Tag archive

ফিলিস্তিন

ফিলিস্তিনি গল্প— শোধ


মূল— ইবরাহিম নাসরুল্লাহ। ভাষান্তর— মিরাজ রহমান


বড় বেশি রকম পীড়াপীড়ি করছে নিয়াজ। রামাল্লায় আজ তাকে যেতেই হবে। কারোরই নিষেধ শুনছে না সে। বাবা নিষেধ করছে, মাতা বাধা দিচ্ছে কিন্তু কারো কোনো কথাই আজ শুনছে না নিয়াজ। মানছে না কারো কোনো নিষেধই। পরিস্থিতি মোটেও অনুকূলে নয়, মিলিটারি চেকপয়েন্ট, হয়রানি, কষ্টকর যাত্রা কিংবা হঠাৎ গুম হয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। তবুও  নিয়াজ  বললো, রামাল্লায় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। দ্রুত সেটার সমাধান প্রয়োজন। যেভাবেই হোক আজকের মধ্যে রামাল্লায় আমাকে পোঁছতেই হবে। আর রাস্তার এসব কষ্ট, হয়রানি এবং এইসব অপমান— এতো আর নতুন কিছু নয়। হয়রানিকর এসব অস্বাভাবিকতাকে আমাদের জন্য স্বাভাবিক করে দিয়েছে ইসরায়েলিরা। অস্বাভাবিককতাকে মেনে নিয়ে জীবন তো আর থেমে থাকতে পারে না। কী আর করবো আমার? মৃত্যু না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলতে হবে আমাদের, সম্মুখ পানে। জীবন যাপনের দিকে। আরো অনেক সামনে আমাদের গন্তব্য। এভাবে ঘরে বসে থাকলে তো আর সমাধান কিছু হবে না। কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সামনে এগিয়ে চলতে হবে এবং সমস্যার সামাধান করতে হবে। আর এভাবেই এগিয়ে চলে একটি জীবন। ধীরে ধীরে এবং ধাপে ধাপে।

সবার কথা অমান্য কপর রামাল্লায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে এসে বসলো নিয়াজ। রামাল্লায় আজ তাকে যেতেই হবে। বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে আজ সে রামাল্লায় পৌঁছাতে না পারলে। তাই সেখানে যেতে তাকে হবেই— সোজা পথে হোক কিংবা বাঁকা পথে। গাড়িতে চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে অথবা হামাগুড়ি দিয়ে— যে কোনো উপায় অবলম্বনে হোক যেতে আজ তাকে হবেই হবে। গাড়িতে আরো অনেক যাত্রী রয়েছে তার মতো। কেউ রামাল্লায়, কেউ বা অন্য কোথার যাত্রী। গাড়ি চলছে বিভিন্নভাবে, নানা উপায়ে— কখনো পিচঢালা পথ বেয়ে, কখনো বা পাথুরে রাস্তায়। এলোমেলো ভাবে এগুচ্ছে নিয়াজদের গাড়ি।

লোকজন সবাই বিকল্প পথ খুঁজছে। চেকপয়েন্টের হয়রানি, হুমকি-ধমকি, নিদারুন শান্তি এবং মানসিক দুর্দশা এড়াতে চোরাপথে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে সবাই। বর্তমান কালের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা পিঁপড়ার দলের মতো অনেকটা। যখন পিঁপড়াদের ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে যায়, নষ্ট করে ফেলা হয় তাদের আবাসস্থল, তখন তারা বিকল্প আবাসন তালাশ করে। নতুন পথ আবিস্কার করে। দিনের পর দিন নতুনভাবে কাজ করে তারা। মাটির কণা-গুঁড়ি বয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে বহুদূরে। ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করে চলাচলের জন্য। পাথুরে জমিনে কিংবা আরো ভয়াবহ কোনো জমিনই আটকাতে পারে না আবাসনহারা এই সব পিপিলিকার দলকে। হয়তো আবার এক মিনিট পড়েই ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অন্য কারো ভুলে ভেঙ্গে যাবে তাদের এই নতুন আয়োজনও। তাই বলে কি থেমে থাকে পিঁপড়ারা। না, থেমে থাকে না তাদের জীবন, চলাচল। আবার শুরু হয় কাজ। আবার নির্মিত হয় বিকল্পধারা। নতুন আবাসন। নতুন ঘর-বাড়ি। নতুন রাস্তা-মোড়। ফিলিস্তিনি মানুষগুলোর অবস্থা এখন বলতে গেলে অনেকটাই পিঁপড়ার জীবন। নিত্য নতুন বিকল্প খুঁজতে হয় তাদেরকে। জীবন যাপনের বিকল্প, চলাচলের বিকল্প এবং আরো কত কি!

