Tag archive

রাসুল

নবীজিকে (সা.) আমরা কেনো ভালোবাসবো?

আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন— তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ থেকে প্রিয়তর না হবো। [বোখারি, হাদিস ১৫; মুসলিম, হাদিস ৪৪]

আবু হোরাইরা রা. বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন— সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা ও সন্তান থেকে বেশি প্রিয় না হবো। [বোখারি, হাদিস ১৪; নাসায়ি, হাদিস ৫০৩৫]

এই হাদিস দুটি এত স্পষ্ট যে, এর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন— কাজি আয়াজের বক্তব্যে রয়েছে, এটা হলো ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত। [ফাতহুল বারী, খ- ১, পৃষ্ঠা ৫৯] সুতরাং ইসলামের বিধানমতে নবীজিকে ভালোবাসা ফরজ, নবীজির আনুগত্য করা ফরজ। কথা হলো, ভালোবাসা ফরজ— এ-বিষয়টি ইসলামের গতিপ্রকৃতি যার জানা নেই, তার কাছে অদ্ভুত মনে হবে। সন্দেহ নেই, ভালোবাসা হলো একটি মানবীয় আবেগ। আর আবেগ-অনুভূতি কখনো আদেশ-নিষেধের ছাউনিতে দাখিল হয় না। বলতে গেলে কারও ব্যক্তিক ইচ্ছার পরিধিতেও আসে না। এমনকি নবীজি আপন অন্তরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন— হে আল্লাহ, এটা আমার অংশ, যার মালিক তুমি। সুতরাং যার মালিক তুমি, আমি নই, তার ব্যাপারে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না। [দেখুন— লেখকের কৃত ‘যাওয়াইদুস সুনান আলাস সহিহাইন, হাদিস ৪৫০৪] আয়েশা রা. বলেন— এখানে ‘এটা আমার অংশ’ দ্বারা উদ্দেশ্য ‘কলব’।

ভালোবাসার অনুভূতি তো মানুষের ক্ষমতার আওতাধীন কোনো বিষয় নয় যে, তার ওপর সে কর্তৃত্ব খাটাবে; বরং তা মানুষের হৃদয়ে ধীরে ধীরে আসে ইচ্ছার ক্ষেত্রের বাইরে থেকে। একই সাথে শরীয়তও এটা চায় না যে, অন্তরে এটা আদেশের মাধ্যমে আসুক। কেননা, মানুষ অনেক সময়ই আদেশ পালন করে তাকে বাধ্য করা হয় বলে এবং এই দীনের নীতিমালায় বাধ্যবাধকতা বাতিল হিসেবে গণ্য— দীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। [সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৬]

কিন্তু ভালোবাসা হলো, এমন একটা সম্পর্ক, যা মুসলমান এবং নবীর মধ্যে এবং মুসলমান ও তার ধর্মের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করে। তা এমন নিদর্শন, যা এই পদ্ধতিতে সৃষ্টফল ব্যতীত মানুষের সম্পর্ক তা বুঝতে পারে না। [লেখকের কৃত ‘আন আযওয়াই আলা দিরাসাতিস সীরাহ’, পৃষ্ঠা ১৬-১৮]

কিভাবে ভালোবাসা হবে

প্রশ্ন আসে— তা হলে এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা কীভাবে করবো?

কাজি আয়ায রহ. বলেন— ভালোবাসার প্রকৃতি হলো, মানুষ তার অনুকূল বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার অনুকূল বিষয়টা তার জন্যে হয়—

এক. হয়তো প্রাপ্তির মাধ্যমে উপভোগ করার জন্যে। যেমন— সুন্দর চেহারা, চমৎকার কণ্ঠ, সুস্বাদু খাবার ও পানীয় এবং এ-ধরনের বিষয়াবলিকে ভালোবাসা; যার প্রতি সকল সুস্থ-স্বভাব ধাবিত হয়। কেননা, এগুলো তার অনুকূল বিষয়।

দুই. অথবা, তার বিবেকবোধ ও আন্তরিক অনুভূতি অভ্যন্তরীণ অবস্থা উপলব্ধি করে তৃপ্তি পাওয়ার জন্যে। যেমন— সজ্জন, ওলামা, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের ভালোবাসা, যাদের সুন্দর জীবন-কাহিনি ও চমৎকার কৃতকর্মের বিবরণ কিংবদন্তী হয়ে আছে। কেননা, মানুষের স্বভাব এ-জাতীয় লোকদের সম্মোহনে আকৃষ্ট হয়।

