Tag archive

ভাষার ইতিহাস

বিষ্ণুপ্রিয়া : একটি প্রেমবতী ভাষার আখ্যান


আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হলো— বিষ্ণুপ্রিয়া আদতে ছিলো বিষ্ণুপুরীয়া । অর্থাৎ ভারতের মণিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুর থেকে উদ্ভূৎ শব্দটি; যেখানে বিষ্ণুপ্রিয়ারা সংখ্যায় প্রবল ছিলো । বিষ্ণুপ্রিয়ার সুদেষ্ণা সিংহকে দুনিয়ার পয়লা আদিবাসী ভাষাশহিদ বলা হয় । ১৬ মার্চকে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষার ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।


বিষ্ণুপ্রিয়া— কী চমৎকার একটি ভাষার নাম । বুকে আগলে রাখা প্রেয়সীর মতো সুন্দর । লেখার শুরুতে আপনাদের আরও চমৎকার দুটি তথ্য দিচ্ছি—

এক. বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ । তার মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । [1] দুই. পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দুটি ভাষার জন্যে মানুষকে লড়াই করতে হয়েছে রক্ত দিয়ে— বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া । এ ছাড়া তামিল ও কন্নাড়া ভাষাসহ আরও কয়েকটি ভাষার জন্যে লড়াই করতে হয়েছে মানুষকে । কিন্তু রক্ত দেয়ার কৃতিত্ব কেবল এ দুটিরই । বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য যে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে, সে-সংগ্রাম বাংলাভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর । আমরা সে-আলোচনায় একটু পরে আসবো । কিপ রিডিং…

অসমিয়া : বাংলা ভাষার দুর্জ্ঞেয় সতীন

অক্ষর একটাই, ভাষাও একই তবু একেক দেশে তার উচ্চারণ একেক রকম— বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘অপরূপ মিয়ানমার’ না পড়লে এ-কথা জানাই হতো না । যেমন— মিয়ানমারের মুদ্রা kyat-কে তারা উচ্চারণ করে ‘চ্যা’ বা ‘চ্যাট’। আজব লাগে না ! তদ্রূপ, অসমিয়া ভাষাকে অসমিয়া উচ্চারণে বলা হয় অখমিয়া । আবার অহমিয়াও বলা হয় । ইংরেজিতে লেখা হয়— Ôxômiya । কোথাও কোথাও Assamese-ও যে লেখা হয় না, তা নয় ।

অসমিয়া ভাষায় ভারতে প্রায় ১.৩ কোটি মানুষের মাতৃভাষা;[1] এদের অধিকাংশই ভারতের অসম রাজ্যে বাস করেন। এছাড়াও ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড,  অরুণাচল প্রদেশ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অন্যান্য অংশ, পুনে-মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, কর্ণাটক, ও কলকাতায়[2] এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র ভুটানেও অসমিয়া প্রচলিত । সুতরাং বিশ্বজুড়ে এই ভাষাভাষীলর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি।[3]

বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের বিপুল পরিমাণে মানুষ অসমিয়া ভাষায় কথা বলে এবং পার্বত্য রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী আসামের বংশোদ্ভূত (অসমিয়) পরিবারের নারী-পুরুষের নিত্যদিনের মুখের বুলি অসমিয়া, কিন্তু বাংলাদেশে এই ভাষাভাষী মানুষের জনসংখ্যা কতো তা নিরূপণ করা হয় নি কখনো । কিপ রিডিং…

সিলেটি নাগরী : সুফিদের হাতে গড়া অনন্য বর্ণমালা

অবিকল চর্যাপদের ভাষা রাজবংশী



‘টালত ঘর মোর নাহি পরবেসী,  হাড়িত ভাত নাই, নিতি আবেশী’

বাংলা ভাষার প্রাচীনত্ব প্রমাণ করা হয় চর্যাপদের ভাষা দিয়ে, অথচ ঢেণ্ঢনের লেখা চর্যাপদের ৩৩ তম এই পদটি পড়লে পরিষ্কার মনে হয়— চর্যাপদ বুঝি রাজবংশী ভাষাতেই লেখা।[1] এমন নয়, কাকতালীয়ভাবে চর্যাপদের ভাষাটা রাজবংশীর সাথে মিলে গেছে কিংবা এমনও নয় যে, চর্যাপদের সবটুকু ভাষাই রাজবংশী থেকে নেয়া। বরং বলার বিষয় হলো, চর্যাপদে যে ভাষার সাথে রাজবংশীর মিল রয়েছে, হাজার বছর ধরে এই ভাষাভাষীরা ঠিক সেই ভাষাতেই কথা বলছে, এতটুকু বদল ঘটে নি। অধ্যাপক আহমদ শরীফ যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন— “চর্যাপদ আদতে একটা সংগ্রহ। শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর নেপাল রাজদরবারে আমন্ত্রিত হলে এ অঞ্চলে প্রচলিত সহজিয়া পদগুলিকে সংগ্রহ করে ও লিপিবদ্ধ করে নিয়ে যান নেপালে। সংগ্রহের প্রশ্নে তখন বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষার পদ আসাটাই স্বাভাবিক ছিলো। অর্থাৎ চর্যাপদের সবগুলি পদ একই ভাষায় রচিত নয়। তাই কেউ যদি উপর্যুক্ত পদটি রাজবংশী ভাষায় লিখিত কোনো পংক্তি বলে আপনাকে নিরানব্বভাগ নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে আপনি না মেনে পারবেন না।