ধুলোয় ভরা পথ দিয়ে সামনের এগুতে থাকে মানুষগুলো। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যে কোনো কিছুতে চড়তে রাজি তারা— হাঁটবে সোজা পথ ধরে কিংবা চড়বে পাথুরে ভূমিতে। গাদাগাদি করে বসবে একই গাড়িতে অথবা উঠবে কোনো মাটির প্রাচীরের বেয়ে— মোট কথা বিকল্প পথের অসহ্য ভোগান্তি সহ্য করাটাই এখন ফিলিস্তিনিদের নতুন এক বিকল্প জীবন। হঠাৎ হয়ত বা একটি ভুলডোজার এসে ভেঙ্গে দিবে তাদের বিকল্প পথচলা। কালো কালো পি-গুলো দ্বারা বন্ধ করে দেয় হবে রাস্তা। তারপর শুরু হবে আবার পথ খোঁজা। নতুন বিকল্প পথ আবিস্কার করা এবং সামনে এগিয়ে চলা। নতুন নতুন বিকল্প পথ আর পথচলার অনেক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে এই মাটিতে। কতো ইতিহাস রচিত হচ্ছে এবং আরো কত ইতিহাসের জন্ম ঘটবে— কোনো সীমারেখা নেই তার। এককথায়, অসীম দৃঢ়তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি— বর্তমান ফিলিস্তিন। কিপ রিডিং…

জেরুজালেম নাকি জেরুসালেম, আল-কুদস তাহলে কি?


সাংবাদিকতা শব্দের ইংলিশ হলো- Journalism এখানে ইংরেজি ‘এস’ থাকলেও উচ্চারণ কিন্তু হচ্ছে- জার্নালিজম। এখানে যেভাবে ‘এস’ বর্ণের উচ্চারণ ‘জ’ দিয়ে হচ্ছে, ঠিক তেমনই জেরুসালেমের ‘এস’ বর্ণটিকে কেউ ‘জ’ এবং কেউ ‘স’ উচ্চারণ করছেন। এতেই মূলত পবিত্র শহরটির নাম কখনও সালেম এবং কখনও জালেম হচ্ছে।


বর্তমানে ফিলিস্তিনের একটি শহরকে ট্রাম্প ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা দিয়েছেন। যা নিয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় হয়েছে এবং হচ্ছে। জাতিসংঘে ভোটে হেরে গেলেও হুমকি দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার চেষ্টা করছেন মিস্টার ট্রাম্প।

কেউ বলেন জেরুজালেম আবার কেউ বলছেন জেরুসালেম। ফিলিস্তিনের উল্লেখিত শহরটির শুদ্ধ নাম আসলে কি? তা নিয়েই আজ আমার আলোচনা। বিস্তারিত ইতিহাসে আজ যবো না, শুধু নামের বিশ্লেষণ থাকবে এ লেখায়।

ফিলিস্তিনের উল্লেখিত শহরটির মূল নাম হচ্ছে- আল কুদস অর্থাৎ পবিত্র। বিভিন্ন কারণেই উক্ত স্থানটি মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের কাছে শহরটি পবিত্র। এজন্যই মূলত যে নামেই ডাকা হচ্ছে বা নাম যেটাই হোক নামের অর্থ কিন্তু স্ব স্ব জাতির মতে পবিত্র। বাস্তবে নামের অর্থ থাক না থাক সেটা বড় ব্যাপার না।

আল কুদস আরবী শব্দ। ফিলিস্তিন যেহেতু আরব দেশ তাই তাদের ভাষা অনুসারে উক্ত শহরটির নামকরণ করা হয়েছে ‘আল কুদস’।

এরপর ইহুদিরা ছলেবলে যখন মাথা গোঁজার ঠাই হিসেবে ফিলিস্তিনিদের কাছে ভূখন্ড নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করল তখন থেকে আস্তে আস্তে ইহুদিরা ফিলিস্তিন দখলের ছক আঁকতে শুরু করেছে। সে ছক বাস্তবায়নের জন্য নানান বর্বরতা চালাচ্ছে প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিদের উপর। নাম পরিবর্তনও সেই চক্রান্তের অংশ।

ইসরাইল যখন ‘আল কুদস’ দখল করেছে তখন থেকে তাঁরা এর অফিসিয়াল নাম দিয়েছে ‘ইউরসালাইম আল কুদস’। এ শব্দের অর্থও পবিত্র। আল কুদ্স নাম সে সময় বাদ দিলে ইসরাইলের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যেত, এজন্য ধূর্ত ইহুদিরা নিজেদের শব্দের সাথে মূল আরবী শব্দ ‘আল কুদ্স’ও সংযুক্ত রেখেছে।

ইউরসালাইম আসলে কোন ভাষার শব্দ? ইসরাইলের ভাষা যেহেতু হিব্রু তাই অনেকের মতে ইউরসালাইম শব্দটি হিব্রু ভাষার শব্দ। কারো মতে শব্দটি মেসোপটোমিয়া শব্দ ‘ইউরসালাইমা’ থেকে নেয়া হয়েছে। যেখান থেকেই নেয়া হোক ইউরসালাইম শব্দটির অর্থও ইহুদিদের মতে পবিত্র। কিপ রিডিং…

