ বছরের পুরোনো শহর (Old City) ও তার মধ্যমণি সোনার পাতে মোড়া ডোম অব রক (Dome of the Rock)। ২০০০ বছর আগে নবী ঈসা (আ.) যখন জেরুসালেম দেখেছেন সেই, কেমন ছিলো শহরটা তখন? হয়তো পুরোনো শহরের আশেপাশে তখন ছিলো শুধু কাঁটাঝোপ। আজকের মতো রাস্তাঘাট, অট্টালিকার চিহ্নও ছিলো না। তখনও কি তিনি জানতেন নিয়তি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ওই জেরুসালেমের মধ্যে দিয়েই ভারি ক্রশ পিঠে চাপিয়ে তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।



৬-নং স্টপ-এ ভেরোনিকা তৃষ্ণার্ত নবী ঈসাকে আ. জল দিতে চেয়েছিলেন। ছবি : সংগৃহীত


কিপ রিডিং…

গো টু টপ