রাজবংশী ভাষাকেও বাংলার একটি উপভাষা বলা হয়ে থাকে, যদিও আজকাল অনেক গবেষকই অস্বীকার করেন। ভারতের উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. হরিপদ চক্রবর্তী দেখিয়েছেন— রাজবংশী ভাষায় বাংলা ও অসমির প্রাধান্য থাকলেও ভাষাটিতে অনেকাংশে তিব্বতী-বর্মন গোত্রের অন্তর্গত আদি বোড়োভাষার (বড়ুয়া ভাষার) বহুশব্দ বিদ্যমান রয়েছে। তাই রাজবংশী বাংলা বা অসমিয়ার উপভাষা বা শাখাভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।[2] এমনকি অনেকে এক কদম এগিয়ে বাংলাকেই রাজবংশীর অপভ্রংশ বলতে চান। সুনীতিকুমার ও ড. রফিকুল ইসলামও বাংলা ভাষায় বোড়ো প্রভাবের কথা উলেখ করেছেন। আবার অনেকের অভিমত— বাঙলা ভাষা রাজবংশী ভাষার সমসাময়িক একটি ভাষার পরের প্রজন্ম। হতে পারে, রাজবংশীর বিকশিত রূপ যখন প্রচলিত তখন তার প্রতিবেশী আরেকটি ভাষা পরবর্তীতে বিকশিত, বিবর্তিত হতে হতে আজকের বাংলা ভাষার রূপ নিয়েছে। ভাষার প্রাচীনত্বের বিবেচনায় এসব দাবিকে সর্বাংশে উড়িয়ে দেয়ারও উপায় নেই। ভাষাবিদদের গবেষণা বলে— রাজবংশী ভাষা ৪৮-৫৫ ভাগ বাংলা, ৪৩-৪৯ ভাগ মৈথিলি ও নেপালি শব্দ দ্বারা গঠিত। আবার অন্যদিকে রাজবংশীকে বুদ্ধানুসারীদের ধর্মীয় ভাষার ‘পালি’র নিকটাত্মীয়ও বলা হয়। হাচিসন ও ডালটনের লেখা থেকে জানা যায়—  ষোল শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কোচ রাজা হাজোরের বংশধরগণ ‘কোচ’ ত্যাগ করে ‘রাজবংশী’ গ্রহণ করে। তারপর থেকেই এই ভাষার বিকাশ বৃদ্ধি পায়।


আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি ভাষার যথাসম্ভব সানুপুঙ্খ আলোচনার প্রয়াস পাবো । সত্যিকারের ভাষারূপ এবং ভাষাভাষী মানুষের শিক্ষা ও তিতিক্ষার ফসল তুলে আনতে আমাদের কসুর থাকবে না । পরবর্তী অধ্যায়গুলো দেখতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন । নজর রাখুন দ্য সুলতানে ।


কিপ রিডিং…

অনেক ভাষার দেশ বাংলাদেশ

জাতি বিবেচনায় পৃথিবীর চলমান সমগ্র অসেমেটিক জাতির ভাষাকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়—  আর্য ও অনার্য। মজার ব্যাপার হলো আমাদের বাংলাদেশে উভয় ধরনের ভাষাই প্রচলিত। ভাষা গবেষকদের মতে—  এদেশে বিভিন্ন জাতি-উপজাতির ভাষা-উপভাষা মিলে অন্তত ৪৫ টি ভাষা প্রচলিত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন—  “বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ছাড়াও আছে ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৫টি মাতৃভাষা। এই ৪৫টি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। আবার কিছু লোকের মধ্যে আছে উর্দু ভাষা। আরবি, সংস্কৃত ও পালি ভাষার সঙ্গে রয়েছে ধর্মীয় অনুষঙ্গ। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও জাতিসংঘের প্রভাবে বাংলাদেশে কিছু জায়গায় কার্যকর রয়েছে ইংরেজি ভাষা।”[1] সুতরাং অফিশিয়ালি যদিও বলা হয় ৩৯ টি ভাষার কথা, কিন্তু হিসাবের বাইরেও আরও কয়েকটি শিরোনামহীন ভাষা নানাভাবে মুখে মুখে রটে চলেছে আমাদের বাংলাদেশে।



কিপ রিডিং…

গো টু টপ