ফিলিস্তিনি গল্প— পোস্টারে সেঁটে থাকা সেই মেয়েটি


মূল— দিমা শাইবানি। ভাষান্তর— মনযূরুল হক


ক্ল্যারিফিকেশন— এ গল্পটি একজন আরব নারীর জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত। এই মহিয়সী নারীর নাম ‘হানা শাইবানি’। ফিলিস্তিন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ প্রথম ইরাকি যোদ্ধা।

হানা শাইবানি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ২৭ আগস্ট। ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাথ পার্টির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে পার্টির মহিলা সদস্যাদের নেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালের দিকে দুর্নীতির ঘটনার প্রতিবাদে তিনি বাথ পার্টি ত্যাগ করেন এবং ইয়াসির আরাফাতসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৭ মার্চ ১৯৭০ সালে তিনি আন্দোলনরত অবস্থায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।


সবাই বলে আমি নাকি আজন্মই খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। আমার নিজের কাছেও তা-ই মনে হয়। গল্প শুনতে সব সময়ই বিশেষ ভালো লাগে আমার। ভালো লাগে শোনাতেও। কিন্তু ভূত-প্রেতের অহেতুক কিসসায় আমার বিরক্তি ভীষণ। শিশুরা কেউ যদি আমার কাছে গল্প শুনতে আসে, তাহলে আমি তাদের সেই সব কাহিনী গল্পের মতো করে সাজিয়ে বলি, যা তাদের মন-মগজকে শুধরে সুস্থ চিন্তার পথ তৈরি করে দেয়।

বহু মনমাতানো গল্পকথা মুখস্ত ছিলো আমার। হয়তো ছেলেবেলায় শুনেছি, অথবা শিশুতোষ বইগুলোতে পড়েছি। কিন্তু এক্ষণে বয়সকালের সব সূত্রাদি ছিঁড়েফুঁড়ে উপর্যুপরি নাবছিলাম একটি স্বপ্ন জাগানিয়া সুরের সন্ধানে। কাউকে শোনাতে নয়, নিজেই স্মরণ করতে চাইছিলাম যে, কী ঘটেছিলো তখন।

আমার চিরদিনের অভ্যাস, ছোট ছোট বিষয় থেকে গল্পের সূত্র খুঁজে বের করা। যেমন, বাড়িতে ভিক্ষুক এসেছে। আমি ভাবতাম, কেনো সে ভিক্ষা করছে। হয়তো তাকেই সেটা জিজ্ঞেস করতাম। অথবা তার পিছু লেগে থাকতাম, তার জীবনের গল্পটা উদ্ধার করার জন্যে। কিংবা হয়তো দেখা যেতো, রাস্তায় একটা চশমা পড়ে আছে। সেই চশমাটা কার হতে পারে, কী করে ফেলে গেলো, এ নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিলো না আমার। সংবাদপত্রের বিজ্ঞপ্তি, বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা উপহার বাক্য, বাড়ির পাশের মরে যাওয়া যাইতুন গাছটার রোপনকর্তা, অথবা পুরোনো সুটকেসে নেকড়ার মতো ময়লা হয়ে থাকা এক খ- কাপড়রই হতে পারতো আমার গল্পের উৎস সন্ধানের বিষয়। বাড়ির মানুষ, পড়শি, স্বজন, পথের অপরিচিত যেই হোক কারো কাছে কোনো গল্প বা ঘটনা জানতে চাইতে আমার কোনো সংকোচ ছিলো না কখনোই। ফলে অল্প বয়সেই নানান গল্পের একটা ভা-ার জমা হয়ে গেছে আমার স্মৃতিতে।

গল্পের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণেই কখনো কখনো একটা গল্পের সঙ্গে আরেকটা গল্পের সূত্র জোড়া লেগে গিয়ে মাঝমধ্যে এমন কিম্ভূত পরিস্থিতিরও উদয় হতো যে, আমি রীতিমতো লজ্জায় পড়ে যেতাম। অনক সময় রাশি রাশি গল্পের স্তূপের তলে চাপা পড়ে থাকা কোনো একটা গল্প মগজ নাড়া দিয়ে যেতো। কিন্তু মাথা থেকে মুখে আনতে গিয়েই লাগতো গোলমাল। অর্থাৎ মাথায় আছে, কিন্তু মনে আসছে না। অথবা মনেও আসছে কিন্তু ধরে রাখতে পারছি না বেশিক্ষণ।

আজো মনে হচ্ছে, তেমন কিছু একটা ঘটেছে। আমি মনে করতে চাইছি। অথচ মনে আসছে না। আবার একটু একটু করে মনে আসছে। কিন্তু মুখে আসছে না। বাসার সামনের দেয়ালে নানুর লাগানো পোস্টারটা দেখে পুরোনো একটা গল্প চাগিয়ে উঠতে চাইছে। বারংবার চোখের পাতায় ভেসে উঠছে তেমনই একটা মলিন পোস্টার। দেয়ালে সাঁটা বিবর্ণ একটা ছবি। তাতে কিছু হরফ, লাল কালিতে লেখা কতগুলো অক্ষর জ¦ল জ¦ল করছে যেনো।