তিন. অথবা, তার ভালোবাসাটা কেবলই হবে তাকে কারও অনুগ্রহ ও দান-দক্ষিণা থাকার কারণে। কেননা, অন্তরের স্বভাব হলো, সে তাকেই ভালোবাসবে, যে তার প্রতি অনুগ্রহ করবে।

উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত যখন স্থির হলো, তখন আপনি দেখুন, এই বিষয়গুলি নবী স.-এর ক্ষেত্রেও বিদ্যমান রয়েছে কি না। দেখবেন, ভালোবাসার যে যে তিনটি কারণ রয়েছে তার সবগুলো বৈশিষ্ট্যেরই অধিকারী নবীজি স.।

—দেখুন, বাহ্যিক আকৃতি ও সৌন্দর্যে তিনি অনন্য।

—সচ্চরিত্র ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ ।

—তা ছাড়া দেখুন, উম্মাহের প্রতি তার করুণা ও অনুগ্রহের অবদান, দেখুন তার রহম ও দয়া, উম্মাহকে হেদায়াতের পথ দেখানো, তাদের প্রতি তার সীমাহীন মমতা, জাহান্নাম থেকে তাদের পরিত্রাণের বিষয়টি। যার ফলে কোরআনে বিভিন্ন উদ্ধৃতি এসেছে যে, নিশ্চয় তিনি মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল ও দয়াবান, বিশ^বাসীর জন্যে রহমত, তিনি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এবং তিনি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী তারই নির্দেশে, আর তিনি দীপ্যমান সূর্যালোক।

মুমিনদের প্রতি তার যে অনুগ্রহ, তারচে’ বড় ও মহান অনুগ্রহ কী আছে? যেহেতু, তিনিই হলেন উম্মাহের হেদায়াতের উসিলা, অজ্ঞতা থেকে মুক্তিদাতা, সাফল্যের আহ্বায়ক, প্রতিপালকের সমীপে পৌঁছার মাধ্যম, তাদের সুপারিশকারী ও মুখপাত্র, তাদের সাক্ষী এবং তাদের চিরায়ত আবাস ও চিরস্থায়ী নেয়ামতের ব্যবস্থাপক।

যখন কোনো বাদশাকে তার উত্তম চরিত্রের কারণে, কিংবা কোনো শাসককে তার প্রভাব সৃষ্টিকারী পরিচালনা পদ্ধতির কারণে, অথবা কোনো উপদেশদাতাকে তার জ্ঞান গভীরতা ও উত্তম স্বভাবের কারণে স্বাভাবিকভাবে ভালোবাসা হয়, তাহলে তো নবীজি ভালোবাসা পাবার সর্বোচ্চ অধিকারী এবং হৃদ্যতার সর্বাধিক যোগ্য। কেননা, এই সকল সদগুণ ও স্বভাব-প্রকৃতির চূড়ান্ত স্তর ও পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে বিরাজমান ছিলো, তাতে সন্দেহের লেশমাত্র কারও নেই। [কাজি আয়ায কৃত ‘আশ-শিফা’, খ- ২, পৃষ্ঠা ৫৭৯-৮১] কিপ রিডিং…

রাসূলুল্লাহ সা. ও মুক্তচিন্তা

বর্তমান বিজ্ঞানোত্তর বিশ্বে সমধিক আদৃত বিষয়সমূহের শীর্ষে সদর্পে অবস্থান করছে যে বিষয়টি, বলা যায় যে তাহলো মুক্তচিন্তা। শিল্পের উৎকর্ষ, সাহিত্যের সৌকর্য, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা, প্রজ্ঞার বিকাশ  ̶  এসবের মৌল গাঠনিক পদার্থ হলো মুক্তচিন্তা। মুক্তচিন্তার অভাব ব্যক্তিকে করে শৃংখলিত, বুদ্ধিকে করে অনুর্বর, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ফেলে রাখে অকর্ষিত বেলাভূমে। মহানবী সা. পার্থিব ও ধর্মীয় উভয় পর্যায়ে গোটা মানব ইতিহাসে সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শকারী ব্যক্তি ছিলেন। মাইকেল এইচ হার্ট তার ‘দ্য হানড্রেড’ গ্রন্থের প্রথম ও শীর্ষ ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এভাবেই মূল্যায়ণ করেছেন এবং বলেছেন, ‘He was the only man in history who was supremely successful on both religious and secular levels.’ (The Hundred:3)