আমি মনে হয় নানুর সাথে কোনো শপিং মলে গিয়েছিলাম সেদিন। কী কী কিনেছিলাম মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে যে, আমাদের কারো হাতে কোনো শপিং ব্যাগ ছিলো না। হয়তো কিছুই কিনি নি। নানুর সাথে ঘুরতে বেড়ানোই উদ্দেশ্য ছিলো শুধু। মনে পড়ছে, নানু আমার হাত ধরে আছেন, আর আমরা এক পা এক পা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছি। শপিংমলের বাইরে এসে আমি নানুর হাতটা ছেড়ে দিলাম। কারণ আমি সেখানের দেয়ালে একটা মেয়ের পোস্টার দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা কিশোরী মেয়ের ছবি আঁকা পোস্টার। সম্ভবত আমার বয়েসিই হবে মেয়েটা।

আশ্চর্য হয়েই পোস্টারটার সামনে দাঁড়ালাম আমি। একটা কিশোরী মেয়ে কী করে এমন একটা পোস্টারে জায়গা করে নিলো ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি। ঈর্ষায় জ্বলে গেলো ভেতরটা। আরো একটু কাছাকাছি হয়ে পোস্টারের লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করলাম আমি। তাতে লেখা ছিলো— “মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্তমূল্য আর কিছুই হতে পারে না।”

অবাক হয়ে গেলাম আমি। আমার মতো একটা মেয়ে কী করে এতো কঠিন কথা বলতে পারে! অনেকগুলো পোস্টার দেয়ালটা জুড়ে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনে ঠাসা দেয়ালটা। তবে সবচে’ সুন্দর ছিলো সম্ভবত এই পোস্টারটাই। একটা নয়, পর পর একসাথে চার-পাঁচটা পোস্টার ছিলো এই একই ছবি আর লেখা দিয়ে তৈরি। কেউ দেখে ফেললে বকবে, সে ভয়ের কথা না ভেবেই একটা পোস্টার টেনে নামিয়ে আনলাম আমি। এবং দুহাতে মুড়ে জামার হাতার ভেতরে লম্বালম্বি ঢুকিয়ে রাখলাম, যেনো হঠাৎ করেই কেউ বুঝতে না পারে যে, আমার কাছে কিছু একটা আছে।

হ্যাঁ, এখন আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে ঘটনাটা। রাতে পড়ার রুমে বসে আমি চুপি চুপি পোস্টারটা বের করে আবার টেবিলে রাখলাম। অথচ সেটা কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। তবু আমার মনে হলো, এটা দেখলে অন্যরা হয়তো অযাচিত ভেবে আমাকে বোকা বলতে পারে। হয়তো আমার ভাইয়েরা হাসাহাসি করবে আর আমার বোকামি সবাইকে বলে বেড়াবে। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলাম পোস্টারের রঙ, ছবি আর লেখাগুলো। হতে পারে তখন কিছু বাদ পড়ে গেছে যা আমার পড়া হয় নি। চারকোণা একটা পোস্টার। চারপাশে সাদা-কালো ডোরাকাটা আল্পনা আঁকা ফ্রেম। ছবিটা পোস্টারের গায়ে কোণাকুণিভাবে লাগানো। মনে হচ্ছে মেয়েটা একটু কাত হয়ে আছে। আর ছবির একেবারে নীচে বড় বড় করে লাল হরফে লেখা— ‘মৃত্যু অবশ্যই আসবে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পেলে মৃত্যুকে কিছুতেই বরণ করা উচিত নয়; আর স্বাধীনতার চেয়ে উপযুক্ত মূল্য আর কিছুই হতে পারে না। কিপ রিডিং…

জেরুসালেম তাহলে কার?

কোনো ধর্মমত বিবেচনায় না এনে যদি প্রশ্ন করা হয়— এই মসজিদটি কার? আপনার বাড়ির পাশে কিংবা আপনার ঘরের কাছেই যে মসজিদটি আছে, যেখানে আপনার বাবা কিংবা দাদার দানকৃত ভূমি রয়েছে, সেটা কি আপনার উত্তরাধিকার? কিংবা ওই মন্দিরটি? সেটাও কি একইভাবে আপনার বন্ধু তন্ময় কিংবা সঞ্জয় তাদের মিরাস সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারে? আপনার শহরে অবস্থিত গির্জাটি নিয়েও কিন্তু আমরা একই প্রশ্ন করতে পারি। হতে পারে এমন প্রশ্নের মুখে আপনাকে কখনও পড়তে হয় নি, কেননা, এভাবে কেউ প্রশ্ন করে না। চমকানো সুন্দর মসজিদ (একইভাবে মন্দির বা গির্জা) হলে হয়তো সর্বোচ্চ জিজ্ঞেস করা হতে পারে— এটা কে করেছে? আপনার জানা থাকলে অবলীলায় বলে দিলেন— শরফুদ্দিন সান্টু ইত্যাদি। তারপরও যদি কেউ আপনাকে এমন বেমক্কা প্রশ্ন করেই বসে, আপনি তাকে হয়তো নাস্তিক ভাববেন, কিংবা ঈমানের জোর বেশি থাকলে বলবেন— কার আবার? আল্লাহর। ভিন্ন ধর্মের হলে বলবেন— মুসলমানদের।

যদিও মসজিদ কারও ব্যক্তিগত সম্পদ হয় না। মসজিদ আল্লাহর ঘর, বাইতুল্লাহর অংশ। যেখানে মসজিদ একবার নির্মিত হয়ে যায়, কেয়ামত দিবস অবধি সেটা আল্লাহর মালিকানায় চলে যায়। তাই যদি কোনো মসজিদে সাধারণের প্রবেশাধিকার না থাকে, তাহলে সেখানটায় জুমাবারের সালাত আদায় হবে না— এ-ই ইসলামের বিশ্বাস। কেননা, মালিক যেহেতু আল্লাহ, সুতরাং আল্লাহর বান্দা হিসেবে সেখানের কর্তৃত্ব সবার সমান, একক কারও হতে পারে না।

সন্দেহ নেই, উপসনালয়ের ব্যাপারে একই ধরনের বিশ্বাস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকেই লালন করে পৃথিবীর তাবৎ ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাদের নিজেদেরই হাতে গড়া এবাদতগাহ নির্মাণের পর আর তাদের নিজেদের থাকে না, সেখানে শুধু তাদের এবাদতেরই অধিকার থাকে, অন্য কিছু নয়। এবাদতের স্থানটুকু ঈশ্বরের নামে প্রদত্ত পবিত্র ভূমি।



ভিয়া ডলোরোসা, যে-পথে নবী ঈসাকে (আ.) নিজের ক্রস বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। ছবি  : সংগৃহীত


একই কথা প্রজোয্য জেরুসালেমের ব্যাপারেও। অন্তত তা-ই হওয়া উচিত। সম্ভবত সব মানুষ সেটা জানেও এবং মানেও। কিন্তু জেরুসালেমের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, অন্য যে-কোনো স্থানের বেলায় যে-ধর্ম যেখানটাকে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে স্বীকৃতি দেয়, সেখানটা শুধু সেই ধর্মের লোকদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে, অন্য ধর্মের লোকেরা অল্প-বিস্তর মতানৈক্য না-থাকলেও শান্তি বজায় রাখার নিমিত্ত সেটা মেনেও নেয়। ছোট ‘পবিত্র ভূমি’ যেমন মসজিদ, মন্দির প্যাগোডা, গির্জা, টেম্পল ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাতে গোণা সামান্য কয়েকটি উদাহরণ বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই আপন আপন ধর্মের লোকেরা আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। একান্ত তীর্থভূমি নিয়েও খুব একটা বিরোধ বাঁধে না। হিন্দুদের কাশি, বৌদ্ধদের শোয়েডগ প্যাগোডা এবং মুসলমানদের মক্কা-মদিনা নিয়ে কোনো উৎপাত নেই। কিন্তু জেরুসালেমের বিপত্তি এখানেই যে, এই একই ‘পবিত্র ভূমি’ যখন বিশ্বের ধর্মের এবং তিনটিই আসমানি ধর্ম— ইহুদি, খ্রিষ্ট ও ইসলাম। এ-কারণেই জেরুসালেম অনন্য। এখানেই সাধারণ যে-কোনো তীর্থভূমি বা পবিত্র ভূমির সঙ্গে জেরুসালেমের তফাত।

অবশ্য এটা ঠিক যে, আমরা কখনও কখনও কয়েকটি ধর্মের উপাসনালায় পাশাপাশি অবস্থান করতেও দেখি। মসজিদের পাশেই গির্জা। গির্জার ঘন্টার ধ্বনি ও মসজিদের আজান ধ্বনি সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মসজিদ কিংবা গির্জাবাসীরা একে অপরের উপাসনালয় দখল করতে যায় না। কিন্তু জেরুসালেমে কী এমন রয়েছে যে, এখানে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীরা কেবল নিজেদের উপাসনালয়ে এবাদত করেই সন্তুষ্ট নয়, বরং এই ভূমিটাই তাদের দখলে রাখতে হবে? অথচ তিন ধর্মই প্রভু হিসেবে আল্লাহকে মান্য করে এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, পবিত্র ভূমির মালিকানা কোনো মানুষের নয়—আল্লাহর। তাহলে দ্বন্দ্বটা কিসের? ঈশ্বরের মালিকানা নিয়ে?