ইতিহাসের সার্থকতম ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা চয়ন করেছেন বৈশ্ব্যিক দূত হিসেবে, তিনি মুক্তচিন্তার জ্যোতি-লাবণ্য ছড়িয়ে যাবেন আমৃত্য, শৃঙ্খলিত বুদ্ধির স্বাধীনতায় পক্ষে সংগ্রাম করে যাবেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, এটাই ছিল স্বাভাবিক। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে মহানবী সা. কীভাবে মুক্তচিন্তা চর্চা করেছেন, মুক্তচিন্তার পক্ষে সংগ্রাম করেছেন, মুক্তচিন্তাকে আশ্রয় দিয়েছেন, আদর করেছেন তা যৌক্তিক আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

মুক্তচিন্তা (Free Thought) একটি আধুনিক পরিভাষা। এর মৌল সুর হলো, ‘জ্ঞান ও যুক্তির অনুপস্থিতিতে দাবিকৃত কোন মতকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ বা বর্জনা না করা।’ এই সুরকে বিবেচনায় রেখে অগ্রসর হলে দেখা যাবে, মহানবী সা. হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি মুক্তচিন্তার প্রথম রাজপথ নির্মান করেছেন খোদ আল্লাহ তাআলার তত্তাবধানে। এর অন্যতম উদাহরণ, তাদানিন্তন পৃথিবীতে কর্তৃত্বরত সকল চিন্তা-জীবনধারা অশৈশব বর্জন করে অনুসন্ধান করেছেন তিনি নিটোল-অটুট সত্যের- (সূরা আদ্-দুহা)। আরব উপদ্বীপে হাজার বছরের লালিত-আদৃত পৌত্তলিকতার বিপক্ষে চলেছেন তিনি শিশুকাল থেকেই। তাইতো কখনো তাকে দেখা যায়নি কোনো প্রতিমার কাছে প্রার্থনা করতে, এমনকী প্রতিমার নামে জবাইকৃত কোনো পশুর মাংস খেতে, (বুখারী, কিতাবুয যাবাইহ ও ওয়াস্ সাইদ) । কিপ রিডিং…

শব্দে শব্দে দীন শেখা : রাসুল


রিসালাত আরিব শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে বার্তা, বাণী, পয়গাম, সংবাদ বা কোনো শুভকর্মের দায়িত্ব পালন করা। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Message। রিসালাত শব্দ থেকেই মূলত রাসুল শব্দটি উদ্ভূত। যিনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন কিরেন তিনি রাসুল। ভাবগত বিবেচনায় নবুয়াত ও রিসালাত শব্দ দুটি সমর্থক।


মাওলানা মিরাজ রহমান : রাসুল আরবি শব্দ। আরবি ‘রিসালাতুন’ মূলধাতু থেকে নির্গত। বাংলা অর্থ “বার্তাবাহক”। বহুবচন রুসুল। পারিভাষিক অর্থে রাসুল হলেন অল্লাহ প্রেরিত স্বতন্ত্র কিতাব প্রাপ্ত বার্তাবাহী ব্যক্তিত্ব। রাসুল বলতে তাদেরকেই বোঝানো হয়, যারা আল্লাহর কাছ থেকে কিতাব বা স্বতন্ত্র পুস্তক বা পৃথক শরিয়তের বিধানাবলী প্রাপ্ত হয়েছেন।

হজরত আবু উমামা থেকে বর্ণিত সাহাবি হজরত আবু জর (রা.) বলেছেন, আমি রাসুলকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলাম যে, নবিগণের সংখ্যা কত? রাসুল [সা.] উত্তরে বললেন, তাঁদের (নবিদের) সংখ্যা এক লাখ চব্বিশ হাজার, তন্মধ্যে রাসুল ছিলেন ৩১৫ (মতান্তরে ৩১৩জন) জন। [মুসনাদে আহমদ, মিশকাত]

রাসূল বলতে তাদেরকেই বোঝানো হয় যারা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে কিতাব বা পুস্তক প্রাপ্ত হয়েছেন। হাদিস সহ অন্যান্য ইসলামি বইয়ে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবির কথা বলা হয়েছে। এদের মাঝে সকলে কিতাব প্রাপ্ত হননি। যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছেন তারাই শুধু রাসুলের খেতাব পেয়েছেন। অর্থাৎ সকল রাসুলই নবি কিন্তু সকল নবি রাসুল নয়। কোরআন অনুযায়ী, আল্লাহ্‌ মানবজাতির নিকট বহু নবি-রাসুল (আনবিয়া, একবচন নবি) প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে পঁচিশ জনের নাম কোরআনে উল্লেখ আছে। কুরআন তাদের চার জনকে রাসুল হিসাবে উল্লেখ করে, দাউদ (ডেভিড), মুসা (মোজেস), ঈসা (যিশু) এবং মুহাম্মাদ (সা.)। [উইকিপিডিয়া] কিপ রিডিং…

গো টু টপ