এমনও নয় যে, এই দ্বন্দ্ব দুয়েকবার ঘটেই শেষ হয়েছে। বরং জেরুসালেমের দীর্ঘ ইতিহাসে, শহরটি কমপক্ষে দুইবার ধ্বংস হয়েছে, ২৩ বার অবরোধ হয়েছে, ৫২ বার আক্রমণ হয়েছে এবং ৪৪ বার দখল এবং পুনর্দখল হয়েছে।[1]ধর্মের লড়াইয়ের সাথে সাথে এখানে অধর্মের কাজও যে কম হয়েছে, তা নয়। আজও শহরে কোনো প্রত্নতত্ত্ব সন্ধান করতে গেলেই দেখা যায়, কোনো মসজিদের নীচে ইহুদি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ অথবা কোনো গির্জার নীচে দেখা গেলো মসজিদের চিহ্ন। যদি অধর্মই না হবে, তাহলে রোমান খ্রিষ্টানদের হাতে এই শহর ধ্বংস হবে কেনো? খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভূমি কী করে খ্রিষ্টানদের হাতেই রক্তাক্ত পারে?

বহু জটিলতা আর বহু প্রশ্ন জড়িয়ে আছে জেরুসালেম কার এই প্রশ্নে সাথে। আমরা ইতিহাস ও বর্তমান জেরুসালেমের পবিত্র নিদর্শনগুলো খুঁজতে খুঁজতে সে-সব প্রশ্ন খতিয়ে দেখার প্রয়াস পাবো।

এক. আজ যেখানে জেরুসালেম নামে বিখ্যাত নগরী উপস্থিত, ইতিহাসের প্রারম্ভে, প্রায় ৫০০০ বছর আগে, সেখানে ছিলো একটি ছোট্ট গ্রাম। উঁচুনিচু মরুভূমির অভ্যন্তরে একটি সবুজ উপত্যকার মধ্যে খেজুর ও জলপাই গাছে ঢাকা গ্রামটিতে ঠিক কী ছিলো যা মোজেস, আব্রাহাম, যিশুখ্রিষ্ট (নবী মুসা, ইব্রাহিম ও ঈসা আ.) থেকে মুহাম্মাদ (স.) পর্যন্ত সবাইকে আকর্ষণ করে এসেছে? এখানকার মাটিতে কী আছে যা তিন-তিনটে বিরাট ধর্মের জন্ম দিয়েছে?

শহরের গা ঘেঁষে উঁচু টিলা—মাউন্ট অব অলিভ, জলপাই পাহাড়। মুসলিমরা বলে যাইতুন, কোরআনে এই ফলের কসম খেয়েছেন আল্লাহ। জেরুসালেমসহ এ-অঞ্চলের মানুষের অত্যন্ত্র প্রিয় ও প্রধান খাদ্যেরও একটি অলিভ। এই মাউন্ট অব থেকে সারা জেরুসালেম দেখা যায়। দেখা যায় পাথরে গাঁথা ৫০০০ বছরের পুরোনো শহর (Old City) ও তার মধ্যমণি সোনার পাতে মোড়া ডোম অব রক (Dome of the Rock)। ২০০০ বছর আগে নবী ঈসা (আ.) যখন জেরুসালেম দেখেছেন সেই, কেমন ছিলো শহরটা তখন? হয়তো পুরোনো শহরের আশেপাশে তখন ছিলো শুধু কাঁটাঝোপ। আজকের মতো রাস্তাঘাট, অট্টালিকার চিহ্নও ছিলো না। তখনও কি তিনি জানতেন নিয়তি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ওই জেরুসালেমের মধ্যে দিয়েই ভারি ক্রশ পিঠে চাপিয়ে তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।



৬-নং স্টপ-এ ভেরোনিকা তৃষ্ণার্ত নবী ঈসাকে আ. জল দিতে চেয়েছিলেন। ছবি : সংগৃহীত


কিপ রিডিং…

জেরুজালেম কেনো এতোটা গুরুত্বপূর্ণ?


কুরআন-হাদীসের বর্ণনা ও বাইবেলের বর্ণনাসহ সব দিক দিয়ে দেখলে তিনটি ধর্মের কাছেই জেরুজালেম শহরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।  মূলত তিন ধর্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণেই এই শহরটির এতো গুরুত্বপূর্ণ।


পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জনবসতিগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে জেরুজালেম। দুনিয়ার এমন কোন সচেতন ও জ্ঞানী মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে যিনি জেরুজালেমের নাম শোনেননি। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত এই শহরটি আয়োতনে খুব বেশি বড় না হলেও বিশ্বরাজনীতির পরিমন্ডলে এর অবস্থান ও ভূমিকা অন্য যে কোন শহরের তুলনায় বেশি। জেরুজালেম পৃথিবীর একমাত্র শহর বা স্থান যেটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ তিনটি ধর্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম; এই তিন ধর্মের অনুসারীরাই এই শহরটিকে তাদের পবিত্রশহর হিসাবে বিশ্বাস করে এবং সেজন্য শহরটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দাবী করে। অন্যান্য কিছু কারণ থাকলেও মূলত এই তিন ধর্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণেই এই শহরটির এতো গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত বলা যাক ইহুদী ধর্মের কথা। ইহুদীদের সবথেকে পবিত্র জায়গা বা ইবাদাতস্থল হচ্ছে ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা উইলিং ওয়াল। এই দেয়ালটি বাইবেলে বর্ণিত দ্বিতীয় উপাসনালয়ের বাইরের একটি ছোট অংশ। আর এই দ্বিতীয় উপাসনালয়টি মূলত নির্মিত হয়েছে সুলাইমান-এর উপাসনালয়ের স্থানে। দ্বিতীয় উপাসনালয়টিকে বলা হয় সেকেন্ড ট্যাম্পল।  আর আসলটাকে বলা হয় ফার্স্ট ট্যাম্পল। এই উপাসনালয়টি ইহুদিদের প্রাচীন উপাসনালয়গুলোর একটি। পুরো উপাসনালয় এখন না থাকলেও উপাসনালয়ের যে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে তারই একটি অংশ হচ্ছে এই দেয়াল। এখানে এসেই ইহুদীরা প্রার্থনা করে। আবার তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই শহরেই অবস্থিত হায়কল-ই-সোলাইমান বা সোলাইমানের উপাসনাগৃহ। যা ইসলামের নবী সুলাইমান, যিনি তাদের ভাষায় সোলেমন, তার প্রতিষ্ঠিত। এবং এখানে বসেই রাজত্ব পরিচালনা করেছেন সুলাইমানের বাবা দাঊদ (ডেভিড)।

খ্রিস্টানদের কাছেও এই শহরটি অনেক পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের অন্যতম প্রধান চার্চ “চার্চ অব দ্যা হলি সেপালক্রে” এই শহরেই অবস্থিত। এটির অবস্থান পুরোনো দেয়ালের বাইরে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস মতে এই চার্চের জায়গাতেই নাকি ঈসা আ.-এর মৃত্যুর পর মরদেহ আনা হয়েছিলো। এখানেই তার মরদেহ পরিস্কার করে কবরস্থ করা হয়। আবার এখান থেকেই তার পুনর্জন্ম হয়। (ইসলামী বিশ্বাস মোতাবেক ঈসা আ.কে আল্লাহ তা‘আলা জীবিত অবস্থায় উঠিয়ে নিয়ে গেছেন, যে কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। তাই খ্রিস্টান বিশ্বাস অনুযায়ী ঈসা আ. মারা গেছেন এবং তাকে কবর দেয়া হয়েছে এবং এখান থেকে আবার পুনর্জন্ম পাওয়ার ঘটনা নিছক তাদের বানানো মিথ্যা কাহিনী। এটি ইসলামী বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধী।) এই গির্জাকে ঘিরেই খ্রিস্টানদের জেরুজালেমপ্রেম বহমান। তাছাড়া এই শহরের কাছেই রয়েছে বেথেলহেম, যেখানে ঈসা আ. (তাদের ভাষায় জেসাস বা যিশু)-এর জন্ম হয়েছিলো এবং তার মা মেরি (মারিয়াম আ.)-এর কবর।

ইসলাম ধর্ম। ইসলাম ধর্মে কাছে জেরুজালেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতের জায়গা। ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয়- উভয় দিক থেকেই জেরুজালেম শহরটি মুসলিমদের নিকটও গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিমদের নিকট জেরুজালেম এতটা গুরুত্ব পাওয়ার কয়েকটি কারণ হলো- এই জেরুজালেমে অবস্থিত রয়েছে মাসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস, যে মসজিদ কাবা নির্মাণের মাত্র ৪০ বছর পরেই তৈরি করা হয়েছিলো। এবং পরে সুলাইমান (আ.) জীনদের মাধ্যমে পুননির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদের কথা কুরআনেও উল্লেখ রয়েছে। (সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ০১) এই মসজিদই ছিলো মুসলিমদের প্রথম কিবলা। এই মসজিদের দিকে ফিরেই মুসলিমরা ১৬/১৭ মাস সলাত কায়েম করেছেন। এই মসজিদ থেকেই শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.) মিরাজে রওয়ানা দিয়েছিলেন। বিশেষ ছাওয়াবের আশায় এই মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয। মক্কার মাসজিদে হারাম, মদীনার মাসজিদে নবভী ও জেরুজালেমে অবস্থিত মাসজিদুল আকসা- এই তিনটি মাসজিদ ছাড়া অন্য কোন মাসজিদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বাড়তি ছাওয়াবের আশায় সফর করা নিষেধ। এই মাসজিদে সলাত আদায় করলে তা মক্কা-মদীনার দুই মাসজিদ ছাড়া অন্য যে কোন মাসজিদের তুলনায় ৫০০ গুণ ছাওয়াব বেশি হয়। কিপ রিডিং…

ইয়াসির আরাফাত : দেশহীন ইতিহাসের নায়ক

বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা মানে আমাদের মুক্তি ও স্বাধীনতা; আমি আপনাদের আনন্দ আমাদের আনন্দ বলেই অনুভব করি— একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বড় সমর্থক ইয়াসির আরাফাত ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এই বক্তব্য দিয়েছিলেন স্বাধীনতা দিবসের মার্চপাস্টে অভিবাদন গ্রহণকালে। তার আগের দিন ২৫ মার্চ স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশে আসেন তিনি । আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আমন্ত্রণে আরেক কিংবদন্তী নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে। ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ। পরদিন ২৭ মার্চ তিনি উদ্বোধন করেন স্বাধীনতা স্মারক ‘শিখা চিরন্তন’ ও মুক্তিযুদ্ধ স্তম্ভ। আজীবন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু এই মহান নেতা একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেন বটে, বহুবার যাত্রা বিরতিও করেছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, কিন্তু এবারের পরে মৃত্যুপর্যন্ত আর এদেশে আসার সুযোগ হয় নি তার। ১৯৭৮ সালে চিন সফরের সময় তিনি বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করলে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন।[1]


পত্র-পত্রিকা বলে— আরাফাতের জন্ম মিশরের কায়রোতে। কিন্তু আরাফাতের আমৃত্যু দাবি ছিলো— তিনি জন্মেছেন জেরুজালেমে জলপাই বনের ছায়াঘেরা তার মাতৃভূমিতে।


সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের সেই অনুষ্ঠানে সেদিন কয়েক লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছিলো। তারা কি আরাফাতকে দেখতে আর তার কথা শুনতে এসেছিলেন? কেমন ছিলেন তিনি? ইতালির বিখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি আরাফাতের অফিসে সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরে এসে সেই বিবরণ দিয়েছেন সমালোচকের ভঙ্গীতে— একেবারে কাঁটায় কাঁটায় যখন তিনি এলেন, মুহূর্তের জন্যে আমি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে বললাম— না, এ তিনি হতেই পারেন না। তাকে বেশ তরুণ মনে হচ্ছিলো; অতি সাধারণ। অন্তত: প্রথম দৃষ্টিতে তার মধ্যে এমন কিছু দেখলাম না, যাতে তাকে কতৃত্বের অধিকারী মনে হয়। তার গোঁফ লক্ষ্যণীয়; পুরু এবং সকল আরবের গোঁফের মতোই। কাঁধে ঝুলানো রাইফেল, যা তিনি কখনো খুলে রাখেন না। নিশ্চয় তার খুব প্রিয়। কিছুটা হাস্যকর। উচ্চতায় তিনি বেশ খাটো। আমার মনে হয় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। হাত, পা ছোট ছোট, বিশেষ করে মাংসল পা, গুরু নিতম্ব, স্ফীত উদরসহ দেহের ভার রক্ষার পক্ষে বেশ ছোট।

এসব কিছুর উপরে একটা ছোট মাথা। মুখটা যেন ফ্রেমে বাঁধা এবং মুখ দেখেই কেউ বুঝতে পারবে— এই তিনি। ইয়াসির আরাফাত। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত গেরিলা। বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। অন্ধকারে হাজার মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়ার মতো মুখ। একজন অভিনেতার মুখ। শুধু তার শত্রু মোশে দায়ানের এক চোখের আবরণীর মতো তার কালোচশমার কারণেই যে তিনি সবার থেকে ব্যতিক্রম, তা নয়; বরং ব্যতিক্রম তার মুখোশের জন্য। এজন্য তাকে মনে হয় শিকারী পাখি বা ক্রুদ্ধ মোষের মতো।

তার গাল নেই, কপাল নেই। সবু কিছু লাল, পুরু ঠোঁটের সাথে একটা বিরাট মুখম-লে একাকার হয়ে গেছে। একটা উগ্র নাক এবং কালো কাচে আবৃত চোখ দুটো কাউকে সম্মোহিত করবে। এই চোখে তিনি আমাকে দেখছেন, কিছুটা অবচেতনভাবে। নরম ও আদুরে গলায় ইংরেজিতে উচ্চারণ করলেন— ‘গুড ইভনিং। দু’মিনিটের মধ্যে আপনার সাথে বসবো।’ তার কণ্ঠ কিছুটা রমণীয়।

.. কেউ যদি তার পরিচয় না জানে, তাহলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাববে শুধু দেহরক্ষীর কারণে। আমার সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট ছিলো রাত দশটায়।.. নির্ধারিত কক্ষে কয়েকটা চেয়ার, একটা টেবিল। ইয়াসির আরাফাত তার স্বয়ংক্রিয় রাইফেলটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন প্রদর্শনীমূলক ভঙ্গীমায়। সাদা দাঁতে হাসি ছড়িয়ে বসলেন।..[2]

এই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের মার্চে জর্দানের রাজধানী আম্মানে। কিপ রিডিং…

গো টু টপ